শিশু নাইব মস্তিষ্ক যক্ষ্মায় আক্রান্ত, চিকিৎসা সহযোগিতা প্রয়োজন

577

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ‘ছেলেটা এখন সেন্সলেস (অজ্ঞান) হয়ে পড়ে আছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। প্রথম দিকে তাকাতো, হাসতো, আমাদের কথা শুনে বুঝতো। কিন্তু এখন ছেলেটা পড়ে আছে নিস্তেজ হয়ে, নির্জীব হয়ে। কিন্তু আশায় আছি, যদি কোনোদিন ছেলেটা চোখ মেলে তাকায়! যদি কোনোদিন আচমকা মা-বাবা বলে ডাকে!’ এটুকু বলেই চুপ হয়ে গেলেন নুরুল করিম।

মাথা নিচু করলেন, বোধহয় চোখের পানি লুকাতে। কিন্তু পারলেন না। রুদ্ধগলায় নুরুল করিম বলেন, ‘একদিন ছেলেটি স্কুলে গেল। স্যারকে বললো, চোখে দেখছি না। ধীরে ধীরে সেটি সংক্রমিত হলো মস্তিষ্কে। বাচ্চাটা সেই যে অচেতন হলো, এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ নয় মাস!’

অ্যাপোলো হাসপাতালের মতো অতি ব্যয়বহুল হাসপাতালে একমাত্র সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আজ প্রায় নিঃস্ব হতে চলেছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মচারি নুরুল করিম। ছেলেটির চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু ছেলেটি আজও অচেতন।

নুরুল করিম রাজধানীর উত্তরা এলাকায় থাকেন। তার একমাত্র ১১ বছরের ছেলে নাইব (১১) উত্তরার একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো। এ বছরের ১ জানুয়ারিতে চোখে যক্ষ্মা নিয়ে নাইব ভর্তি হয় অ্যাপোলো হাসপাতালে। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায়, যক্ষ্মা নাইবের (১১) মস্তিষ্কে সংক্রমিত হয়েছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে নাইবের চিকিৎসা শুরু। এ সময় সে হঠাৎ করেই বাম চোখে ভালো করে দেখতে পারছিল না। বইও পড়তে পারছিল না। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার পর তাকে ভারতের চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়ে চিকিৎসা করানো হয়। সেখান থেকে তিন মাসের ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর নাইবকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তার বাবা নুরুল করিম। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নাইবকে। এরপরই জানা যায়, নাইবের চোখে যক্ষ্মা হয়েছিল। সেখান থেকে মস্তিষ্কে সংক্রমিত হয়েছে। সে এখন অচেতন অবস্থায় অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নুরুল করিম জানালেন, শান্ত স্বভাবের নাইব যে এভাবে শান্ত হয়ে যাবে, সেটা তারা আগে ভাবেননি।

নুরুল করিম বলেন, ‘গত অক্টোবরের দিকে চোখের সমস্যার জন্য নাইবকে বিভিন্ন চিকিৎসকদের দেখানো হয়। এক পর্যায়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে ২০ নভেম্বর ছেলেকে নিয়ে যাই ভারতের চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রালয়ে। সেখানে চোখের ফ্লুইড পরীক্ষা করে ওর বা-চোখে (টিবি) যক্ষ্মার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। চিকিৎসায় ডান-চোখ ভালো হয়। এ সময় বাম চোখেও কিছুটা দেখতে পেতো সে।
তিনমাসের ওষুধ নিয়ে চলে আসার কথা জানিয়ে নূরুল করিম বলেন, ‘কিন্তু বাংলাদেশে আসার পরই নাইবের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। তখন আবার চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাই। এরপর ঢাকায় এক হাসপাতালে ভর্তি করে নানা পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে এ বছরের ১ জানুয়ারি অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করাই। ওখানে অসংখ্য টেস্ট করানোর পরেও ভালো কোনও খবর পাইনি আমরা। অ্যাপোলোতে মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল নাইবের চিকিৎসার জন্য। বর্তমানে ছেলেটির অ্যান্টি-টিবি ড্রাগ চলছে। কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অসুখটি তার চোখ থেকে ব্রেইনে চলে গেছে। তাই, এখন তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার। তার শরীরের অন্য অঙ্গগুলো ভালো থাকলে কোনোদিন হয়ত নাইব সুস্থ হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু আমাদের সে পর্যন্ত টিকে থাকাটাই দায় হয়ে গেছে। মা-বাবা আর ছেলের তিনজনের সংসার আমাদের। এখন দিন কাটে খুব কষ্টে!’

