নড়াইলে সুলতান মেলায় ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্ত : তাঁর জীবন ও শিল্পকর্ম

293

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক ॥ সোমবার (১৬ জানুয়ারী বিকালে নড়াইল সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজ সুলতান মঞ্চ চত্বরে মেলার আনুষ্ঠানিক নড়াইলে সুলতান মেলায় ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্ত : তাঁর জীবন ও শিল্পকর্ম উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি। উদ্বোধনী শেষে সন্ধ্যায় নড়াইলের কৃতি সন্তান উপন্যাসিক নিহার রঞ্জন গুপ্তের জীবন ও কর্মের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অ্যাডভোকেট হেমায়েত উল্লাহ হিরুর সভাপতিত্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন গুহ। প্রধান আলোচক ছিলেন এস এম সুলতান বেঙ্গল আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অশোক কুমার শীল।
এছাড়া আলোচক ছিলেন সহযোগি শাহানারা বেগম, মলয় কান্তি নন্দী, শরীফ মুনীর হোসেন, আঞ্জুমান আরা, সাইফুর রহমান হিলু, জয়দেব দাস প্রমুখ।
ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্ত : তাঁর জীবন ও শিল্পকর্ম
স্বপন কুমার গুহ, নির্বাহী পরিচালক, রূপান্তর : ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্ত। বাংলা উপন্যাস বা রহস্যোপন্যাসের দিকপাল। কিন্তু NK_January_2017_0080এই ঔপন্যাসিকের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে খুবই কম ধারণা বাংলার বর্তমান পাঠকদের। অথচ এক সময় এই নামটির সাথে পরিচয় ছিল সামান্য লেখাপড়া জানা পরিবারগুলোরও। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো যেমন ব্যাপকভাবে পঠিত হতো তেমনি শোভা বাড়াতো বইয়ের আলমারির। তাঁর লেখা নতুন বই দোকানে আসার সাথে সাথেই পাঠকরা হামলে পড়তেন। দুই শতাধিক উপন্যাস এবং রহস্যোপন্যাসের স্রষ্টা এই মানুষটি পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। একজন চিকিৎসাবিদের ঔপন্যাসিক হওয়া প্রায় বিরল। কিন্তু চিকিৎসকের মহান দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এত বিপুল সংখ্যক পাঠকপ্রিয় উপন্যাস রচনার নজীর বিশ্ব সাহিত্যেই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
জন্ম, জন্মস্থান:
নিহাররঞ্জন গুপ্ত’র সাহিত্যকর্মের পাঠকদের অনেকেই জানেন না যে তিনি বাংলাদেশের সন্তান। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ডাক্তার নীহার রঞ্জন গুপ্ত ১৯১১ সালের ৬ জুন পিতা সত্যরঞ্জন গুপ্তের কর্মস্থল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস যশোর জেলার নড়াইল মহাকুমার (বর্তমান জেলা) লোহাগড়া থানার উত্তর প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনী মধুমতি নদীর দক্ষিণ তীরের ইত্না গ্রামে।
নীহার রঞ্জন গুপ্ত’র পৈত্রিক নিবাসের বর্তমান অবস্থা:
নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার ইত্না গ্রামের জে.এল নং ১২৯ এবং খতিয়ান নং ১২২ ও ৪৭৪ দাগের সম্পত্তিতে নীহার রঞ্জন গুপ্ত’র পৈত্রিক নিবাসটি অবস্থিত। এর ভৌগলিক অবস্থান ২৩:০র্ ৯২র্র্র্৩র্ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯:৪র্১২৮.র্৭র্ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। এ বাড়িতে একটি দোতলা দালনঘর এবং একটি মন্দির রয়েছে। দক্ষিণমুখী দালানঘরটি তৈরিতে ইট, বালি ও চুন ব্যবহার করা হয়। তবে দেয়ালে সিমেন্টর আস্তর লক্ষ্যণীয়। দোতলায় ওঠার একমাত্র সিঁড়িটি এ দালানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এ দালানের উত্তরের অংশটি থাকলেও দক্ষিণের অংশটি নেই। উত্তরের যে অংশটি রয়েছে সেখানে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা বারান্দাসহ তিনটি কক্ষ রয়েছে। দোতলার বারান্দার সামনে খিলানযুক্ত স্তম্ভ (পিলার) রয়েছে। নীচতলা ও উপরের তলার প্রায় প্রতিটি কক্ষে কুলঙ্গী ও দেয়াল আলমারি রয়েছে। নীচতলার সামনের বারান্দার দেয়ালে বাংলায় “আনন্দ অন্নদা কুঠির” উৎকীর্ণ রয়েছে। মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ৮.