মুলিয়ায় বেপরোয়া ভূমিদস্যু চক্র, আতঙ্কিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

112

অভিযোগের তীর

বিএনপি নেতা খান কবিরের দিকে

স্টাফ রিপোর্টার ॥‘আপনারা তো চইলে যাবেনেন, পরে তো আমাগে আইসেই ফুটুস দেবেনে, কিডা বুঝে দেবেনে?’ ‘সেই সময়তো কোনো ভাই পাশে আসবেন নানে।হিন্দুগের কোনো দাম নাই। দিনের পর দিন বহু ঘটনা হচ্ছে কয়ডা শোনবেন? যদি কহনো আমরা কথা কওয়ার অধিকার ও সাহস শক্তি পাই তহন মনখুইলে কথা কবেনে সবাই। এহন সবাইর জীবনের ভয় আছেরে দাদা।’কথাগুলো বলছিলেন নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের সাতঘরিয়া গ্রামের এক গৃহবধূ। তিনি এ সময় ক্ষোভে, দুঃখে কেঁদে ফেলেন। সাতঘরিয়াসহ মুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের তিন ফসলি কৃষি জমি ও বাড়িঘর ভূমিদস্যু গং কর্তৃক নামমাত্র মূল্যে নানা কায়দায় হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজখবর জানতে নড়াইলকণ্ঠের একটি টিম সরেজমিনে গেলে ওই গৃহবধূ সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।

নড়াইল সদর উপজেলার ১৩নং মুলিয়া ইউনিয়ন। প্রায় ১২বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত ইউনিয়নের প্রায় শতভাগ মানুষই হিন্দু সম্প্রদায়ের। কৃষির ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা। কিন্তু একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্রের কূটকৌশলে তিন ফসলি কৃষিজমি হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে নিরীহ অসহায় এ মানুষগুলোর। জীবিকার জন্য বাধ্য হয়ে কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে ছুটছেন অন্য পেশার সন্ধানে। আবার অনেকেই অভাব ও ভূমিদস্যু চক্রের ভয়ে বাধ্য হয়ে বাড়িঘর ও জমিজমা বিক্রি করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পাড়ি জমাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, ভারতে পাড়ি জমানো এসব পরিবারের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ভূমিদস্যু চক্রের মূল হোতা নড়াইল শহরের ভাদুলীডাঙ্গা এলাকার প্রভাবশালী এক ভূমিদস্যু নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে নিজদায়িত্বে গাড়ি ভাড়া করে তার সিন্ডিকেটের লোক দিয়ে দেশের সীমান্ত পাড় করিয়ে ভারতে পৌঁছে দেয়।

