ভিক্ষুকের হাত কর্মীর হাতে রূপান্তরে নড়াইলের এডিসি সিদ্দিকুর রহমানের নন্দিত উদ্যোগ

612

নড়াইলকণ্ঠ ॥ বর্তমান বিশ্বে তথা বাংলাদেশেও স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) আলোকে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসডিজি অর্জনের জন্য নতুন উন্নয়ন কাঠামোর দলিলে ১৭টি লক্ষ্য ও nk_december_2016_208১৬৯ টি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ১৭টি লক্ষ্যে প্রথমই রয়েছে- End poverty in all its forms every where: সকল ধরনের দারিদ্র্যের অবসান, অর্থাৎ দারিদ্র্যমুক্ত। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশে প্রথম নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ভিক্ষুকমুক্ত কার্যক্রম শুরু করেন মো: সিদ্দিকুর রহমান। তিনি গত ২০১৪ সালের ৫জুলাই সেখানে (কিশোরগঞ্জ উপজেলা) ভিক্ষুকমুক্ত করেন। হঠাৎ তার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতির হয়। তিনি ভেতরে ভেতরে এমন একটি জেলা খুজছিলেন যে জেলাটি আয়তনে হবে ছোট এবং ভিক্ষুকমুক্ত জেলা হিসেবে রোল মডেল করতে সহজ হবে। “নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা মেহনত করো সবে” বাংলাদেশে ভিক্ষুকমুক্ত করতে পারলে ‘কম বৈষম্যপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশ’ বা দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিনত করতে কিছুটা হলেও অগ্রগতি nk_december_2016_209হবে। অবশেষে সিদ্দিকুর রহমানের পোস্টিং হয় নড়াইল জেলায়। তিনি এ বছরের ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি নড়াইল জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হিসেবে যোগদান করেন। উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের চিন্তায় তার নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভিক্ষুকমুক্ত ধারনা নড়াইল জেলায় যোগদানের পরের দিন থেকেই কাজে লাগাতে শুরু করে দেন। এটা তার নিজস্ব উদ্ভাবন ও মূল্যবোধ। তিনি এ বিষয়টি নড়াইল জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছেন এবং জাতীয় নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে অবহিত করে জাতীয়ভাবে সর্বস্তরে বাস্তবায়নের জন্য প্রচেস্টা চালাবেন।
স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) “সকল ধরণের দারিদ্র্যের অবসান” এ লক্ষ্যমাত্রায় ভিক্ষুকমুক্ত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত। তিনি বিষয়টি জাতীয় নীতি নির্ধারনী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে আগামী জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
গত শনিবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে নড়াইল জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: সিদ্দিকুর রহমানের সাথে একান্ত সাক্ষাতকালে তিনি এসব তথ্য জানান। তিনি আরো জানান, দীর্ঘ ১১মাস পর আগামি দুই বছরের মধ্যে ৭৯৮জন চিহ্নিত ভিক্ষুকদের স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে আগামি বছরের জানুয়ারি’র প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠানিকভাবে নড়াইল জেলাকে ভ্ক্ষিুকমুক্ত ঘোষণা করা হবে। এরমধ্যে নড়াইল সদরে ৩০৪জন, লোহাগড়ায় ২২৮জন এবং কালিয়ায় ২৭৬জন ভিক্ষুক রয়েছে।
তিনি আরো জানান, নড়াইলকে ভিক্ষুকমুক্ত সকল অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যশোরের ঝিকড়গাছা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আব্দুল জলিল এর উদ্ভাবনী সফটওয়ারের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে নড়াইল সদরের দুইটি ইউনিয়নে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। বলতে পারেন শুরু করে ফেলেছি। সেটা হলো ঐ ইউনিয়ন সমূহের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড মো: আব্দুল জলিল এর উদ্ভাবনী সফটওয়ারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করা হবে। এর মাধ্যমে সকল কাজের মান যাচাই নিশ্চিত করা হবে। যেমন মনে করেন, টিআর, জিআর, কাবিটা, কাবিখা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বীজ, রাস্তা উন্নয়ন ও সংস্কার সবই এটার মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। এতে দুর্নীতি প্রতিরোধ হবে এবং পাশাপশি তৃণমুল পর্যায় ইউনিয়ন পরিষদকে বেশি করে শক্তিশালি করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সিদ্দিকুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো :
