বেসিক জার্নালিজম

50

মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। এর পাশাপাশি কৌতূহল এবং জানার আগ্রহ। সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা। বেসিক জার্নালিজমের জন্য যে নৈপুণ্য দরকার সে বিষয়ে বিভিন্ন লেকচার এবং বিবিসির সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে টুডে অনুষ্ঠানের প্রাক্তন সম্পাদক কেভিন মার্শ-এর দেয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই গাইড।

বেসিক জার্নালিজম:
এই দুটো শব্দ এক সাথে বললে মনে হয় একই কথা দু’বার বলা হচ্ছে। সেটা মনে হবারই কথা। সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা, এমন কিছু বলা যেটা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, তাদের ধরে রাখবে। সকল সাংবাদিক – এমনকি যাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি – দুশ্চিন্তায় থাকে তাদের কাজ কতটুকু মৌলিক বা অরিজিনাল হচ্ছে, তা নিয়ে। কোথা থেকে পরবর্তী অরিজিনাল স্টোরি আসবে, তা নিয়ে। মৌলিক সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ নৈপুণ্য দরকার। সেই নৈপুণ্য আপনি শিখতে পারেন, কিন্তু এই পেশায় অনেকে মনে করছেন এই বিশেষ নৈপুণ্য কাজে লাগানোর সুযোগ ক্রমশ: কমছে।

মাত্র কয়েক বছর আগের তুলনায় সাংবাদিকদের এখন অনেক বেশি স্টোরি তৈরি করতে হয়। বেশি কাজ উৎপাদনের চাপে আপনি ভাবতে পারেন আপনার আসল কাজ হচ্ছে সব কিছু প্রক্রিয়াজাত করা – নতুন কোন গল্পের কথা ভাবা বা অনুসন্ধান করা নয়। তাছাড়া, আজকাল ইন্টারনেটে যেভাবে তথ্য এবং অপ-তথ্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে সঠিক তথ্য খুঁজে পেতে গিয়ে ডুবে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

মনোভাব এবং অভ্যাস :
মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পরিশ্রম। এখানে দায়সারা গোছের কিছু করলে চলবে না – এখানে কঠোর পরিশ্রম দরকার, শুধু কয়েকদিনের জন্য নয়, অনবরত। এখানে মনোভাবের প্রয়োজন হতে পারে এবং অভ্যাসের প্রয়োজন নির্ঘাত হবে। সিদ্ধান্তটা আপনার।

কৌতূহল :
আমি যখন এই লেকচার এবং কর্মশালাগুলোর পরিকল্পনা করছিলাম, তখন বিবিসির অনেক সম্পাদক, রিপোর্টার. প্রযোজক এবং গবেষক-এর সাথে আমার কথা হয় এবং আমি তাদের পরামর্শ নেই।

সবার তালিকায় – এবং বেশির ভাগ তালিকার শীর্ষে – ছিল একটি শব্দ। কৌতূহল। আপনি যদি পুরোপুরি উৎসুক না হন, তাহলে আপনি আপনার সময় নষ্ট করছেন। কিছু জানার ইচ্ছা দিয়েই স্টোরি খোঁজার কাজ শুরু হয়।

‘আপনি যদি কখনোই নিজের একটি স্টোরি আইডিয়া মাথায় নিয়ে কাজে না আসেন, তাহলে আপনার স্টোরি খোঁজার কৌশল রপ্ত করা উচিত।’

বিবিসি বেলফাস্ট টিম-এর একজন বলছেন তাদের এক সম্পাদক কী করতেন :
‘তিনি একটি রাস্তার পুরোটা হেঁটে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতেন যে, তিনি সেই রাস্তার ৫০০ গজের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে বেশি স্টোরি খুঁজে পাবেন – যেমন, রাস্তায় ময়লার পরিমাণ, পার্ক করার সুবিধা, নতুন গাড়ির সংখ্যা, ট্রাফিক পুলিশ, কফির দোকান ধুমপানরত লোকজনে ভরা, কারণ অফিসে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, দোকান খুলেছে, বন্ধ হচ্ছে, রাস্তায় ভিক্ষুক, নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে।

আমরা কত দিন একটি নির্মাণাধীন ভবনের পাশ দিয়ে যাই কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করিনা, আপনারা এখানে কী বানাচ্ছেন?’

