লোহাগড়া-মোহাম্মদপুর সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে দুপ্রক’র প্রচারাভিযান

58

নড়াইল কণ্ঠ : জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প খুলনা জোন প্রকল্পের আওতায় ‘লোহাগড়া-ন’হাটা-কালিশংকরপুর-মোহাম্মদপুর জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নির্মাণ কাজের গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নড়াইল জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক ভ্রাম্যমাণ প্রচারণা পরিচালনা করা হয়েছে। গত বুধবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১১টা হতে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ সড়কের ৪টি অংশে এ ভ্রাম্যমাণ প্রচারণা পরিচালনা করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার গা থেকে মাটি কেটে রাস্তার হেজিং ঠেকানোর জন্য দেয়া হচ্ছে। কাজের বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে সড়কের উভয়পার্শ্বে ঠিকাদার কর্তৃক সংগৃহীত মাটি দিবে। এছাড়া নির্মাণাধীন সড়কের যে সকল অংশে পুকুর, গর্ত এবং নদীভাঙ্গন রয়েছে সেখানে আরসিসি দিয়ে মজবুত করা। পাথর ও বালির সংমিশ্রন দেয়ার কথা ৮০%- ২০%। কোনক্রমেই রাস্তার গা থেকে মাটি কেটে সড়কের উভয়পার্শ্বে দেয়া যাবে না।

নলদী ইউনিয়নের নকখালি এলাকায় নির্মাণ কাজ সরেজমিনে দেখতে যান জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, সড়কটির উন্নয়ন কাজের গুণগতমান বজায় রেখে যাতে বাস্তবায়ন হয় সেদিকে সকলকে সচেতন থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, যদি এমন কোন ত্রুটি চোখে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে দুদকের ১০৬ নম্বরে কল করে জানাবেন। এছাড়া এলাকার তরুণ সমাজকে দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত রাখতে তাঁরা পাড়ায় পাড়ায় মিটিং করবেন বলে জানান। যেখানে দুর্নীতি সেখানেই প্রতিরোধের বলয় গড়ে তোলা হবে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুপ্রক জেলা কমিটির সদস্য আব্দুস সাত্তার, স্বপনা রায় প্রমুখ।

ক্যাম্পেইন চলাকালে বক্তব্য রাখেন, নলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, নকখালির মাহাবুবুর রহমান, একই এলাকার স্টুডেন্ট প্রিন্স মাহমুদ, ব্রাহ্মনডাঙ্গার শিপন, লাবলু, জুয়েল, এনায়েত, আহাদ প্রমুখ।

সড়কের নির্মাণ কাজ সম্পর্কে নলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, মাশরাফি তো লোক ভালো। সারা পৃথিবীর মধ্যে তার নাম আছে। তার জন্যিই এত বড় কাজ হচ্ছে। লোহাগড়া ন’হাটা যে রাস্তা হচ্ছে আমি শুনিছি যে ৩০ কোটি টাকার কাজ। এখানে কাজ তো পাবলিক বোঝে না। নড়াইল সড়ক বিভাগ থেকে এক ইঞ্জিনিয়ার আসে সে কারোর সাথে কথা বলে না। এখানে এতো বড় একটা রাস্তা হচ্ছে সে তো পাঁচটা লোক ডাক দিতি পারে, বলতি পারে এখানে যে কাজ হচ্ছে তা আপনারা বুঝে নিতে পারেন।

প্রিন্স মাহমুদ বলেন, যদি একটা সাইনবোর্ড থাকে, কাজের সবগুলো লিস্ট থাকে, মেটেরিয়ালসগুলো থাকে আমরা জানতে পারবো কাজে কতটুকু কি লাগবে।

নকখালির মাহাবুবুর রহমান জানান, আমাদের যুবক যারা আছে তাদের নিয়ে আমরা দেখবো রাস্তায় কোন খারাপ কাজ হতে দেবো না।