৩০ মিটার এবং প্রস্থ ৭.১৫ মিটার। ইট, চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি এ মন্দিরের সামনে একটি বারান্দা ও পেছনে একটি কক্ষ রয়েছে। নীহার রঞ্জন গুপ্ত’র পৈত্রিক নিবাসটি ২০০৩ সালে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। বর্তমানে ১ দশমিক ১৩ একর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে এলাকাটি সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে কাজের গতি খুবই ধীর বলে এলাকাবাসীরা মনে করেন।
নীহার রঞ্জন গুপ্ত’র বংশধরেরা:
নীহার রঞ্জন গুপ্ত চার কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে নীলা মজুমদার, মেঝো কন্যা দীপালী গুপ্ত (প্রয়াতঃ), সেঝো করবী সেন এবং কনিষ্ঠা কেয়া সেনগুপ্ত। এর মধ্যে কেয়া সেনগুপ্ত নীহার রঞ্জন গুপ্তের কোলকাতার বাড়ীতে বসবাস করেন।
শিক্ষা ও পেশা:
নীহার রঞ্জন গুপ্তের পরিবার ছিল নড়াইলের বিখ্যাত কবিরাজ বংশীয়। তাঁর পিতা-সত্যরঞ্জন গুপ্ত এবং মাতা-লবঙ্গলতা দেবী। পিতার স্থানান্তরিত চাকুরীর কারণে তিনি অনেক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তন্মধ্যে – গাইবান্দা উচ্চ বিদ্যালয় অন্যতম। নীহার রঞ্জন গুপ্ত শৈশবকাল অতিবাহিত করেন কলকাতায়। ১৯৩০ সালে কোন্নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে আই.এস.সি ডিগ্রী অর্জনের পর কলকাতায় কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ (বর্তমানে আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) থেকে ডাক্তারি বিদ্যায় কৃতকার্য হন তিনি। ডাক্তারী পাস করে বেশ কিছুদিন নিজেস্বভাবে প্রাক্টিস করেন। অতঃপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে নীহার রঞ্জন গুপ্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হন। এরপর তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। এই চাকুরীর সূত্রে তিনি চট্টগ্রাম, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) থেকে মিশর পর্যন্ত বিভিন্ন রণাঙ্গনে ঘুরে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এরপর তিনি লন্ডন থেকে ডাক্তারি শাস্ত্রের ডার্মেটোলোজি বা চর্মবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তার বড় বোন পোকার কামড়ে মারা যায়। ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে এই রোগ সারানোর জন্য স্বপ্ন দেখেন ও পরবর্তী জীবনে বাস্তবায়িত হয়। যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষ ডিগ্রী অর্জন শেষে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে যোগ দেন। এরপর তিনি ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেছেন। চাকুরি জীবনের বাধ্যবাধকতা তাঁর কাছে বিরক্তিকর মনে হওয়ায় তিনি এ চাকরি ত্যাগ করে কলকাতায় ব্যক্তিগতভাবে আবার ডাক্তারী শুরু করেন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কলকাতায় বিশেষ পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারত বিভক্তির পর ১৯৪৭ সালে তিনি ও তার পরিবার স্থায়ীভাবে কলকাতায় অভিবাসিত হন।
সাহিত্যকর্ম:
