নড়াইলে বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে সুপারির চাষ

0
187
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

মোঃ ইমরান হোসেন, নড়াইল ॥ বাণিজ্যিকভাবে নড়াইলে দিন দিন বাড়ছে সুপারির চাষ। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার সুপারির হাট জমে উঠেছে। নড়াইলের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সুপারি যাচ্ছে নোয়াখালি, লক্ষিপুর, সিলেট, চট্ট্রগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২০টি জেলায়। এসকল হাটকে সামনে রেখে জেলার প্রায় ২ হাজার মৌসুম ব্যাবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত বছরের তুলনায় এবছরে সুপারির দাম বেশি তায় বেশ খুশি স্থানীয় সুপারি চাষিরা।
নড়াইল কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, পূর্ব থেকেই সুপারি উৎপাদন হত কিন্তু তখন বানিজ্যিক ভিত্তিতে সুপারির চাষ হতনা। তখন শুধু জেলার বিভিন্ন বসত ভিটার চারিপাশে, বিভিন্ন পতিত জমিতে,ঘের অথবা পুকুর পাড়ে, রাস্তার পাশে সুপারি গাছ ছিল। সুপারির ফলন ভাল হওয়ায় ও বাজারে সুপারির দাম ভাল থাকায় জেলার চাষিরা দিনে দিনে সুপারি চাষের দিকে আগ্রহ দেখায়। গত ১০ বছর পূর্ব থেকে জেলার চাষিরা সল্প পরিসরে বানিজ্যিক ভিত্তিতে সুপারির চাষ শুরু করে। আর এ চাষে লাভবান হওয়ায় দিন দিন সুপারি চাষ বাড়ছে।
কৃষকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও, কৃষক নেতা ও চাষিদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, জেলায় মোট প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হয়। তবে কৃষি বিভাগ বলছে জেলায় সুপারি বাগান অনেক থাকলেও বানিজ্যিক ভাবে ৬শ ৫০ হেক্টর জমিতে এ চাষ করা হয়েছে। জেলার তিনটি উপজেলাতেই এ চাষ ভাল হয়। তবে সদরে ও লোহাগড়া উপজেলাতে সুপারি চাষ অনেক বেশি।
সাধারনত বেলে-দোয়াশ মাটিতে সুপারি চাষ ভাল হয়। জুলাই- আগস্ট থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সুপারির চারা লাগানো হয়। ৫ ফুট বাই ৫ ফুট দুরত্ব রেখে প্রতিটা চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানোর ৭-৮ বছর পর থেকে ফল আসা শুরু হয়। আষাঢ়-শ্রাবন মাসে গাছে ফুল আসে ফুল থেকে ফল হয় এরপর আশ্বিন-কার্তিক মাসে পরিপক্ক সুপারি গাছ থেকে পাড়া হয়। প্রতি হেক্টর জমিতে ২.৬৮ মে.টন সুপারি উৎপাদন করা হয়। সুপারি গাছে তেমন কোন রোগ হয়না। তবে সুপারি পাকার আগে কোন কোন গাছে সুপারিতে পোকা লাগে। এক প্রকার কিটনাশক প্রয়োগ করে সেটি দমন করা যায়। একটি গাছ থেকে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ বছর একভাবে ফল (সুপারি) পাওয়া যায়।
নড়াইলে সাধারনত বিভিন্ন হাটে -বাজারে সুপারি বেচাকেনা হয়। তবে জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারী হাট হল সদরের রুপগঞ্জ হাট এবং লোহাগড়া উপজেলার এ্যাড়েন্দা বাজার। রুপগঞ্জ বাজারে প্রতিদিনই সুপারি বেচাকেনা হয়, তবে রবিবার ও বৃহস্পতিবারে বড় পাইকারী হাট বসে। এ্যাড়েন্দা বাজারে সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবারে সুপারির বড় পাইকারী হাট বসে, এহাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সুপারি কিনে নিয়ে যায়।