যে বাড়ি কিনে নেওয়া হয় তার পার্শ্ববর্তী বাড়ি দখলের টার্গেট করে নানা ফন্দি-ফিকির আঁটতে থাকে এ ভূমিদস্যু গং। যেখানে যেভাবে দখল করতে সুবিধা সেই অনুযায়ী চলে অত্যাচার নির্যাতনের ন্যাক্কারজনক পরিকল্পনা। কোথাও রাতের আঁধারে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক মহড়া দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, আবার কোথাও বাড়ি বা কৃষি জমির পাশে গভীর গর্ত খুঁড়ে যাতায়াতের পথ বন্ধ করা ওকৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে জমিতে ফসল ফলানো বন্ধ করা এবং পরবর্তীতে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা। এ চক্রটি ছলে-বলে-কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত বিঘা জমি।প্রভাবশালী এ ভূমিদস্যু চক্রটির অত্যাচারে অতিষ্ঠ ওই এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও অত্যাচার নির্যাতনের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না কেউ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুলিয়া ইউনিয়নের বনগ্রাম, সাতঘরিয়া, ননীক্ষীর, বাঁশভিটা ও সীতারামপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে বিল।এ বিলে ফসলি জমির চেয়ে মৎস্যঘেরের সংখ্যাই বেশি। সামান্য পরিমাণ যে ফসলি জমি আছে তাও জলাবদ্ধ হয়ে আছে। এ জলাবদ্ধতা কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ ঘেরগুলো এমনভাবে কাটা হয়েছে যাতে পাশের ফসলি জমিতে পানি আটকে থাকে। পানি নিষ্কাষনের কোন ব্যবস্থাই রাখা হয়নি।বিলের মাঝখানে আছে সুদৃশ্য কয়েকটি বহুতল ভবন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, ভবনগুলোর মালিক নড়াইল শহরের ভাদুলীডাঙ্গা এলাকার খান কবির। শুধু ভবন নয় সবগুলো ঘেরের মালিকই খান কবিরসহ তার অনুগত কয়েকজন। বিলের বেশিরভাগ জমিই খান কবির কিনে নিয়েছে। যেটুকু বাকি আছে তাও হয়তো বিক্রি করে দিতে হবে। প্রায় সারা বছরই এসব জমি জলাবদ্ধ থাকে। এ জলাবদ্ধতা কৃত্রিম। ঘের কাটার সময় কৃষকদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল কি না এ প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, আপত্তি জানানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল একটু জায়গা ছেড়ে দিয়ে কাটার জন্য। কিন্তু শোনে নাই। প্রভাবশালী মানুষ কি আর দুর্বলের কথা শোনে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নড়াইল-মুলিয়া রোডের পাশে বনগ্রামের গোলক লস্করের বাড়ির সীমানা ঘিরে গভীর গর্ত করে মাটি কাটা হয়েছে। এমনভাবে মাটি কাটা হয়েছে এ পরিবারটির বাড়ি থেকে বেড় হওয়ার রাস্তাটিও রাখা হয়নি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় যেন পাহাড়ি উপত্যকার ওপর জনবসতি। একদমই সীমানা ঘেষে কাটা হয়েছে মাটি। এমনকি কাটার আগে কোন মাপজোকও করা হয়নি। বৃষ্টি হলেই এ বাড়িতে ভাঙন সৃষ্টি হবার আশঙ্কা রয়েছে। কার জমি বা কে গর্ত কেটেছে মুখ খুলতে চান না এলাকাবাসী। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন জানান, এটা খান কবিরের জমি। এইভাবেই ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ত খুঁড়ে পাশের মানুষদের বিপদে ফেলে খান কবির। নানাভাবে হয়রানি করে। একসময় সহ্য করতে না পেরে বিক্রি করে দিয়ে চলে যান জমির মালিক। পরে আবার মাটি ফেলে সেই গর্ত ভরাট করে প্লট তৈরি করে বিক্রি করে খান কবির।

সাতঘরিয়া গ্রামের এক বৃদ্ধা বলেন, আমরা একটু বুলাক করে খাই। কবির সাহেব এই যে ঘের-মের কাইটলো এহন আর ফসল হয়না। বাচড়া হয়ে পড়ে আছে জমি। তালি আমরা কি করে খাবো? এখন বুলাকে হাঁটু সুমান জল। আমার স্বামী কাজ করতি পারে না, আমারও মাজায় সমস্যা।১০ মণ ধান পাই, তাই দিয়ে টুক-টাক খাই তাও যে পাচ্ছি না। এখন কি করবো ফসল হচ্ছে না বলেই তো বেচে দিছি জ্বালার টানে। বাঁচতি হলি বেচতি হবে। পেটে তো আর শোনবে না। জমি কেউ বেচতি চায়? ঘের কাইটেই আমাগে বিলটা শেষ হয়ে গেলো। ঘের যদি না কাটতো তাহলি অভাবও আমাগে আসতো না। তারা তো বড়লোক হয়ে যাচ্ছে। একবার কেচ দেলো বললো যে, যে যে ঘের কাটিছে তাগে নাম লেহে নিয়ে আসো। কিছু বললো না ডিসমিস হয়ে গেলো। এই কয়ডা বছর ফসল হচ্ছে না জ্বালার টানে জমি দিছি আমি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুলিয়া ইউনিয়নের একজন প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশকরে সাংবাদিকদের বলেন,নড়ালে উঁচুস্তরের অনেক সচেতন শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান আছে, তারা কিছু কয় না। আমরা নিরীহ কয় নমশুদ্র আছি এ জাগায়। আমরা যদি প্রভাবশালীগে বিরুদ্ধে কই আমাগের বিচার হবেনে। বাস্তবে তো এখানে বসবাসের অবস্থা নাই। আমিও পরিস্থিতির শিকার হয়ে ইতিমধ্যে ’৯৬ শতক জমি বেচে ফেলাইছি। ওগে সাথে কথা কবো কিওইরে? আমি হলাম উচিৎবাদী। কথা কতি গেলি জাগায়ই একদম বিচার হয়ে যাবেনে, সেই জন্যি বেচে দিছি।