নীহার রঞ্জন গুপ্তের সাহিত্যে হাতে খড়ি হয়ে ছিল সুদূর শৈশবেই। ষোল বছর বয়সেই তাঁর প্রথম লেখা উপন্যাস ‘রাজকুমারী’ ছাপা হয়। ডাক্তার নীহার রঞ্জন গুপ্ত পেশায় চিকিৎসক হলেও মানব মানবীর হৃদয়ের ঘাত-প্রতিঘাত ও মানবিক সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বের একজন সুচারু রূপকার। তিনি ছিলেন রহস্য উপন্যাস লেখায় সিদ্ধহস্ত। কেবলমাত্র রহস্য উপন্যাস নয়, তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলি সুখপাঠ্য যা – পাঠককুলের হৃদয় আকৃষ্ট করে। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি গোয়েন্দা গল্প রচনায় আগ্রহান্বিত হয়ে স্বীয় লেখার উত্তরণ ঘটান এবং আগাথা ক্রিস্টির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ভারতে ফিরে এসে তিনি তাঁর ১ম গোয়েন্দা উপন্যাস কালো ভ্রমর রচনা করেন। এতে তিনি গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে কিরীটি রায়কে সংযোজন করেন যা’ বাংলা কিশোর সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। তিনি বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনী রচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক ছিলেন। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট ও উপযোগী করে রচিত হয়েছে তাঁর রহস্য উপন্যাসগুলো। এ পর্যন্ত পঁয়তাল্লিশটি উপন্যাসকে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রায়ণ করা হয়েছে যথাক্রমে টালিউড ও বলিউডের চলচ্চিত্রাঙ্গনে। এছাড়াও তিনি শিশুদের উপযোগী সাহিত্য পত্রিকা সবুজ সাহিত্যের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর লিখিত উপন্যাসের সংখ্যা দুইশতেরও অধিক। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘কালোভ্রমর’, ‘লালু ভুলু’, ও কিশোর সাহিত্য। নীহার রঞ্জনের যে পঁয়তাল্লিশটি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘লালুভুলু’, ‘হাসপাতাল’, ‘মেঘ কালো’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘নূপুর’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘বাদশা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘মায়ামৃগ’, ‘কাজললতা’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ প্রভৃতি।
তাঁর এই চলচ্চিত্রায়িত উপন্যাসগুলি আমাদের চলচ্চিত্র জগৎকে সুসমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘লালুভুলু’ পাঁচটি ভাষায় চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে উপন্যাসটি বাংলাদেশেও চলচ্চিত্রায়িত হয় এবং দর্শককুলের প্রশংসা অর্জন করে। এই ছবিটির মহরৎ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য তিনি ঢাকাতে এসেছিলেন। নীহাররঞ্জনের অনেক উপন্যাস নাট্যরূপ দেয়া হয় এবং সেগুলি থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস উল্কা দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটারের দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে।
পেশা ও সাহিত্যকর্মের স্থান:
কোলকাতার ২৬, এ গড়িয়াহাট রোডের তাঁর প্রিয় একটা উপন্যাস ‘উল্কা’ নামেই করেছিলেন তিনি তাঁর বাড়ীর নামটা। তাঁর অধিকাংশ লেখাই এই বাড়িতে বসে। এখন এই বাড়ীতে বসবাস করেন তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা কেয়া সেনগুপ্ত। বাড়ীতে তাঁর ব্যবহার্য্য সবকিছু তেমনিভাবে রাখা আছে, শুধু বাংলা সাহিত্যের সেই দিকপালই শুধু নেই।
চিকিৎসক হিসেবে অতি কর্মচঞ্চল জীবনযাপনের মধ্যেও নীহার রঞ্জন গুপ্ত রেখে গেছেন অসংখ্য সাহিত্যধর্মী সৃষ্টি যা আপন স্বত্ত্বায় ভাস্বর। নীহার রঞ্জন গুপ্ত ১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলা সাহিত্য সম্ভারে এই কৃতিব্যক্তি ও তাঁর কৃতকর্ম ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রসারের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্র বিকাশে ইত্নার পৈত্রিক বাড়ীটি সংস্কার করে সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হলে এই গুণী মানুষটির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে বলে মনে করি।