পাঞ্জেরীর শেষ কথাটিও রক্ষা করেনি পাষন্ডস্বামী

140

নড়াইল কণ্ঠ : শনিবার (০৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরামের এক সহকর্মীকে ফোন করলাম। সে প্রথমে ফোন ধরেনি। পরে ফোনদিলে সে জানালো ভাই পাঞ্জেরী নূর ঝুম (৩৫) নামের এক গৃহবধু আত্মহত্যা করে নাকি মারা গেছে। তার বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুরে গোবরা কারিকর পাড়ায়। বিয়ে হয়েছে লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে। ওরা থাকতো নাকি ঢাকা সাভারে। মৃত্যুর আগে তার ফেসবুকে অনেক মান-অভিমান ও ক্ষোভের কথা লিখেছে। এ সংবাদ পাওয়া মাত্রই এইচআরডিএফ’এর ৪জন সহযোদ্ধা রওনা করি গোবরার দিকে। গোবরায় পৌঁছিয়ে দেখি পাঞ্জেরী নূর ঝুমের মৃত্যুর খবর এলাকায় তেমন একটা জানাজানি হয়নি। চুপিচাপি কয়েকজন লোক পাঞ্জেরী নূরের লাশ ঘাড়ে করে ঔগ্রামের একটি বাশ বাগানে দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতি দেখে আমাদের টীমের পক্ষ থেকে আব্দুস সাত্তার তাৎক্ষনিক নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন দেন। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পার্শ্ববর্তী বিছালী ক্যাম্প ইনচার্জ এএসআই সেলিম এবং সদর থানা থেকে এসআই হাবিবকে পাঠান ঘটনাস্থলে। ঘটনাস্থলে গিয়ে কবরের পাশে রাখা পাঞ্জেরী নূরের লাশ বাইরে এনে সুরতহাল করে পুলিশ। এরপর লাশের ময়না তদন্তের জন্য নড়াইল সদর হাসপাতালে নেয়া হয়।

এ সময় ঘটনাস্থল তদন্তকালে নড়াইল সদর থানার এসআই হাবিব জানান, সুরতহালে পাঞ্জেরী নূরের গলায় লাল দাগ, থুতনীর নিচে দাগ, জীহ্বা দাতের সাথে আটকানো, থুতনীর চামড়া উঠা, দু’চোখের চারপাশ লাল, মুখে রক্ত আসাভাব সমূহ দেখা গেছে। এরপর মৃত্যুর সঠিক কারন জানতে লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পাঞ্জেরী নূর ঝুম (৩৫) নড়াইল সদর উপজেলার গোবরা দক্ষিণপাড়ার (কারিকর পাড়া) মো: লিয়াকত হোসেন নূর এর মেয়ে। স্বামী লোহাগড়ার উপজেলার ইতনা গ্রামের মৃত্যু আসাদুজ্জামানের ছেলে সরদার রিয়াজ্জামান (৪০)। পাঞ্জেরী নূর ঝুম সরদার রিয়াজ্জামানের ২য় স্ত্রী। আগের পক্ষের এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। পাঞ্জেরী নূর ঝুমেরও আগে বিয়ে ছিলো। সে পক্ষের আটবছরের একটি ছেলে রয়েছে।

পাঞ্জেরীর আপন কোন ভাই-বোন নেই। তার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আর একটি বিয়ে করেন। সে পক্ষে একটি ছেলে রয়েছে।

এদিকে পারিবারিক ও সোস্যাল মিডিয়ার সূত্রে জানাগেছে, গত শুক্রবার (০৪ অক্টোবর) ঢাকার সাভার পৌর এলাকায় স্বামীর বাসায় পাঞ্জেরী নূর ঝুম (৩৫) অসুস্থ হয়ে পড়ে। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সাভার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানকার হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ঘুমের বড়ি সেবনের কারনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান।

মৃত্যুর আগে পাঞ্জেরী নূর ঝুমের ফেসবুক স্ট্যাস যে সব কথা লিখে গিছেন তাতে রীতিমতো সন্দেহের তীর তার স্বামীর অমানবিক নির্যাতন সহ্য না করতে পেরেই হয়তো তার এধনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে পাঞ্জেরীর স্বামী আমাদেরকে জানান, পাঞ্জেরী একটু বেশি অভিমানি ছিলো। এসব নিয়ে হয়তো ছোটকাটো মনোমানিল্যের কারনে সে এপথ বেছে নিতে পারে। এ সময় তিনি আমাদের আরো জানান, আমার মা ঔসময় (পাঞ্জেরী নূরের শাশুড়ি) হাসপাতালে ছিলো, ঠিক ঐসময় পাঞ্জেরী আমাকে ফোন দেয় তুমি এখনই বাসাতে আসো। আমি তাকে বলি আমি মাকে রেখে এখন আসতে পারবো না।