নূরুল করিম জানান , ‘প্রথম অবস্থায় না হলেও পরে নাইবের ভ্যান্টিলেশন দেওয়া হয়। এভাবে একের পর এক ভেন্টিলেশন খোলা হয়, আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেন্টিলেশন দরকার হয় কারণ আমার ছেলেটি এখনও অচেতন। শেষ এমআরআই পরীক্ষাতে ব্রেইন ড্যামেজ এসেছে। তবে একটু একটু করে সে রেসপন্স করছে। আর আমরা সে আশাতেই বসে আছি। কোনোদিন যদি ছেলেটা বাবা বলে ডাকে! সে দিনের অপেক্ষাতেই প্রতিটি প্রহর কাটে আমার!’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে নুরুল করিম বলেন, ‘খুব সাহায্য করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা আমাদের ছেলেটাকে চোখে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই চোখের দেখা দেখতেই এখনও বেঁচে আছি আমি আর ওর মা।’

আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে হতাশাভরে নাইবের বাবা নুরুল করিম বলেন, ‘এভাবে কতদিন চলবে আমি জানি না; তবে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবো আমার ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য।

নাইবের মা নিতু বলেন, ‘বিয়ের অনেক বছর পর আমার এ সন্তানের জন্ম। আর এখন ঘরবাড়ি ফেলে দিনরাত থাকছি হাসপাতালে; যদি কোনোদিন ছেলেটা মা বলে ডাকে। কিন্তু আর্থিক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এ আর পেরে উঠছি না। সহায়-সম্পত্তি যা ছিল বিক্রি করে দিয়েছি। আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে ধার করেছি। কিন্তু তারও তো একটা শেষ আছে। সব কিছু মিলিয়ে ভালো কোনও অবস্থায় নেই আমরা। সে কারণে সমাজের বিত্তবানদের কাছে আবেদন করছি, অসহায় বাবা-মাকে সাহায্য করেন। একজন মায়ের বুকে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে এগিয়ে আসেন দয়া করে।’

‘হাসপাতালে অনেক টাকা বকেয়া আছে। টাকার জন্য তাগিদ দেয় ওরা। তখন ওদের বলি, টাকা যোগাড় করা হচ্ছে। রোগী তো এখনও হাসপাতালে আছে। তাই, বোধ হয় ওরা বেশি কিছু বলে না। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে। আমিও যার কাছ থেকে যতটুকু পাই, সেটা দিয়েই চিকিৎসা খরচ চালাই। এভাবেই চলছে। কিন্তু কতদিন আর এভাবে চলবে। তাই, হাত পেতেছি বিত্তবানদের কাছে! তারা যদি এই অসহায় মায়ের দিকে তাকান! যদি তারা একটু দয়া করেন, তাহলে হাসপাতালের খরচটা দিয়ে দিতে পারি! ছেলেটার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারি! চিকিৎসা শেষে যদি কোনোদিন ছেলেটা ‘মা’ ‘বাবা’ বলে ডাকে, সেই আশাতে আছি’ বলেন নিতু করিম।

নাইবের বাবা নুরুল করিম বলেন, ‘আমাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। চাকরির প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছি। এর আগে নড়াইল ছিলাম। এখন উত্তরায় থাকি। ছেলেটার চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছি। বাসা ভাড়াটাও যোগাড় করতে কষ্ট পেতে হয়। ছোট চাকরি করি। কী দিয়ে কী করবো, আর কিছু জানিনা।’

‘এখন দেশের মানুষই আমাদের ভরসা। তাদের সহযোগিতায় যদি আমাদের ছেলেটাকে ফিরে পাই। তাহলে বুকটা অন্তত ঠান্ডা হবে আমাদের। আমরা গরিব মানুষ। আমাদের আর কিছু চাওয়া নেই’ বলেই কেঁদে ফেলেন নাইবের বাবা মো. নুরুল করিম।

কেউ সহযোগিতা করতে চাইলে মো. নুরুল করিম, সঞ্চয়ী হিসাব নং- ১৬১১৭, ইসলামী ব্যাংক, নড়াইল শাখা কিংবা নুরুল করিমের বিকাশ নম্বরে অর্থ পাঠাতে পারবেন। তার ফোন ও বিকাশ নম্বর ০১৭১১৮০৭২৯৪।