৪৪ কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদের খোঁজে দুদক

12

নড়াইল কণ্ঠ : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঢাকায় বসবাসকারি চুয়াল্লিশ (৪৪) জন কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করেছে। এর মধ্যে ৪২ জনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত। প্রথমেই তালিকার বাইরে মাদক মামলায় ৭৯ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আমিন হুদা ও তার স্ত্রী মিতু বেগমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এইভাবে অন্যদের সম্পদেরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান দুদক কর্মকর্তারা। গত ২ ফেব্রুয়ারি, রবিবার দুদকের পরিচালক (মানি লন্ডারিং) গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী সম্পদের হিসাব চেয়ে হুদা ও তার স্ত্রীকে নোটিশ পাঠান। দেশ রূপান্তর’র এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ওই নোটিশে বলা হয়, ‘প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে দুদকের স্থির বিশ্বাস জন্মেছে আমিন হুদা নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাই হুদা ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গের স্বনামে-বেনামে অর্জিত যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়দেনা, আয়ের উৎস, তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ ২১ কার্যদিবসের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন হুদা ও তার সহযোগী আহসানুল হক ওরফে হাসান। এরপর গুলশানে হুদার একটি ফ্ল্যাটে ইয়াবা কারখানার সন্ধান পায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা দুই মামলায় ২০১২ সালের ১৫ জুলাই হুদাকে ৭৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানাও করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই রয়েছেন।
দুদকের এক উপপরিচালক জানান, রাজধানীতে ৪৪ জন কোটিপতি মাদক কারবারির তালিকা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। যদিও এ তালিকায় হুদা ও তার স্ত্রীর নাম নেই। এছাড়া তালিকার মধ্যে মোহাম্মদপুরের নাদিমসহ দুজন এরই মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’নিহত হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে অন্যদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে তাদের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দেবে কমিশন।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, রাজধানীর কোটিপতি মাদক কারবারির তালিকার প্রথমেই রয়েছেন ইসতিয়াক ওরফে কামরুল হাসান। তিনি পাঁচ বছর আগেও মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের খুচরা মাদক বিক্রেতা ছিলেন। পরে পাইকারি বিক্রির কারবার শুরু করেন। মাদক কারবারের টাকায় মালয়েশিয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আশুলিয়ার ব্যারন বাসস্ট্যান্ড ও গাজীরচট মধ্যপাড়ার পুকুর রোডে দুটি ও সাভারের মাদ্রাসা রোডে একটি বাড়ি করেছেন। এছাড়া জেনেভা ক্যাম্পে তার দখলে থাকা ‘বি’ ব্লকের ১৬২ নম্বর বাড়িটি মাদক কারবারে ব্যবহার করা হয়। আশুলিয়া ও সাভারের বাড়িতেও ইয়াবা রাখা হয়।
অভিযোগ মতে, মাদক কারবারি ফজলুল করিম ইয়াবা ও লুপিজেসিক ইনজেকশন বিক্রির ডিলার। উত্তরার বিভিন্ন থানায় তার নামে অনেকগুলো মামলা আছে। মাদকের কারবার করে তিনি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন। অপর কারবারি বাড্ডার রিয়াদ উল্লাহ। তিনি ইয়াবার ডিলার। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা আছে। থাকেন বাড্ডার আফতাবনগর ‘সি’ব্লকে। মাদক কারবারি ছাব্বির হোসেন ওরফে সোনা মিয়া ভাসমান ইয়াবা ডিলার। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। ইয়াবার কারবারের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থে তিনি হাতিরপুলে একটি স্যানিটারি দোকান ও এলিফ্যান্ট রোডে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। অপর মাদক কারবারি দম্পতি রবিউল ইসলাম ও আসমা আহম্মেদ ডালিয়া। দুজনই গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু ডালিয়া কিছুদিন আগে জামিন পান। আরেক কারবারি কামাল হোসেন পাইকারি গাঁজা বিক্রেতা। তার নামে রাজধানীর ওয়ারীসহ বিভিন্ন থানায় মামলা আছে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে। তিনি আত্মগোপনে আছেন।
দুদকে জমা অভিযোগ মতে, ইয়াবার ডিলার মোবারক হোসেন বাবু মাদকের টাকায় যাত্রাবাড়ীর দনিয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছেন। তার বাড়ি নোয়াখালীর সুধারামপুর থানার কমিরপুরে। ইয়াবা কারবারি আনোয়ারা ওরফে আনু ভাটারা এলাকায় মাদক সরবরাহ করেন। ভাটারাসহ বিভিন্ন থানায় তার নামে বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গইলের ভুঞাপুরে। ভাটারা এলাকার অপর ইয়াবা কারবারি নারগিস ওরফে মামি ওরফে সকার বউ। তিনি ভাটারার নূরের চালা এলাকার বাসিন্দা।
ইয়াবা ও হেরোইনের ডিলার দম্পতি শামীম আহম্মেদ পাখানী ও ফারজানা ইসলাম স্বপ্না। তারা কলাবাগানের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন। গেণ্ডারিয়ার রহিমা বেগম হেরোইন, ইয়াবা ও লুপিজেসিক ইনজেকশনের পাইকারি কারবারি। গুলশান-বনানী এলাকায় বিদেশি মদ, বিয়ার ও ইয়াবা কারবারে যুক্ত হুমায়ুন কবির ওরফে কবির গাজী। তিনি বড় অঙ্কের অর্থের মালিক। গুলশান-২ নম্বর এলাকায় ফ্ল্যাটে থাকেন। খিলক্ষেত থানার জোয়ার সাহারায় ইয়াবার পাইকারি কারবারি ইতি বেগম। মা ফিরোজা, মেয়ে এ্যানি ও ছেলে প্রমি তার সহযোগী।
এছাড়াও দুদক মুগদার পারভীন, উত্তর মাণ্ডার শফিকুল ইসলাম, দক্ষিণ মাণ্ডার আলম, ডেমরার রাজু আহমেদ, মতিঝিলের লিটন, চকবাজারের দুই ভাই ওমর ফারুক ও সুমন, একই এলাকার লাল মিয়া, কলাবাগানের নাজমুস সাকিব, কামরাঙ্গীরচরের খুরশিদা ওরফে খুশী, উত্তর বাড্ডার শরিফ ভূঁইয়া, উত্তরা পশ্চিম এলাকার এনায়েতুল করিম, উত্তরা-৫ নম্বর সেক্টরের গোলাম সামদানী, শাহবাগের শামীম শিকদার।
এছাড়াও মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের শহীদুজ্জামান ওরফে নাবিদ, নাজিমউদ্দিন রোডের পারভীন আক্তার, নিমতলীর নার্গিস আক্তার, বংশালের কাশেম, মো. সেলিম, কারওয়ান বাজারের মিনা বেগম, মাহমুদা খাতুন, মহাখালী ওয়্যারলেস এলাকার রিমন সরদার, দক্ষিণ বাড্ডার আক্কাস আলী, জুরাইন ওয়াসা রোডের বাপ্পা, হাজীর মাজার এলাকার বাচ্চু মিয়া, ভাটারা নূরের চালা এলাকার ফতেহ আলী, মিরপুর-২ নম্বর এলাকার দুলাল ওরফে বাদল এবং মিরপুর পীরেরবাগ আমতলা এলাকার সজিব ওরফে কবিরাজের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মাদক বিক্রি করে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এ রকম ৪৪ জনের একটি তালিকা আমাদের কাছে আছে। আরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে মামলা করা হবে।’