শিশুদের নোবেলখ্যাত আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কারে ভূষিত সাদাত

38

ডেস্ক রিপোর্ট ॥ নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন ‘কিডস-রাইটস’ নোবেলখ্যাত ‘আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করল কিশোর সাদাত রহমান সাকিবকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ, মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তরুণ প্রজন্মকে প্ল্যাটফর্ম দেওয়ায় ১৭ বছরের কিশোর সাদাত রহমান সাকিব বাংলাদেশের জন্য সাফল্য বয়ে এনেছে।

গত শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়। মালালা ইউসুফজাই অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত থেকে সাদাতের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। সাদাতের সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল মেক্সিকোর ইভান্না ওরতেজা সেরেট ও আয়ারল্যান্ডের সিয়েনা ক্যাস্টেলন। গত ২৯ অক্টোবর চূড়ান্ত ওই তিন প্রতিযোগীর নাম ঘোষণা করা হয়। ৪২টি দেশের ১৪২ জন শিশুর মনোনয়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল সাদাতের বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার দৌড়।

সাদাত রহমান মাগুরা সদর উপজেলার আলোকদিয়া গ্রামের মো: সাখাওয়াত হোসেনর একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবা ২০১৭ সালে পোস্টমাস্টার হিসেবে নড়াইলে যোগদান করেন। তখন তিনি পরিবার নিয়ে নড়াইলে আসেন। এ সুবাদে ২০১৭ সালে সাদাত নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এই স্কুল থেকে ২০১৯ সালে এসএসসি পাশ করে আব্দুল হাই সিটি কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি হয়। সে বর্তমান আব্দুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্র।

সাদাত ২০১৭ সালে নড়াইল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামের একটি সংগঠনটি। বর্তমানে এ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দু’শ জনের ওপরে। সংগঠনটিতে ১১ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে। গত বছর অক্টোবর মাসে এ সংগঠনের একটি শাখা হিসেবে সাইবার টিনসের যাত্রা শুরু। সাইবার টিনস পরিচালনা করে সাত সদস্যের একটি দল।

নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে ছাত্র মেহেদী হাসান বর্তমানে নড়াইল ভলান্টিয়ার্সের সাংগঠনিক সম্পাদক। মেহেদী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ওইসব অর্জনের কথা তুলে ধরে বলেন, মূলত নড়াইল ভলান্টিয়ার্সের একটি প্রজেক্ট হলো সাইবার টিনস। এ ধরনের প্রযুক্তিগত নানা ইনোভেশন তৈরি করছে নড়াইল ভলান্টিয়ার্স। সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

মেহেদী আরো বলছিলেন, সাইবার বুলিং, স্প্যামিং, হ্যাকিং, গুজব, অনলাইন সেফটিসহ নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ে সচেতন করে তুলতে কাজ চলছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক তরুণ উদ্যেক্তা সৃষ্টিরও কাজ চলছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে নানা কাজ করা হয়েছে। সর্বোপরি সাইবার টিনসের মাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের শিকার ভুক্তভোগীর তথ্য গোপন রেখে অভিযুক্তকেও নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি অপরাধ পর্যায়ে পৌঁছালে পুলিশ সুপারকে জানানো হয়। এভাবে নড়াইলে ৬০টি ঘটনা সমাধান করা হয়েছে। আটজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ইনোভেশনটিকে গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার কর্তৃপক্ষ।

মনোনয়নের নেপথ্যে কথা জানান সাদাত নিজেই, আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে ৪২টি দেশের ১৪২ জন শিশুর মনোনয়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল সাদাতের বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার দৌড়। এই প্রাথমিক মনোনয়নটি হয়েছে নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরার প্রচেষ্টায়।
জেলা প্রশাসক বলছিলেন, সাইবার টিনস অ্যাপটির ধারণা দেওয়ার পর তা এগিয়ে নিতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন থেকে নানাভাবে সহায়তা করা হয়েছে সাদাতকে। শিশু শান্তি পুরস্কারের প্রাথমিক মনোনয়নের জন্য কর্তৃপক্ষকে আমি লিখেছিলাম। তাঁদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিংও হয়েছে। সৃজনশীলতার বিকাশে সাদাতের মেধার তুলনা নেই। একের পর এক তার মেধার স্বীকৃতি সে পাচ্ছে। শুক্রবারের পুরস্কার ঘোষণার পর মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