জানা গেছে, পাঞ্জেরী নূর ঝুমের স্বামীর সাথে এইটা ছিলো শেষ কথাবার্তা। এরপর স্বামী বাসাতে ফিরে এসে তাকে হাসপাতালে নেয় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঞ্জেরী নূর ঝুমের পয়জনিংজনিত কারনে মৃত্যু হয়েছে বলে একটি ছাড়পত্র দেয়।

পাঞ্জেরী নূর ঝুমের ফেসবুকের কয়েকটি স্ট্যাস হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো: মৃত্যুর একদিন আগে গত ০৩ অক্টোবর দুপুর ২.৩১ মি: লেখেন ‘পশুরাও আজকাল হয়ে উঠছে অনেক বেশি মানবিক আর মানুষ হচ্ছে পশুর চেয়েও দ্বিগুণ হারে পাশবিক।’ ০৩ অক্টোবর রাত ৩.০২ মি: লেখেন ‘তুমি ঘুমিয়ে পড়লেই আমার রাত জাগার সাথে পাল্লা দিয়ে ছোট হতে থাকে ক্ষণজন্মা স্মৃতিদের ভাঁজে ভাঁজে রাখা ন্যাপথলিনের আকার।’

০৩ অক্টোবর রাত ২.৫৯ মি: লেখেন রাতগুলারে নাবিস্কো বিস্কিট এর মত লাগে। ইচ্ছা করে কাপের পর কাপ চায়ে ডুবায়ে খায়া ফালাই।খাইতেই থাকি। শেষ হয়া যাক সব। সিলিং থিকা নাইমা আসা শাপের মতন দড়িতে বান্ধা থাকুক খালি প্যাকেট, বিস্কিটের গুড়াগাড়ির উচ্ছিষ্ট গায়ে মাখাই। আর তার ভিত্রে থিকা উঁকি দিতে থাকুক রুপালি রঙ্গা চকচকা একখান মায়া।রাতটা শেষ হোক, সবটা নিয়া!

মৃত্যুর দু’দিন আগে ০২ অক্টোবর রাত ১১.০১ মি: লেখেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তুমিও বলি হও
তা যদি পুরুষ তুমি জানতে, আমার আগে গলা ফাটিয়ে তুমিও নিজের জন্য কাঁদতে।

০২ অক্টোবর রাত ১১.০১ মি: লেখেন :
কথা ছিলো দু’পা জুড়ে নুপুর পরাবি,
আর আমি তোর অলস সকালে ঘুম ভাঙার কারন হবো।
নুপুরের টুংটাং আওয়াজে ঘুরে বেড়াবো পুরো ঘরময়।
ভিষণ রাগে তুই যখনই ছুঁতে আসবি, দেখবি আমি ঠিক পালিয়ে গেছি।
তোর হাত ফসকে –
হয়তো তোর মন ফসকে।
কথা ছিলো বা হাতটা শক্ত করে ধরবি,
পরিয়ে দিবি তোর সাদা ডায়ালের সেই কালো ফিতের ঘড়ি।
আর তখন থেকেই আমি তোর অফিস লেইট এর কারন হবো।
এদিক ওদিক সরিয়ে রাখবো ঘন্টা সেকেন্ড মিনিট,
ছেড়ে যেতে চাইলে বলবো-
শুনছো, সময় এখনও অনেক বাকি।
কপালে আদর ঠেকিয়ে তুইও ছেড়ে যাবি
হাত ফসকে- হয়তো মন ফসকে।
কথা ছিলো অনেক কিছুই,
এই করবি, সেই করবি।
একটু আধটু ভুল করলেই ন্যাকার সুরে কান ধরবি।
আমার অপেক্ষায় প্রহর কাটে অথচ তোর কথার আলো জ্বলে না।
তলিয়ে যায় অমানিশার অন্ধকারে।
জানিস অতঃপর জেনেছি, কেউ কথা রাখেনা
মানুষ কথা রাখে না।
আসলে মানুষ কথা রাখতে জানেনা।
কেউ কথা রাখে না