তিনি আরো বলেন, ক্যামেরার সামনে কথা বলার মতো পরিস্থিতি এখানে কারোরই নেই। কবির খান সব মহলকে ম্যানেজ কইরে এ নির্যাতন করে চলেছে। কারে কবো এসব কথা বলেন দাদা? এই সাতঘরিয়ার পাশেই নড়াইল গ্রাম। ওখান থেকে রাতে-বেয়ালে যে কোন সময় মস্তানরা এসে কুপায় থুইয়ে যাবেনে। আমাগের রক্ষা করার কেউ নেই। মাট-ঘাট, বাড়ি সব দখলের পাঁয়তারা চলছে।

সাতঘরিয়া গ্রামের এক যুবক বলেন, জমি নেছে আর কাইটে ফেলিছে।কার কি অসুবিধে হলো তাতে খান কবিরের কি আসে যায়। এখন চারি পাশে যদি ঘিরে ফেলে তালি তো বাস্তবিক কথি হবে- ভাইরে আমার টুকও নেও। আমার তো ফসল এমনিই হচ্ছে না। জল যদি বেরোনির জায়গা থাকতো তাহলি আমার যেটুক আছে তাতেই আমার বছরের খোরাক হয়ে যাতো।

এ নিয়ে কখনো প্রতিবাদ করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ওই যুবক বলেন, সব তো বোঝেন বুঝেও অবুঝের মত কথা কলি তো হবে না। সবাই বেচে দিয়ে পলাচ্ছে। আমার জমির ধারে একজন তার ধান হচ্ছে না বলে বেচে দিয়ে চলে আইছে। তার পর দায় ঠেঁইয়ে আমার টুকও আরেক জনরে দিতি হইছে। আসলে সংখ্যালঘু হলে বহুত কিছু সহ্য করতি হয়, অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করে থাকতি হয়।

ননীক্ষির গ্রামের এক গৃহবধূ এলাকার চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রকাশ্যি কেউ কথা কবে নানে। রাতারাতি আসবেনে। আমার ছেলেরে কুপাবে, নয় আমাগে কুপাবে, নয় কোনো এ্যাক্সিডেন্ট ঘটাবে। এই যে সেদিন খালিখালি রাতির আন্ধারে শিশু ছাওয়ালসহ দীনেশের বৌডারে কুপালো, কি অন্যায় করিছিলো? কিভাবে কথা কবো। কলি তুমরা এই জায়গা থেকে যাবা, পদাচারণ শুরু হয়ে যাবে একটু পরেই। যদি জানতি পারে যে আমার বাড়ি আইছিলো তালি আইসে শোনবে, কিসের জন্য আইছিলো। যদি সত্যি না হয় তালি জুতো খুলে বাড়ি দিবা আমারে দু’ডো। সন্ধ্যে লাগলি ৬ডা থেকে ৯ডা পর্যন্ত লোকজন আসবে আর যাবে। ১০-১১ ডা পর্যন্ত লোক দলে দলে আসবে। ঐ ব্রিজের পরে বসে, বাড়ি হাঁসের খ্যাঁচা উল্টোয় ফেলাবে, বালতি জলের মধ্যে ফ্যালায় দেবে। আবার কোন বাড়ির লোকের গলায় দা ধরবে।