সাইবার টিনস অ্যাপের মাধ্যমে নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিমউদ্দিনকে সরাসরি জানানো হয় সাইবার বুলিং বিষয়ে। এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। সাইবার টিনসে অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার ভিডিও বিজ্ঞাপনও ছেড়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

পুলিশ সুপার বলছিলেন, সাদাত একজন কিশোর শিক্ষার্থী। সে তার উপলব্দিকে মনের মধ্যে না রেখে সামাজের জন্য এগিয়ে আসে। তার ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে আমরা কাজ করি। তার সাফল্যে আমরা গর্বিত অংশীদার।

সাদাতের কলেজের অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান মল্লিক বললেন, অত্যন্ত বিনয়ী ও সৃজনশীল মনের মানুষ সাদাত। সে সামাজিক কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

শিশু শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর সাদাত বলেছে, আমি পুরস্কার হাতে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। এ অর্জন আমাকে যেমন কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস তেমনভাবে এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরেরা সুন্দর একটি পৃথিবী উপহার দিতে এগিয়ে আসবে। এরপর সারাদেশে স্কুল-কলেজে নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে কর্মশালা করার চিন্তা আছে।
সাদাত সম্পর্কে কিডস রাইটসের ওয়েবসাইটে তাকে তরুণ চেঞ্জমেকার ও সমাজসংস্কারক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তার বন্ধুদের সহায়তায় সে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন শুরু করে। এরপর গড়ে তোলে ‘সাইবার টিনস’ মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরিরা জানতে পারে কীভাবে ইন্টারনেট দুনিয়ায় সুরক্ষিত থাকা যায়।

নড়াইল ভলান্টিয়ার্স ‘অপরাজিতা’ নামে একটি শর্ট ফ্লিম তৈরি করেছে। সেটি কলকাতা সত্যজিৎ রায় ফ্লিম ইন্ডাজট্রিজ, ইউএনডিপি ও এসডিজি পুরস্কার পেয়েছে। ২০১৮ সালে জয়বাংলা ইয়থ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে নড়াইল ভলান্টিয়ার্স। ঢাকায় পুরস্কারটি তুলে দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। একশনএইডের ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ-২০১৯’ অর্জন করে সংগঠনটি। এ ছাড়াও জাতীয় আরও কিছু অর্জন রয়েছে।

সাদাত তার বন্ধুদের সহায়তায় ‘নড়াইল ভলেন্টিয়ারস’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছে। সংগঠনটি ২০১৮ সালে “জয় বাংলা ইয়ুথ” অ্যাওয়ার্ড পায়। এছাড়া বেসরকারি সংস্থা একশন এইডের ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ-২০১৯’-এ বিজয়ী হয়। বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে ইন্টারনেট সেফটি নিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে সাদাত ৪৫ হাজারেরও বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে তার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। নিজের এলাকার প্রতিটি স্কুলে ‘সাইবার ক্লাবস’ তৈরি করেছে। এসব ক্লাবে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া হয়।

এই উদীয়মান তরুণের প্রতিটি অর্জনের সাথে জেলা প্রশাসন নড়াইল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করছে। সাইবার বুলিং রোধে কাজ করায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন ‘কিডস-রাইটস’ এর কাছে প্রায় ৩ মাস আগে বর্ণিত অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির জন্য জেলা প্রশাসক তার নমিনেশনের আবেদন প্রেরণ করেন এবং সবসময় ‘কিডস-রাইটস’এর সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন। ‘কিডস-রাইটস’ সংগঠনটির পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। এই তরুণ উদ্ভাবককে কাজে লাগিয়ে তার উদ্ভাবিত আইডিয়াসমূহ বিভিন্ন উদ্ভাবনী মেলায় প্রেরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন নড়াইলের অনলাইন কুরবানির হাট অ্যাপটিও তাকে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। সাদাত ও তার দলের এ উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের সহায়তায় একটি অস্থায়ী অফিসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।