ব্রাহ্মনডাঙ্গার সাইদার নামের এক কৃষক বলেন, কাজটা মোটামুটি ভালই হচ্ছে। তয় আমার কাছে সন্দেহ লাগতিছে বালির ভাগটা একটু বেশি পড়তিছে। একটু কম দিলেই মনে হয় ভালো হতো। রাস্তাডা আর একটু টনক হতো। আর কয়ডা খোয়া বেশি দিলি মনে হয় ইনশাল্লাহ ভালো হতো। আমার এই রাস্তার দুই সাইডি যেভাবে স্লোভ করে দেয়ার কথা সরকারের আছে সেভাবে কিছু হচ্ছে না। অনেক সময় ভাইঙ্গেচুরে পড়ে যাতি পারে। আমরা আহবান করবো যেন রাস্তার পাশের স্লোভটা ভালো কইরে দেয়া হয়।

লাভলু নামের এক ছাত্র বলেন,এই রাস্তাটার সাইডে আগে খোয়া দেওয়া হয়নি রাস্তার ভেতর থেকে টেনে টেনে দুই সাইডে খোয়া দিছে, মাঝখানে খোয়াটা কম হয়ে যাচেছ।

জুয়েল নামের আর একজন ছাত্র বলেন, এই রাস্তাটির মান খুব খারাপ দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশ দিয়ে পুকুৃর আছে, অনেক ডুবা আছে। ডুবার পাশে মাটি নেই। রাস্তাটা করার পরে একটা গাড়ি গেলে হয়তো রাস্তাটা ভেঙ্গে পড়ে যাবে। আমাদের অনুরোধ রাস্তাটা যেন আরো সুন্দর হয়।

এনায়েত মোল্যা নামের আর এক কৃষক জানান, এই রাস্তা যেভাবে করার কথা সেভাবে হচ্ছে না। আগের যে খোয়া ছিলো গাড়ি দিয়ে সেই খোয়া চইষে সাইডে দিছে। সাইডে যে পুকুরগুলো পুকুরের সাইডে কপাট দেয়ার কথা, কিন্তু কপাট দেয় নাই। মাটি যেভাবে দেয়ার কথা সেভাবে দেয় নাই। এই রাস্তা বৃষ্টিবাদল হয়ে অনেক জায়গা ভাইঙ্গে গেছে। যারা এর দায়িত্বে আছে তাদের কাছে আমাদের অনুরোধ এই রাস্তাডা যেন ভালোভাবে হয়।

এ জেলা মহাসড়কের সার্বক্ষণিক তদারকি কর্মকর্তা নড়াইলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেনের নিকট রাস্তার উভয়পার্শ্বে মাটির কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ঠিকাদার তার সুবিধাজনক স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করে রাস্তার উভয় পাশে মাটি দ্বারা সুরক্ষা করবে। কিন্তু কোনভাবেই রাস্তার গা থেকে মাটি কেটে এ কাজটি করবে না। তবে এ কাজটি এখনো শুরু হয়নি।

সড়ক নির্মাণকাজ সম্পর্কে মুঠোফোনে মেসার্স ইডেন প্রাইভেট এর স্বত্বাধিকারী মো: রেজাউল আলম জানান, সড়কের কাজটি দরপত্র অনুযায়ী করা হচ্ছে। আশা করি কাজটি সর্বোচ্চ গুণগতমান বজায় রেখেই করা হবে। আশা করি কোন অভিযোগ থাকবে না।