তিনি আরো বলেন, এ গ্রামের বিষয় জানো না তুমরা। ভীষণ খারাপ অবস্থা, গ্রামে আমরা বসত করি আমরা জানি। আমাগে কয়দিন দরজা-জালনায় থাবাইছে। পরে দেহি কি কবির ভাই গেলো। রাত বাজে তখন ১টা। এই বিটিরে কুপাচ্ছে আমি দেখতিছি, ভাত নিয়ে যাচ্ছিলাম তোমার কাকার জন্যি। পরে দেহি যে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে, মনে হয় নড়ালে উঠিছে। পরে দেহি কবির ভাই যাচ্ছে মটরসাইকেলে। তো কার কথা কবো। আন্ধার ঘরে সাপ সকল ঘরে সাপ।

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ রাতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় সাতঘরিয়ার দীনেশ বিশ্বাসের স্ত্রী কাকলী মন্ডল ও তাঁর কাছে থাকা ৭বছর বয়সের ছেলেকে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে দুর্বৃত্তরা। রাতেই তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনাতি দেখা দেয়ায় তাঁকে খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে নড়াইল সদর থানায় অভিযোগও করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে ভিকটিম কাকলী মন্ডলের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি রাতে আমার ছেলেকে নিয়ে বারান্দায় শুইয়ে ছিলাম। হঠাৎ মসারির ওপর দিয়ে কে বা কারা কোপ দেয়। কোপে আমি মারাত্মকভাবে জখম হই, একইসাথে ছেলেও জখম হয়। তবে আমারে কিভাবে কারা কুপাইছে সেইডে তো জানিনে। রাত্রি আইসে কুপাইছেলো ঘুমায় ছিলাম বুঝতে পারিনি। আমি আতঙ্কে চেচাইছিলাম তারপর আশে পাশের মানুষ আইসে নিয়ে গেছিলো হাসপাতালে। কারো সাথে সেই রকম আমার কোনো শত্রুতা নাই। কিভাবে হলো এটা আমি জানি না। যেদিন আমার স্বামী ইন্ডিয়ায় যায় তার একদিন পরেই এমন ঘটনা ঘটিছে।

কে এই খান কবির ?

খান কবির হোসেন নড়াইল সদর পৌরসভার ভাদুলীডাঙ্গা গ্রামের মৃত খান নুরল ইসলামের ছেলে। তরুণ বয়সে তিনি স্থানীয় হাটে-বাজারে লেবুর ব্যবসা করতেন। এ কারণে তিনি স্থানীয়দের মধ্যে লেবু কবির হিসেবে পরিচিত।

২০০১ সালে বিএনপির শাসনামলে খান কবির ছিলেন নড়াইল জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি ২০০২ সালের ০১ নভেম্বর জনতার ভোটে নির্বাচিত নড়াইল পৌরসভার তৎকালীন মেয়র বর্তমান নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন খান নিলুকে ষড়যন্ত্র করে পৌরসভায় আগুণ লাগিয়ে নিজাম উদ্দিন খান নিলুসহ ছয় জনকে আসামি করে মামলা দিয়ে রাতারাতি পৌরসভার কমিশনার থেকে মেয়র বনে যান। সেই থেকে দখলবাজিতে মেতে ওঠেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি’র অনেক চুনোপুটি আটক ও গ্রেফতার হয়েছে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। অনেক ভূমিদস্যু সন্ত্রাসী আইনের আওতায় এসেছে। ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। কিন্তু খান কবিরের কিছুই হয়নি। কারণ ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতার সাথে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে বলে কথিত আছে। ঘরে বসেই এই পাপ পথে উপার্জিত অর্থের ভাগ পান এই প্রভাবশালীরা।

জমি কেনা কবির খানের নেশা। জবর-দখল, নানা রকম কলা-কৌশল ফিকির-ফন্দি করে মুলিয়া ইউনিয়নের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রায় ২০০ (দুইশত) একর তিন ফসলী কৃষি জমিসহ ভিটে-বাড়ি নামমাত্র মূলে নামে-বেনামে কিনে অলস জমিতে পরিণত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দুদক মামলার আসামী খান কবির হোসেন। অভিযোগ আছে তার অত্যাচারে পৈত্রিক ভিটা-মাটি ফেলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেক হিন্দু পরিবার। আর যেসব পরিবার শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করছেন তাদের নানাভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছে তার বাহিনী।