প্রতিবেদক : আপনি নড়াইল জেলাকে কেন ভিক্ষুকমুক্ত করতে চান?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : আমি মনে করি দেশে মানবিকমূল্যবোধ ভুলুন্ঠিত হচ্ছে। ক্ষুন্ন হচ্ছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি। এসব দেখে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। এ ভাবনা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। আমার বুদ্ধি, বিবেক ও অর্জিত জ্ঞানই আমাকে অনুপ্রাণিত করে, আমি উজ্জিবীত হই। শুরু করি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ভিক্ষুকমুক্ত কার্যক্রম এবং ঐ উপজেলাকে গত ২০১৪ সালের ৫ জুলাই ভিক্ষুকমুক্ত করি।
প্রতিবেদক : ভিক্ষুকমুক্ত ধারণা বাস্তবায়নে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : প্রথমে প্রকৃত ভিক্ষুক চিহ্নিত করি, এরপর তাদের চাহিদা নিরূপন করি। চাহিদার একটা ক্যাটাগরি করা হয়। এরপর বিভিন্ন জনমত সৃষ্টির কাজ করা হয়। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পর্যায় বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়। তহবিল গঠন করি। ভিক্ষুকদের আয়সৃজন করা লক্ষ্যে “এক ভিক্ষুক এক প্রতিষ্ঠান/দপ্তর” নির্ধারণ করা হয়। চিহ্নিত সকল ভিক্ষুককে সরকারি নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত এবং। একটি বাড়ি একটি খামার কর্মসূচির সাথে যুক্ত করা হয়।
প্রতিবেদক : এ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব সম্পর্কে আপনার ভাবনা কি?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : যেহেতু এ কর্মসূচিটি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ও বিভাগীয় কমিশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে সেহেতু এ কর্মসূচির স্থায়িত্বশীল রূপ দেয়ার জন্য নড়াইল জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর হতে “ভিক্ষুকমুক্তকরণ, ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন সংস্থা” নামে একটি সংস্থার নিবন্ধন নেয়া হচ্ছে। এ সংস্থার সাথে সরকারি, বেসরকারি, সমাজকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন কমিটি সরাসরি মনিটরিং করবে এবং জেলা ও উপজেলা কমিটিকে অবহিত করবে। এছাড়া যাদের ঘর নেই তাদের আশ্রায়ন প্রকল্পে মাধ্যমে ঘর দেয়া হবে।
প্রতিবেদক : এ কার্যক্রম করতে গিয়ে কি কি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : কার্যক্রম শুরুতে আমার ও প্রশাসনের অতি আন্তরিকতা দেখে জনপ্রতিনিধিরা অভিক্ষুক দেখেও ভিক্ষুক বানিয়ে সুপারিশ করেছে। এতে করে অনেক সময় আমরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি। পরে মানুষ যখন বুঝেছে তখন আর এমনটি ঘটেনি।
প্রতিবেদক : জরীপের কাজ কখন শুরু করেছেন?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : ফেব্রুয়ারি ২০১৬ শুরু করে ৩১ মার্চ শেষ করা হয়।
প্রতিবেদক : বাস্তবায়ন কখন শুরু করেন?
মো: সিদ্দিকুর রহমান : গত ৩১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ হতে মূলত: বাস্তবায়ন শুরু করেছি।
এছাড়া তহবিল গঠন, পুনর্বাসন ও সফলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: সিদ্দিকুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প “একটি বাড়ি একটি খামার” এর সমিতির ৬২৪ জন প্রকৃত ভিক্ষুককে সদস্য করা হয়েছে। তহবিল হিসেবে জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদ (৭ লাখ), সমাজসেবা অধিদপ্তর (৬.৬০), নড়াইলের জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অনুদান হিসেবে (১৫) মোট ২৮ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করা হয়েছে। এসব মিলে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উৎসাহ বোনাস ও আবর্তক ঋণসহ বর্তমানে তাদের পুঁজি দাড়িয়েছে ৪৭ লক্ষ টাকা। বর্তমান তারা বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রত্যেকে গড়ে যুক্ত করছে ২০০ থেকে ৩০০ শত টাকার সমমূল্যের পণ্য ও সেবা।