এ্যাড়েন্দা বাজারের ব্যাবসায়ী জয়নুল আবেদিন জানান, স্থানীয় ভাবে ২০০ পিস সুপারিতে এক কুড়ি হয়। বর্তমান বাজারে প্রতি কুড়ি সুপারি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে। প্রতি মৌশুমে আমরা বিভিন্ন বাজার ও গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে সুপারি ক্রয় করে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ব্যাবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করি। লাভ ভাল হয়।
লক্ষিপুর জেলার রায়পুর উপজেলার চরবাবরি গ্রামের সুপারি ব্যাবসায়ী মোঃ নওশার জানান, সে ১৪ বছর যাবৎ নড়াইল থেকে সুপারি ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রয় করে। তিনি প্রতি মৌশুমে ১৫ থেকে ২০ ট্রাক সুপারি নড়াইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রয় করেন। লাভ ভাল হয়।
ব্যাবসায়ীরা জানান, মৌশুমে জেলায় শতাধিক হাট, বাজার ও বিভিন্ন স্থানে সুপারি বেচা কেনা হয়। চাষিদের কাছ থেকে সুপারি ক্রয় করে সাধারন্ত তিনটি পদ্ধতিতে সেগুলো বিক্রয় করে থাকেন। কাচা সুপারি রোদে শুকিয়ে সুপারির খোসা (খোলস) ফেলে দিয়ে প্রতি কেজি শুকনা সুপারি ৪শ থেকে ৭শ টাকা দরে বিক্রয় করে। পাকা সুপারি বাজার থেকে ক্রয় করে পানিতে ৩ থেকে ৪ মাস পচন দিয়ে (ভিজিয়ে) সেগুলো বাজারে বিক্রয় করেন, পানিতে ভেজানো সুপারি কে স্থানীয় ভাষায় মজা সুপারি বলে, এই মজা সুপারির চাহিদা বেশি তায় দামও ভাল পাওয়া যায়। এবং বাজার থেকে সুপারি ক্রয় করে সেগুলো সাথে সাথে বিক্রয় করে থাকেন।
চাষিরা জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় সুপারি চাষে খরচ অনেক কম। চারা লাগানোর প্রথম ২-৩ বছর একটু কষ্ট করতে হয়। তখন ছোট চারা গরু ছাগলে খেয়ে ফেলার ভয় থাকে। প্রথম দিকে জমিতে সল্প পরিমান সারও দিতে হয়। ৫-৬ বছর পর গাছে ফল আসে। একবার ফল আসলে একাধারে অন্তত ৪০ বছর ফল পাওয়া যায়। ফল আসার পরে তেমন কোন খরচ হয়না। প্রতিটা গাছ থেকে বছরে আকারভেদে ৩শ থেকে ৫শ পিস সুপারি পাওয়া যায়।
লোহাগড়া উপজেলার এ্যড়েন্দা গ্রামের সুপারি চাষি নয়ন শেখ জানায়, বাপ দাদার আমল থেকেই আমাদের বাড়িতে অনেক সুপারি গাছ ছিল। প্রতি বছর আমি বসত ভিটার সুপারি গাছ থেকে অনেক সুপারি বিক্রয় করি। গত ৭ বছর পূর্বে এক একর ২২ শতক জমিতে সুপারি বাগান করেছি। আমার নতুন বাগানে গত বছর থেকেই কিছু কিছু গাছে ফল এসেছিল। এবছর বাগানের প্রায় সব গাছেই ফল হয়েছে। এবছরে আমার বাগানে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি খরচ বাদে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা লাভ হবে।
নড়াইল কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর উপ-পরিচালক শেখ আমিনুল হক জানান, এ জেলার মাটি সুপারি চাষের জন্য খুব উপযোগী। এখানে অনেক আগে থেকে প্রচুর সুপারি গাছ ছিল। সুপারি একটি লাভ জনক ফল হওয়ায় জেলার অনেক চাষিরা তাদের পতিত জমিতে সুপারির বাগান করছে। আমরা তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে পরামর্শ দিচ্ছি। দিনে দিনে এ চাষের পরিমানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here