আমাকে শেরপুর ডাকে : সালমা লুনা

14

আজ রবিবার ০৩ নভেম্বর। নড়াইল কণ্ঠ ফেসবুক সাইডে চোখে পড়লো সালমা লুনা তার নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি অসাধারণ লেখা। লেখাটি পড়ে আমি আমার বাল্যকাল, শৈশবের স্মৃতিচারণ করি। তখনই সালমা আপাকে তার ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে অনুমতি চাইলাম লেখাটি আমার অনলাইন পত্রিকা নড়াইল কণ্ঠ এ প্রকাশের জন্য। তিনি আমাকে যথারীতি অনুমতি দিলেন।

তার অনুমতি নিয়ে লেখাটি হুবহু নড়াইল কণ্ঠ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো:
সালমা লুনা : নালিতাবাড়ীর ভেদিকুড়া গ্রামে ছিলো আমার বাবার দাদাবাড়ী। তার আগে কোথায় ছিলেন আমার পূর্বপুরুষরা, জানা হয়ে উঠেনি।

ভেদিকুড়া থেকে একমাত্র সন্তানের শিক্ষার সুবিধা দিতে নালিতাবাড়ীতে এসে বাড়ি করেছিলেন আমার বাবার বাবা, অর্থাত দাদা। সেখানেই বাবা বড় হয়েছেন স্কুলে পড়েছেন। এরপর বাবা জামালপুরে কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে আমার দাদা নালিতাবাড়ী থানা ছেড়ে শেরপুর মহকুমা শহরে এসে বাড়ি করেন।
দাদা একসময় চলে গেলেন।

আমার বাবাও তার সরকারি চাকরি নিয়ে দেশের নানা অংশে ঘুরলেন। বিয়ে করলেন ময়মনসিংহের নান্দাইল। চাকরির শেষ দিকে এসে শেরপুরের পাঠ চুকিয়ে ময়মনসিংহ জেলা শহরে বাড়ি করলেন। আমরা তিনবোন। সবাই ময়মনসিংহেই পড়ালেখা শেষ করলাম। কেউ জীবন এবং কেউ জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করলাম। আমাদের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় পড়ে। তাদের জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা এই ঢাকা শহর।
বাবা চলে গেলেন। আমরা মা-কে নিয়ে ঢাকাতেই থাকি। ময়মনসিংহের বাসায় ভাড়াটেরা থাকে। কখনো বছরে, দু’বছরে ময়মনসিংহ যাই। দু’চারদিন বেড়াই। চলে আসি নিজের আবাসে।

একই ঘটনা আমার জীবন সঙ্গীরও। তার দাদাবাড়ী মধুপুরের ধনবাড়ি। তার বাবাও চাকরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরেছেন । অবশেষে ময়মনসিংহে থিতু। তাদের ৫ ভাইবোনের কেউই এখন থাকেন না ময়মনসিংহের বাড়িতে। সেখানে ভাড়াটিয়ারা থাকেন। তাদের বাবা চলে গেলে মা ছেলেমেয়েদের সাথে রাজধানীতেই বসবাস করছেন। কেউই ধনবাড়ি বা ময়মনসিংহ থাকেন না।
তাদের একজনের সন্তান কানাডায় বসবাস করছে সপরিবারে। সে পড়তে গিয়েছিল। ফিরে আসেনি আর।

আমার ছেলেটা পড়তে যেতে চেয়েছিল কানাডা অথবা অস্ট্রেলিয়ায়। যেতে দেইনি। বিনিময়ে আমাকে রাজি হতে হয়েছে, যেন গ্র্যাজুয়েশন শেষে আর বাধা না দেই। ছেলেকে জিজ্ঞেস করিনা কিছু। তবে জানি সুযোগ পেলে সে কোন উন্নত দেশের অভিবাসী হবে। মেয়ে বলে রেখেছে, ভাইয়া যায় নি। আমি কিন্তু যাবোই!
ঢাকায় স্থায়ী আবাস হলেও আমার নিজেকে অস্থায়ী মনে হয়। শেকড় বিহীন একজন মানুষের মতো। যেন স্থির হতে পারিনি এখনো।

আমাকে শেরপুর ডাকে।
শেরপুরে পুকুরসমেত আমাদের গাছপালা ঘেরা বিশাল বাড়িটা ঘুমে জাগরণে আমার স্বপ্নে হানা দেয়।
আমাকে ময়মনসিংহ ডাকে। আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো, রাস্তাঘাট, ব্রহ্মপুত্র নদী, ময়মনসিংহ শহরের বড় বড় প্রাচীণ গাছপালা গুলিও আমাকে ডাকে।

সেই কবে নালিতাবাড়ী কিংবা ভেদিকুড়া গ্রাম দেখতে গিয়েছিলাম। গ্রামদুটিকে একবার দেখতে যেতে ইচ্ছে করে।
আমার বাবা অনেকবারই দেখতে যেতে চেয়েছেন। যাওয়া হয়ে উঠেনি।

একবার নালিতাবাড়ী গ্রামের বাড়িটায় যেতে আমাকে একটা নদী হেঁটে পার করিয়েছিল আমারই কোন স্বজন। নৌকা ছিলো। তবু শীতের পড়ন্ত বেলায় শীর্ণকায়া একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদী হেঁটে পার হতে গিয়ে খুব আনন্দ হয়েছিল। অসংখ্য নুড়ি পাথর ছিলো পায়ের নিচে। সেগুলো সীমান্তের ওপারের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে জেনে ছোট মেয়েটির মনে কী নির্ভেজাল অপার বিস্ময়!

সেই আনন্দ আমি আর কোনদিন পাইনি। এ বড় দামী স্মৃতি। নদীটির নাম ভোগাই। সেই ভোগাইয়ের ঠাণ্ডা শীতল তিরতিরে বয়ে চলা জলও ডাকে। কারো কাছেই আর যাওয়া হয়না।
আমার বাবা যখন ঢাকায় থাকা শুরু করলেন, আমার বাবার এক নিকটাত্মীয় হেসে হেসে বলেছিলেন, মুকুল ভাই এখনো সেটল হলেন না !

কানে এসে বিঁধেছিল কথাটা। আমার মনের অলিন্দে অলিন্দে মাঝেমাঝেই কথাটা ছটফটে একটা পায়রার মতো ডানা ঝাপটায়।
সেটল হওয়া মানে কী?
থিতু হওয়াই তো।
শেকড় উপড়ানো বড় কঠিন কাজ। থিতু হওয়া আরো কঠিন।
মানুষ গাছের মতো।
কিংবা গাছ মানুষের মতো।
পার্থক্যটা শুধু ওই টানের। শেকড় উপড়ে নিলে গাছ কদাচিত বাঁচলেও, মানুষ ঠিকই বাঁচে। শুধু মানুষটির ভেতরে তার ফেলে আসা মাটির টান সময়ের সাথে সাথে তীব্র হয়। শেকড়ের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিরা টান দিয়ে তার অস্থিত্বকে নাড়িয়ে দিতে চায়। এ বড় কুহকজাল।
মানুষের আর ‘সেটল’ করা হয়না। শুধু জীবনের সীমানা পেরিয়ে যায়।

বি:দ্র: প্রিয় পাঠক আপনার জীবনের কোন স্মরণীয় ঘটনা থাকলে আজই লিখে পাঠান আমাদের ঠিকানায়। আমরা আপনার স্মৃতিগুলি, কথাগুলি বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিতে চাই। www.narailkantho.com , newsnarailkantho@gmail.com