করোনায় জাভার দিনগুলো : এরফান, ইন্দোনেশিয়া

77

নড়াইল কণ্ঠ : মো: এরফান রাশেদ নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের পংকবিলা গ্রামের সন্তান। মো: এরফান রাশেদ গতবছর আগস্টে ইন্দোনেশিয়ান সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ‘ইন্দোনেশিয়ান কালচার’ এর ওপর একবছরের কোর্সে ইন্দোনেশিয়ার আহমেদ দালান বিশ্ববিদ্যালয় অংশ্রগহণ করেন। এ বছরের জুন মাসে এ কোর্স শেষ হওয়ার কথা। এরমধ্যে বৈশ্বিক মহামারি (কোভিড-১৯) করোনাভাইরাস সংক্রমনের আগমন।

ইন্দোনেশিয়া সরকার ও সাধারণ মানুষের আচার-আচারণ সম্পর্কে যে বাস্তব উপলদ্ধি অর্জন করেছেন মো: এরফান রাশেদ সে বিষয়টি ‘নড়াইল কণ্ঠ’ এ তুলে ধরার জন্য অনুরোধ করেন। আমরা তাঁর লেখাটি হুবহু নিচে তুলে ধরলাম। আশা করি লেখাটি আপনার চেতনা, কালচার, অভ্যাস পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

মোঃ এরফান রাশেদ, ইন্দোনেশিয়া : সময় খুবই দ্রুত চলে । বাল্যকালে বাংলা বইয়ে পড়েছিলাম নদীর ¯্রােত ও সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তাই দেখতে দেখতে ইন্দোনেশিয়ান সরকারের শিক্ষাবৃত্তির সময়ও শেষ হবার পথে। পৃথিবী আজ তার নির্মম প্রতিশোধে ব্যস্ত। সারা পৃথিবীতে আজ মানুষের বদলে করোনার কোলাহল। এ এমনই এক রোগ যদি বউয়ের হয় তাহলে স্বামী নামক অবলা প্রাণীটিও তার কাছে ঘেসবে না। ঔষধের আবিস্কার এখনও হয়নি। এমতাবস্থায় আমার ইউরোপীয় বন্ধুরা মার্চের শেষ নাগাদ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছে। সেখানে তারা আছে তাদের পারিবারের ভালবাসায়।

বিদেশী ছাত্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার মানুষের কাছে ভালবাসা আর আদরের কমতি নেই। আর আমার বাস বিখ্যাত জাভা সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে, যারা সামান্য গাড়ির হর্ণ পর্যন্ত ব্যবহার করে না, শব্দ দূষণ হবে বলে। আর কারো সাথে দেখা হলেই প্রথম প্রশ্ন “আপা কাবার যার বাংলা অর্থ-কেমন আছেন?” আর সাথে তাদের মুখের অতি মিষ্টি হাসিতো আছেই। তাই প্রতি উত্তর না দিলে অতি অন্যায় হয়। এই করোনা ভাইরাসও পারেনি তাদের মুখের হাসি কেঁড়ে নিতে। আর হাসি যাবেই বা কেন এখন পর্যন্ত বাড়েনি কোন পণ্যের দাম পাশাপশি আছে ফ্রি উপহার। সবাই সঠিক ভাবে সরকারি নিয়ম (সোশ্যাল ডিসন্টেসি- সামাজিক দূরত্ব) মেনে চলছে। আর পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে নিয়মিত চলে বাড়ির আঙিনায় পরিস্কার অভিযান। কোথাও কাউকে দেখা যায় না নিময় ভাঙার মহড়া।

সামাজিক দূরত্ব ও পরিস্কার অভিযান এই দুইই এদেশের মানুষকে এক সুতোয় গেথেছে। বিভিন্ন সুপার শপ গুলোতে প্রবেশ করতে গেলে মাস্ক পরিধান ও হাত ধোয়া আবশ্যক যার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট জায়গা। রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা, যানবাহন চলাচল অতি সীমিত। প্রয়োজন ছাড়া অহেতুক কেউই বাড়ির বাইরে বের হয়না বললেই চলে। অনেক আগেই মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জামায়েত নিষিদ্ধ। তাই বলা যায় সার্বিক দিক দিয়ে পরিস্থিতি অন্যান্য দেশের তুলনায় আপাতত কিছুটা ভাল। জাভার মানুষের ভৌতিক আস্থা প্রবল। তাই স্বেচ্ছাসেবায় রাতের আঁধারে ভূত সেজে মানুষকে ভয় দেওয়ারও অভিযান চলছে নিয়মিত। এছাড়াও ব্যক্তি উদ্যোগে ও গ্রাম্য প্রধানের (এরতে) মাধ্যমে চলছে সমাজের অসহায় শ্রেণিকে সাহায্য করা।

আর আমার আহমেদ দালান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালবাসা কোনদিনই ভুলব না। আমার মত যেসকল ছাত্র-ছাত্রী তাদের বাড়িতে যেতে পারেনি তাদের সকলের ঘরে ঘরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে খাবার পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে। আর ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থানরত সকল বিদেশী শিক্ষার্থীই এই সুবিধার আওতাভুক্ত। বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্য সেবা সাথে নিয়মিত মানষিক ডাক্তারের সুবিধাতো আছেই। শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ই নয় ইন্দোনেশিয়ার সকল বিশ্ববিদ্যায়লই তাদের সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে এই সেবা দিয়ে আসছে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় প্রতিদিন অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষদের সাথে ক্লাসের পাশাপাশি নানা প্রকারের ব্যক্তিগত গল্প এখন আমার নিত্য দিনের সঙ্গি। সকাল দেখার সৌভাগ্য বেশি একটা হয়না অতিরিক্ত রাত জাগার ফলে। তাই জানালা দিয়ে প্রতিদিনের বিকেলের আকাশ আর গরম কফিই আমার একলা জীবনের সাথি।

জানিনা মায়ের কাছে কবে ফিরে যেতে পারব। তবুও মনে একটাই ভরসা এই জাভা সম্প্রদায়ের মানুষেরা। যাদের হাসিমুখ কখনই ভোলার নয়। এই বদ্ধ জীবনে যদি করোনাই আক্রন্ত হই, অন্তত বিনা চিকিৎসায় মারা যাবার ভয় নেই। দিন শেষে মানুষের মানবিকতাই আসল। এই বিপদের দিনে আমাদের সকলের এই শুভ বোধের উদয় হোক। ভাল থাকুক সকলে, ভাল থাকুক ভালব¬াসার মানুষেরা।