হারিয়ে যেতে বসেছে আধুনিকতার ছোঁয়াতে গ্রাম বাংলার সন্ধ্যা বাতি ‘হারিকেন’

4

ডেস্ক রিপোর্ট: সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার সন্ধ্যা বাতি ঐতিহ্যবাহী ‘হারিকেন’।
হারিকেনকে এক সময় গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির একটা বাহক হিসাবে ধরা হতো কেউবা বা রাত্রিকালীন বন্ধু হিসেবে অখ্যায়িত করত। তৎকালিন সমাজব্যবস্থায় হারিকেন হাতে নিয়ে পিঠে চিঠির ব্যাগ নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলতেন গ্রামের পর গ্রামে। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবাই রাতের বেলাই হারিকেন হাতে নিয়ে বের হতেন। হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হতো বিভিন্ন যানবাহনে। কিন্তু আধুনিকায়নে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতিতে বাজার ভরপুর। যার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে রাত্রিকালীন আলোর একমাত্র উৎস ঐতিহ্যবাহী হারিকেন।

বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, তখনকার সময়ে হারিকেন মেরামতের জন্য উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে মিস্ত্রী বসতো। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি বাজারে ছিল হারিকেন মেরামতের অস্থায়ী দোকান। এরা বিভিন্ন হাট বাজারে ঘুরে ঘুরে হারিকেন মেরামতের কাজ করত। এছাড়া অনেকে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে হারিকেন মেরামত করত কিন্তু এখন আর হারিকেন ব্যবহার না করার ফলে হারিকেন মিস্ত্রীদের এখন আর দেখা যায় না। উপজেলার ময়না গ্রামের বাসিন্দা অমুল্য বিশ্বাস (৫৭) বলেন, এক সময় হারিকেন ছাড়া রাতে ভ্যান নিয়ে চলাচল করা যেত না। কিন্তু এখন বাজারে বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি এলইডি লাইট বের হওয়ায় এখন আর হারিকেনের প্রয়োজন হয় না।

চরবর্নি গ্রামের কবি ছবুর সেক বলেন, আগে রাতে বেলায় বই পড়তে বসার আগেই হারিকেন ছিল নিত্য প্রয়োজন তা নিয়ে নিয়ে টানা টানি করতে হতো। কিন্তু এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। তাছাড়া বাজারে বিভিন্ন ধরনের এলইডি বাল্ব অনেক কম দামে পাওয়া যায়। যার কারণে এখন আর হারিকেনের প্রয়োজন হয় না।এখন আর কোনো ঘরে কিংবা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হাজার বছরের ঐতিহ্যের বাহন সেই হারিকেন এখন আর চোখে পড়ে না।

এখন থেকে দুই দশক আগেও যেখানে বেশিরভাগ ঘরেই ব্যবহার হতো হারিকেন আর দুই দশক পরে এসে সেইরূপ এখন পুরোটাই পরিবর্তিত হয়েছে। দুই দশক আগেও চিত্রটি ছিল এমন যে, সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে সাঁঝের বেলায় নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন সন্ধ্যায় ঘরের আলো জ্বালানো নিয়ে।

প্রতি সন্ধ্যায় হারিকেনের চিমনি খুলে, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে মুকটি খুলে কেরোসিন তেল ঢেলে আবার ফিতার লাগিয়ে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখতো। এটার আলো কমানো ও বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি গিয়ার ছিল। হাতের সাহায্যে তা ঘুরিয়ে আলোর গতিবেগ কমানো ও বাড়ানো যেতো। রাতে ঘুমানোর সময় আলো কমিয়ে সারারাত হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো। হারিকেনের নলে আগুন জ্বালানোর জন্য ফিতা হিসেবে ব্যবহার করা হতো।ফিতার ব্যবহার ছিল চিকন আর লম্বা ৩-৫ ইঞ্চির দৈর্ঘ্যের ওই ফিতা বাতির নল দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতো। প্রতিদিন এর কিছু অংশ জ্বলে পুড়ে যেত। ফের পরের দিন আবার একটু উপরের দিকে তুলে দিতো। এক পর্যায়ে তা পুড়ে গেলে আবার নতুন করে লাগানো হতো। বাজার থেকে ২-৫ টাকায় ওই ফিতা কিনতে পাওয়া যেত। এটা ছিল নারীদের সন্ধ্যাবেলার দৈনন্দিন কাজের বিশেষ একটি অংশ।

দুই দশক আগে শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা ছিল হারিকেন তা জ্বালিয়ে পড়াশুনা করতো। এছাড়াও রাতের সকল কাজ, যেমন রান্না-বাড়া, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, ধান মাড়ানোসহ সকল চাহিদা মেটানো হতো এই আলো দিয়ে।

রাতের বেলায় কোথাও বেড়াতে গেলে প্রতিবেশী কিংবা দূরে কোথাও বাড়িতে গেলে তাদের সঙ্গী ছিল একটি হারিকেন। একজন হারিকেন ধরে সামনে হাঁটতো অন্যরা সবাই পেছন পেছন হাঁটতো। এছাড়াও গ্রামীণ প্রতিটি দোকানে সন্ধ্যা-রাতের প্রদীপ হিসেবে হারিকেনের কদর ছিল খুব বেশি। দোকানিরা কিংবা পথচারীরা রাতের বেলায় হাঁটাচলা করা কিংবা বাড়ি ফেরার পথের একমাত্র সাথি ছিল হারিকেন।তাছাড়া রিকশার পেছনে হারিকেনের ব্যবহার ছিল বেশ জনপ্রিয় বা চোখে পড়ার মতো। আজ অনেকেই এখনো হারিকেনের ব্যবহার করা ভুলে গেছে । তাছাড়া রিকশার পেছনে এখনো হারিকেনের ব্যবহার চোখে পড়ে না।

বর্তমানে গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি ঘরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। যেখানে ছিল না কোন বৈদ্যুতিক লাইট, পাখা, এয়ার কন্ডিশানসহ আরো অনেক কিছু। বর্তমানে বিদ্যুতায়নের ফলে সবকিছুর স্বাদ গ্রহন করছে গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দারা। এখন দিনের বেলায়ও আলো জ্বালাতে হয়। এখন আর শুধু বিদ্যুতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার জন্য আইপিএস ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউবা আবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। হাত পাখার বদলে বৈদ্যুতিক পাখা ও এয়ার কন্ডিশান ব্যবহার করা হচ্ছে।