খান কবির হোসেন নড়াইল বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দুদকের চার্সিটভুক্ত আসামী। জিআর মামলা নং-৬৩৭/১৭এন, তারিখ: ২৩.১১.২০১৭। এ মামলায় দুদকের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন (পিপি) অ্যাডভোকেট শরীফ মাহাবুবুল করিম। তিনি জানান, দুদকের এ মামলার চার্সিটভুক্ত আসামী খান কবির হোসেন নড়াইল বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে আগামী ১০ ডিসেম্বর তারিখে হাজিরার ধার্য্য দিন রয়েছে। জ্ঞাত আয়ের বহি:ভূর্ত সম্পদের হিসাব না দেয়ায় ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর দুদক খান কবির হোসেনের বিরুদ্ধে এ মামলা করে।

এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে এই কবির খান দুদককে থোড়াই কেয়ার করে। প্রমাণ মিলেছে ২০১৭ সালে দুদক আয় বহি:ভূর্ত সম্পদের হিসাব চেয়ে খান কবির হোসেনকে নোটিশ দেয়। দুদকের নোটিশ পেয়েও সে তাঁর সম্পদ বিবরণী না দিয়ে স্পষ্টভাবে দুদককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতিতে দুদক এই ভূমি খেকো কবির খানের নামে আইন অবজ্ঞা ও আয়ের বহি:ভূর্ত সম্পদের হিসাব না দেয়ায় ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর দুদক খান কবির হোসের বিরুদ্ধে এ মামলা করে। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে এই ভূমি খোকো খান কবিরের নড়াইল বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে হাজির হয়ে জবাব দেয়ার দিন।

এদিকে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কায় বসবাস করছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুলিয়া এলাকাবাসী। এসব এলাকায় চরম মানববাধিকা লংঘন হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিরাজ করছে জমি-জমা, ভিটেবাড়ি হারাবার, সংশয় রয়েছে গুম, হত্যা ও ধর্ষণেরও।সাবেক এই বিএনপি নেতা সংখ্যালঘুদের ওপর এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন যে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে ভয় পান।

খান কবির হোসেনের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের জমিজমা নানা কৌশলে হাতিয়ে নেয়াসহ হিন্দুদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসব অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, মুলিয়া ইউনিয়নের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তাই আমার নিজস্ব প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তারা আমার কাছে জমি বিক্রি করে। আমি কাউকে নির্যাতন করে বা অন্যায়ভাবে জমিজমা কিনি না।

মুলিয়ায় ভূমি সন্ত্রাস ও সংখ্যালঘুদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে নড়াইল জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মলয় কান্তি নন্দী বলেন,মুলিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৯৫ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। এখানে বেশিরভাগ খেটে খাওয়া গরীব মানুষ। সামান্য কিছু জমিজমা আছে তাদের। ভূমিদস্যুদের চোখ পড়েছে এদের ওপর। নানা কৌশলে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে জমিজমা দখল করে নিয়ে তাদেরকে ভূমি থেকে বঞ্চিত করছে এবং এ অঞ্চলের মানুষ ভূমি থেকে বঞ্চিত হয়ে ভূমিহারা হয়ে, ভূমিহীন হয়ে এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি একটি হিন্দু জনবহুল ইউনিয়ন। কিন্তুএ ইউনিয়নে বিভিন্ন অত্যাচারের কারণে দিন দিন হিন্দু জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদেরকে বিপদে ফেলার জন্য স্কাভেটর দিয়ে কৃষি জমি খনন করে মানমাত্র মাছের ঘের করা, সীমানা চেপে মাটি কেটে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি ও বাড়ি থেকে চলাচলের পথ বন্ধ করছে। মুলিয়া ইউনিয়নের পাশে নড়াইল পৌর এলাকার ৩-৪ জন ভূমিদস্যু সন্ত্রাসীরা এ কাজটি করছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ প্রতিরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তবুও তারা বেপরোয়াভাবে অ্যাটাক করছে। এখানকার মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেছে। যে বা যারা মুখ খুলতে যাচ্ছে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও হামলা করা হচ্ছে। রাতের বেলায় অতর্কিতভাবে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি যেয়ে মহিলাদের গালিগালাজ করে তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। আমি এই প্রচার মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে উর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলতে চাই, এই ধরনের ভূমিদস্যুদের যদি দমন না করা যায়, অবাধ ভূমি দখল প্রতিহত না করা যায় এই ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই ইউনিয়ন অচিরেই হিন্দুশূন্য হয়ে পড়বে।

