স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বন্ধের মরিয়া হয়ে দৌড়ঝাপ

17

বৈশ্বিক মহামারি (কোভিড-১৯)করোনাভাইরাস সংক্রামণ প্রাদুর্ভাবে দেশেরে মানুষ যখন দিশেহারা তখন দেশের কতিপয় দুর্নীতিবাজ মতলববাজদের খপ্পরে পড়ে দেশ এখন বিশ্বের দরবারে নিন্দিত হচ্ছে। অতিসম্প্রতি করোনাকালে সরকারের প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম দুর্নীতি খুজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এরমধ্যে জেকেজি-রিজেন্টের পথ ধরে একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের প্রতারণার ঘটনা উন্মোচিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে র‌্যাবের অভিযানে তাদের প্রতারণার নাটকীয় সব ঘটনা সামনে চলে আসছে। আর এতেই চিকিৎসার নামে বছরের পর বছর ধরে প্রতারণা করে আসা স্বাস্থ্য খাতের রাঘববোয়ালরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে প্রভাবশালী একটি চক্র চলমান অভিযান থামানোর মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে লবিং চালাচ্ছে তারা।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরিবর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, জেকেজি-রিজেন্টকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে রাজধানীর সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে প্রতারণা চালিয়ে আসা আরও শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রয়েছে। ধাপে ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হবে। দুর্নীতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। এ অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে ব্যাপক জনমতও তৈরি হয়েছে।

সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে চলমান অভিযান আরও জোরালো করার পক্ষে মত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে একটি চক্র সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। করোনা পরিস্থিতি না এলে হয়তো এদের মুখোশ উন্মোচন হতো না। জেকেজি-রিজেন্ট হাসপাতালের মতো ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা অন্য প্রতারকদেরও বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন।

চলমান অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, যারা বা যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, তারা কেউ ছাড় পাবেন না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেই এই অভিযান চলছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কেউ প্রতারণা করবে- এটি আমরা হতে দিতে চাই না। এক্ষেত্রে যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক, কেউই কোনো ছাড় পাবেন না।

স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি অনুসন্ধানে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। টাস্কফোর্সের সদস্যরা স্বাস্থ্য খাতের সব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবেন না।

মুখোশের আড়ালে প্রতারণা :দেশে করোনা সংক্রমণের পর নমুনা পরীক্ষা নিয়ে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ভর করেছিল। একইভাবে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও একের পর এক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দুর্যোগময় ওই সময়ে সরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে মনোবল ফেরান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার চিকিৎসা দূরের কথা অন্যান্য রোগে আক্রান্তদেরই চিকিৎসা দিচ্ছিল না। করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছিল না। এতে করে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে পথেই মৃত্যু হয় অনেকের। উচ্চ আদালত থেকেও রোগী ভর্তির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। জনবল সংকটের কারণে নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহের কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে জেকেজি হেলথ কেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। আর করোনার চিকিৎসার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহের কাজেও এগিয়ে আসে রিজেন্ট হাসপাতাল।

সবাই যখন মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল, সেই সময়ে এই দুই প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসার ঘটনা দেশব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছিল। গণমাধ্যমেও তাদের নিয়ে প্রশংসাসূচক আলোচনা, প্রচার ও প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ভয়ংকর প্রতারণার কথা প্রকাশ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সুবাদে। নমুনা সংগ্রহের নামে ভুয়া সনদ প্রদান ও চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে তারা শুধু মানুষের জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। জেকেজি ও রিজেন্টের প্রতারক চক্রের সবাইকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রিমান্ডে তাদের স্বীকারোক্তিতে প্রতারণার একের পর এক অজানা কাহিনী বেরিয়ে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি আজ সবার মুখে মুখে। রিমান্ড শেষে জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার স্বামী আরিফুলের এখনও রিমান্ড চলছে। রিজেন্টের মহাপ্রতারক সাহেদকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। এতে প্রতিদিনই তার সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসছে। এর মধ্যেই গত রোববার করোনা চিকিৎসা ও নমুনা পরীক্ষায় প্রতারণার অভিযোগে সাহাবুদ্দিন মেডিকেলে অভিযান চালান র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই দিনই প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত সোমবার অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মালিকের ছেলে ফয়সাল আল ইসলামকে। প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া করোনা সনদ দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়াই অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে আসছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আবু সাঈদের বিরুদ্ধে পিসিআর ল্যাবে করোনা ভাইরাসের রিপোর্ট পরীক্ষা করে তা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পাবনার ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রতারণার অভিযোগে ঈশ্বরদী রূপপুর মেডিকেয়ার ক্লিনিকের মালিক আব্দুল ওহাব রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানের ঘটনায় অনিয়মে জড়িত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নজরদারিতে আরও শতাধিক প্রতিষ্ঠান :করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে প্রতারণায় জড়িত আরও শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই তালিকায় অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানেরও নাম রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পাশাপাশি ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭ হাজার ২৪৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় বছরের পর বছর ধরে অনৈতিক কাজ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। করোনা মহামারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনার নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নমুনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট প্রদান থেকে শুরু করে চিকিৎসায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় সবকিছুই করা হয়েছে। গত সোমবার রাজধানীর লেকভিউ, সিনসিন ও আল আশরাফ নামে তিনটি হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। যখনই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে সঙ্গে সঙ্গে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটিই সরকারের নির্দেশনা। সুতরাং যত বড় বা শক্তিশালী ব্যক্তিই হোক না কেন অন্যায় করে কেউ রেহাই পাবে না। এ অবস্থায় সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করুন।

অনুকম্পা চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : চলমান অভিযানের মুখে তটস্থ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকরা গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়ে স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর সহায়তা চান। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানান তারা। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মন্ত্রীকে বলেন, যদি কেউ অন্যায় করে তাকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্তের মধ্য দিয়ে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। র‌্যাবের অভিযানের পর অনেক চিকিৎসক চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। তারা কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মবিন খান বলেন, যেভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে তাতে রোগী এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভীতি ছড়াচ্ছে। অনেক বড় বড় হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন নেই। কিন্তু লাইসেন্স নবায়নের জন্য অনেকে টাকা জমা দিয়েছেন। আবার অনেকে প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। করোনা মহামারির এই সময়ে এসব বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবির প্রসঙ্গ তুলে ধরে মবিন খান আরও বলেন, সবকিছু যাতে নিয়মমাফিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সেই দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং আতঙ্ক যাতে না ছড়ায়। মন্ত্রী এ ব্যাপারে তাদের আশ্বস্ত করেছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এতে কেউ ছাড় পাবেন না।