গোপালগঞ্জে কমেছে খেজুর গাছ

121

এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ : শীতের মৌসুমে সকালে এক দশক পূর্বে ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়তো। গ্রামবাংলার এ দৃশ্য আর নেই বললেই চলে। সাত সকালে খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি ডাক দিত ও ভাই, রস নিবেন না রস। শীতের মৌসুম শুরু হতেই বাড়ি বাড়ি চলতো খেজুরের রস কিংবা রসের পাটালি গুড় দিয়ে মজাদার পিঠাপুলির আয়োজন। শীতের শুরুতে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার নাম মাত্র কয়েকটি খেজুর গাছে রস আহরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে গাছিরা। কিছু দিন পরই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক এই মধু বৃক্ষ (খেজুর গাছ) ঘিরে গ্রামীণ জনপদে শুরু হবে উৎসব মুখর পরিবেশ। তুলনামূলক ভাবে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জে খেজুর গাছ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। গ্রামের মাঠে আর মেঠো পথের ধারে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুর গাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে। যে হারে খেজুর গাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না। রসনা তৃপ্তির উপকরণ সুমিষ্ট রসের জন্যই নয়, জীবনের প্রয়োজনে প্রকৃতির ভারসাম্য ও বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় ব্যাপক ভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা দরকার এমন আকুতি অনেকের।

শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তি কর তা বলে শেষ করা যাবে না। আর খেজুর রসের পিঠা এবং পায়েস তো খুবই মজাদার। এ কারণে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে রসের ক্ষীর, পায়েস ও পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। শুধু খেজুরের রসই নয়, এর থেকে তৈরি হয় গুড় ও প্রাকৃতিক ভিনেগার। রস আর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার খোয়াড় গ্রামের শাহাজুদ্দীন মাতুব্বর বলেন, কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের নাতি-নাতনিরা তো আর সেই দুধ চিতই, পুলি-পায়েস খেতে পায় না। তবুও ছিটে ফোঁটা তাদেরও কিছু দিতে হয়। তাই যে কয়টি খেজুর গাছ আছে তা থেকেই রস, গুড়, পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়।

কোটালীপাড়া উপজেলার নাসিম মাহমুদ জানান, গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এক সময়ে উপজেলায় খেজুর রসের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এখন গাছ যেমন কমে গেছে তেমনি কমে গেছে গাছির সংখ্যাও। ফলে প্রকৃতিগত সুস্বাধু সে রস এখন আর তেমন নেই। তবুও কয়েকটা গাছের পরিচর্যা করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। যে কয়েকটা গাছ রয়েছে তাতে যা পাওয়া যায় তা স্বজনদের নিয়ে মৌসুমি এ রস আস্বাদন করি।

এক বয়স্ক ব্যক্তি জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালো ভাবেই সংসার চালাতেন। এমনকি আগে যে আয় রোজগার হতো তাতে সঞ্চয়ও থাকতো। যা দিয়ে বছরের আরো কয়েক মাস সংসারের খরচ চলতো। যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় রস তেমন পাওয়া যায় না। রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা নেই। তবুও তারা খেজুর গাছ এখনো রক্ষা করে চলেছেন।

জানা গেছে, ইটের ভাটায় ব্যাপক ভাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করায় এ গাছ কমে গেছে। খেজুর গাছ সস্থা হওয়ায় ইটের ভাটায় এই গাছই বেশি পোড়ানো হয়। এছাড়া অনেক সময় ঘরবাড়ি নির্মাণ করার জন্য খেজুরের গাছ কেটে ফেলা হয়। ফলে দিন দিন খেজুরের গাছ কমে যাচ্ছে।