আরেকজন সম্পাদক বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন:
‘আপনার মনে জানার আগ্রহ এতই প্রবল হতে হবে যে, আপনি একটি সাদা দেয়াল দেখে জানতে চাইবেন, এই দেয়ালে কিছুই নাই কেন?’

প্রশ্ন করুন, কেন…. এবং তারপর, কেন না
তাহলে আপনি আপনার কৌতূহলী মনকে কীভাবে জাগাবেন?
আপনি অবশ্যই প্র্যাকটিস করবেন। তবে সাবধান থাকবেন: আপনি যদি বিষয়টি ভালমতো রপ্ত করে ফেলেন, তাহলে আপনি কিন্তু বেশ বিরক্তিকর মানুষ হয়ে যেতে পারেন!

আপনি এমন একটি মনোভাব তৈরি করতে যাচ্ছেন, যার ফলে আপনি ‘কেন এরকম হলো’, বা ‘এখানে আসলে কী হচ্ছে’ ইত্যাদি প্রশ্ন চিন্তা না করে কারো কথা শুনতে পারবেন না, বা কোন পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়তে পারবেন না, এমনকি কোন রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে পারবেন না।

আপনি যা দেখলেন বা শুনলেন বা পড়লেন, সেটা দিয়ে যেসব প্রশ্নের জবাব পান নি, সেসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে নিজেকে বাধ্য করুন।

পত্রিকার ‘সংক্ষেপে বিশ্ব খবর’ সেকশনে গিয়ে প্র্যাকটিস করুন – সেখানে সব চেয়ে ছোট খবরটি পড়ুন এবং ঐ কয়েক লাইনে যেসব প্রশ্নের জবাব নেই, সেই প্রশ্নগুলো ভাবুন।

নিজের প্রতিক্রিয়া দেখুন
যে কোন স্টোরি বা ঘটনা নিয়ে আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল সেটা শুনুন।
শুরু করার জন্য কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে নিরপেক্ষতা থেকে সরিয়ে নিন। আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া বা প্রথম চিন্তা কী ছিল? অন্যান্যরা কি তাই ভাববে? যখন আপনি আপনার প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করবেন, তখন কী হবে? আপনার ভাবনাকে সেটা কোথায় নিয়ে যাবে?
আর আপনি প্রতিদিন যেসব জিনিস নিয়ে কাজ করেন সেগুলো নিয়েই প্র্যাকটিস করুন – দেখবেন, হয়তো অন্যান্যরা যেটা দেখতে পারেনি, আপনি সেটাই খুঁজে পাবেন।

বিবিসি নিউজ নাইট-এর মাইকেল ক্রিক বলছেন:
‘’এমনকি যখন প্রতিদিনের সাধারণ একঘেঁয়ে প্রযোজনার কাজ করছেন, সব সময় জিজ্ঞেস করুন, ‘আমি কী বলতে পারি যেটা এই স্টোরির জন্য নতুন কিছু হবে’?
এই ভাবে চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু করার বড় দিক হচ্ছে, আপনাকে কোন কিছুই জানতে হবে না। শুধু উৎসুক হন আর ভাবুন। একজন সিনিয়র সম্পাদক উত্তর ইংল্যান্ডের এক স্থানীয় রেডিও স্টেশনে তার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট-এর কথা মনে করে বলছেন:
‘আমি কিছুই জানতাম না। আমি ঐ শহরকে চিনতাম না, আমার কোন কন্টাক্ট ছিল না, কোথায় শুরু করতে হবে তাও জানতাম না। তারপর প্রধানমন্ত্রী – তখন ক্ষমতায় ছিলেন মারগারেট থ্যাচার – আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন।

আমার হাতে তখন তেমন কোন কাজ ছিল না। আমি তখন নিজেকে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর জায়গায় কল্পনা করলাম। তারপর স্থানীয় এক রপ্তানিকারক কোম্পানির প্রধান নির্বাহীকে আগাম যোগাযোগ ছাড়াই টেলিফোন করলাম। তিনি ক্ষমতাসীন টোরি দলের স্থানীয় একজন নেতা ছিলেন, এবং সরকারের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন। তার সাথে সাক্ষাৎকার আমাদের নিউজ বুলেটিনের লিড স্টোরি হয়ে যায়। সাক্ষাৎকারের ফলো-আপ দিয়ে স্থানীয় পত্রিকা এবং আঞ্চলিক টেলিভিশনের প্রধান খবর হয়ে যায়।’