নড়াইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন জানান, জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প খুলনা জোন প্রকল্পের আওতায় নড়াইল সড়ক বিভাগাধীন দুইটা প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে। একটি হচ্ছে ‘লোহাগড়া ন’হাটা কালিশংকরপুর-মোহাম্মদপুর জেলা মহাসড়ক, আর একটি হচ্ছে ‘নড়াইল-কালিয়া জেলা মহাসড়ক।’ ‘লোহাগড়া ন’হাটা কালিসংকরপুর-মোহাম্মদপুর জেলা মহাসড়কের মোট দুরত্ব ২৬.৬০০ কি.মি.। এরমধ্যে নড়াইল অংশে ১২.১৫০ কি.মি. কাজ চলমান রয়েছে। এই চলমান কাজের ভেতরে ১২ থেকে ১৮ ফুট প্রশস্ততা উন্নিতকরণ হবে। এই ১৮ ফুট প্রশস্ততা উন্নিতকরণ করতে আমাদের এ কাজে যে লেয়ার হবে সেগুলো হচ্ছে , ইমপ্রুভ সাবগ্রেড, সাববেইজ, বেইজটাইপ ওয়ান এবং ওয়্যারিং কোর্স।

তিনি আরো জানান, ওয়্যারিং কোর্স হবে ২ ইঞ্চি অর্থাৎ ৫০ মি.মি. পুরুত্বে, বেইজটাইপ ওয়ান হবে ৮ ইঞ্চি অর্থাৎ ২০০ মি.মি পুরুত্বে, সাববেইজ হবে ১০ ইঞ্চি অর্থাৎ ২৫০ মি.মি. পুরুত্বে এবং ইমপ্রুভ সাবগ্রেট অর্থাৎ আইএসজে হবে ১২ ইঞ্চি অর্থাৎ ৩০০ মি.মি পুরুত্বে কাজ করা হবে। এই কাজগুলো স্বাভাবিকভাবে চলমান রয়েছে। বর্তমান বেইজটাইপ ওয়ান অর্থাৎ স্ট্রেন্থদেনিংয়ের কাজটা চলমান রয়েছে। আমরা যথাসাধ্য আমাদের বিভাগের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে কাজটি মানসম্মতভাবে হয়। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি তারাও আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে কাজটা মানসম্মত হয়। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি তারাও আমাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে যাতে কাজটা আমরা মানসম্মতভাবে করতে পারি।

এ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী আরো জানান, আমরা আশা করবো এবং আপ্রাণভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাবো যাতে নড়াইল জেলা সড়কে উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে যে কাজ দু’টি চলমান রয়েছে এইটা মানসম্মতভাবে হয়। পাশাপাশি অন্য যে প্রকল্পগুলো চলমান রয়েছে সেই প্রকল্পগুলোর কাজও যেন মানসম্মতভাবে হয়। আমি এবং আমার অফিসের সহকর্মী যারা রয়েছে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে এবং চালাবো। পাশাপাশি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির যারা সম্মানিত সদস্যবৃন্দ রয়েছেন তাদেরকে আমরা সহযোগিতা করবো এবং তারাও আমাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে আমাদের কাজটি বাস্তবায়ন করতে অনেকটা সহজ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

সড়কের উভয় পার্শ্বে মাটির কাজ সম্পর্কে নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ঠিকাদার তার সুবিধাজনক স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করে সড়কের উভয় পাশে মাটি দ্বারা সুরক্ষা করবে। তবে কোনভাবেই রাস্তার গা থেকে মাটি কেটে এ কাজটি করা যাবে না। যাতে সড়ক নির্মাণ পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উল্লেখ্য, লোহাগড়া ন’হাটা কালিশংকরপুর-মোহাম্মদপুর জেলা মহাসড়ক নির্মাণ কাজটি নড়াইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ঠিকাদার হিসেবে রয়েছে রানা বিল্ডার্স (প্রা:) লি: এস,এস, বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লি: – মেসার্স ইডেন প্রাইভেট -জয়েন্ট ভেন্সার্স বাস্তবায়ন করছে। ১২.১৫০ কিলোমিটার রাস্তার জন্য চুক্তিমূল্য ২৪ কোটি ৪৯ লক্ষ ৭০ হাজার ২০৬ টাকা। কাজটির কার্যাদেশ দেয়া হয় এ বছরের ০৩ ফেব্রুয়ারি এবং কাজটি শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের ৩০ জুন মাসে।