নানা কৌশলে নামমাত্র মূল্যে কৃষিজমি ও বাড়িঘর হাতিয়ে নেয়াসহ হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ সম্পর্কে নড়াইল জেলা কৃষকলীগের সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, আমি এবিষয়টি শুনেছি। ঘটনাটি অপ্রিয় হলেও সত্য। চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা নানা কৌশলে কম দামে জমি কিনে ঘের কেটে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। ফলে এলাকার মানুষ বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করছে। এ সব সমস্যা নিয়ে ইতিমধ্যে আমি মুলিয়া ইউনিয়নের কৃষক লীগের নেতৃবৃন্দদের সাথে কথা বলেছি। তাতেও কোন প্রতিকার করতে পারিনি। আমি জেনেছি সম্প্রতি মুলিয়া এলাকার লোকজন এর প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট একটি দরখাস্ত দিয়েছে। আমি প্রত্যাশা করবো, জেলা প্রশাসক মহোদয় এই এলাকার সংখ্যালঘু লোকগুলো যাতে তাদের জমি-জিরাত ছেড়ে ভারতে না চলে যায় সে বিষয়ে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন।

নড়াইল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতিঅ্যাডভোকেট নজরুল ইসলামের নিকট মুলিয়ায় নানা কৌশলে হিন্দুদের জমিজমা দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুলিয়া ইউনিয়নসহ নড়াইলে যেসব বিলে ভূমিদস্যুরা মাছের ঘেরের নামে সংখ্যালঘুদের ও কৃষকের জমি আত্মসাৎ করছে প্রশাসনকে বিষয়টির ওপর নজর দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রশাসনের নাকের ডগায় মুলিয়া এলাকার সংখ্যালঘুদের জমিজমা নানা অজুহাতে, নানা কৌশলে নামমাত্র মূলে হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। একইসাথে সরকারের নিকট আমাদের দাবি ‘ভূমি নীতি ও ভূমি সংস্কার’ দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। মুলিয়া যুব কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোন মস্তান ঢুকে দেখুক। তিনি ২/১ দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত গোলক লস্করের বাড়ি পরিদর্শনে যাবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, আপানারা যার বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন আমি তার বিষয়ে কিছু বলতে পারবোনা। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আমার কাছে খান কবিরের কর্মকান্ড সম্পর্কে লিখিত অভিযোগ আসে নাই তবে বনগ্রামের গোলক লস্করের বাড়ির সাথে উঁচু ভিটের মাটি এস্কেভেটর দিয়ে কেটে নিয়ে যেতে দেখেছি।

নানা কৌশলে নামমাত্র মূল্যে সংখ্যালঘুদের জমিজমা হাতিয়ে নেয়াসহ তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন,বাংলাদেশ আসলে এমন একটি যায়গা যেখানে সকলের জন্য সুন্দর আবাসের ব্যবস্থার জন্য আমারা বদ্ধ পরিকর। সেই যায়গা থেকে আমরা মাঠ প্রশাসনে যারা আছি, আমাদের আওতাধীন এলাকায় এই ধরনের কোনো ঘটনা আমরা প্রশ্রয় দিবো না বা দিচ্ছি না। যেখানে এই ধরনের কোনো মেসেজ থাকবে সেখানেই আমরা কঠোর এবং আমি মুলিয়া সম্পর্কে যে মেসেজটি পেলাম আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই যাদের এগেনেস্টে ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে তাদের আমরা প্রতিকার দেবো এবং যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনবো।