মাগুরায় প.প. কার্যক্রম কাগজ কলমে শতভাগ, বাস্তবে বিস্তার ফাঁক!

51

মাগুরা শহরের দোয়ারপাড়ের বাসিন্দা চায়না বেগম (২৮)। স্বামী আজিজ মিয়া পেশায় ভ্যানচালক। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। আবার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা তিনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। স্বামীর একার রোজগারে এতগুলো মানুষের আহার জোটানো সম্ভব হয় না। তাই চায়নাকেও কাজ করতে হয়।

চায়না বেগম বলেন, ‘ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করি। বড় মায়েডার ওপর সংসার য়েলায় থুয়ে কামে চলে যাই। না যায়ে কী করব। সংসারে এত খরচ। ছোটো ছেলেডার বয়স তিন বছর। বাইরে কাজ করি, তাই ঠিকমতো তার যত্ন নিতে পারি না। ভাই-বোনগের কোলে কোলে বড় হচ্ছে।’

আবার বাচ্চা নিলেন কেন, পরিবার পরিকল্পনা করেন নাই? এই প্রশ্নের জবাবে চায়না বেগম বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনার কথা মানুষের মুখে শুনছি। কিন্তু কেউ কোনো দিন আমার কাছে আসে নাই। কেমনে কীভাবে হয় তাই জানি না। স্বামীও কোনো দিন কিছু কয় নাই।’

শুধু চায়না বেগম নয়, মাগুরার চার উপজেলার বহু নারী পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেক সন্তানের মা হচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে প্রচার, সঠিক পরামর্শ ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নিয়মিত বিতরণ না করায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম কার্যত মুখথুবড়ে পড়েছে। এতে দুর্গম চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় পরিবার পরিকল্পনার তথ্য ও জন্ম নিয়ন্ত্রণসামগ্রী না পৌঁছানোয় বাড়ছে জনসংখ্যা। বিশেষ করে দরিদ্র ও অক্ষর জ্ঞান নেই এমন শ্রমজীবী পরিবারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চার উপজেলায় অফিসসহ মাঠ পার্যায়ে ৭২ জন পরিবারকল্যাণ সহকারীর পদ রযেছে। বর্তমানে ১৭টি পদ শূন্য। সদরে রয়েছে ২২, শ্রীপুর উপজেলায় ১১ জন, শালিখায় রয়েছে ১২ জন ও মহম্মদপুর উপজেলায় ১০জন।

জেলায় জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে নারী পুরুষের মধ্যে সক্ষম দম্পত্তি রয়েছেন ১৯ হাজার ৩৮ জন। চলতি বছরে মোট জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯জন। পদ্ধতি গ্রহণকারির হার শতকরা ৭৮ দশমিক ৬০ ভাগ।

সরেজমিন অন্তত ত্রিশটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো সরকারি সামগ্রী বা পরামর্শ পান না। তারা বাজার থেকে বড়ি কিনে খান।

মাগুরা পারনান্দুয়ালি গ্রামের রিকশাচালক আলতাফ মিয়া বলেন, শুনেছি সরকার জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে দেয়। তবে কোনোদিন পাইনি।

শহরের পিটিআই এলাকায় হোটেল কর্মী রিয়াজ শেখ বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে বাজার থেকে বড়ি কিনতে হয়। স্ত্রী সরকারি বড়ি খেতে চায় না।

শহরতলির দোয়ারপাড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে বেশির ভাগ পরিবারে সন্তান পাঁচ থেকে সাতজন। রেহেনা খাতুনের সন্তান চারজন। এতে সন্তান নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বুড়া বয়সে ঝিপুতপলা তো খাওয়াবি।’

তিনি আরও বলেন, রিকশাচালক স্বামী। বেশি টাকা আয় হবে তাই বেশি বেশি সন্তান নেওয়ার কথা বলেন। কেউ আমাদের বেশি সন্তান নেওয়ার খারাপ দিক সম্পর্কে জানায়নি।

পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণকারীর হার, জনসখ্যা বৃদ্ধির হার ও জনসংখ্যার প্রজননক্ষম অংশ সম্পর্কে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কাগজ-কলমে পরিবারকল্যাণ সহকারীরা প্রায় শতভাগ সাফল্যের খতিয়ান লিপিবদ্ধ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের তিনজন মাঠ পর্যায়ের পরিবারকল্যাণ সহকারী জানান, বাজেটে বরাদ্দ কমের পাশাপাশি জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। পরিবার পরিকল্পনার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণে মানুষের এখনো অনিহা রয়েছে। বিশেষ করে পুরুষেরা কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাননা।

মাগুরা মাতৃসদন হাসপাতালের ডাক্তার নন্দদুলাল বিশ্বাস বলেন, অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্যেগে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। অধিকাংশ মানুষ এখন এ বিষয়ে সচেতন। দরিদ্র ও অসচেতন একটি শ্র্রেণির জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে মাগুরা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নিরঞ্জন বন্ধু দাম বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে যে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় তা যথেষ্ট নয়। এত কম বরাদ্দ দিয়ে যথাযথভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো সম্ভব নয়। ফলে জনসংখ্যা বাড়ছে। তবুও বিভিন্নভাবে প্রচারণার কাজ চলছে।

পরিবার পরিকল্পনার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণ বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো ও মোট প্রজনন হারকমানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকেই জন্ম নিয়ন্ত্রণ-সামগ্রী ব্যবহারের কৌশল সম্পর্কে অজ্ঞ। এজন্য লোকবলের অভাবকে দায়ী করেন তিনি।

প্রতিবেদক : আনোয়ার হোসেন শাহীন, মাগুরা।