কালিয়া পৌরসভার সমস্যা নিয়ে মেয়রের একান্ত সাক্ষাৎকার

57

নড়াইল কণ্ঠ : নড়াইলের কালিয়া পৌরসভা ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এ পৌরসভার আয়তন ২৯ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ২৯ হাজার ২শ’৫৫জন। মোট ভোটার সংখ্যা ১৫হাজার ২শ’ ১৬জন। তার মধ্যে পুরুষ ৭হাজার ৬শ’ ১৬জন এবং মহিলা ৭হাজার ৬শ’ জন। ২০১১সালে নভেম্বর মাসে এ পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয়। সর্বশেষ ২০১৫সালের ৩০ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চামুচ প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে পৌরসভার ৮ম মেয়র নির্বাচিত হন। ৪৩ বছর বয়সী কালিয়া পৌরসভাটির কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। চাহিদা মোতাবেক বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ হচ্ছে না। জলবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, চলাচলের অনুপোযোগী সড়ক, ডাস্টবিন, গণশৌচাগার সংকট, বাসস্ট্যান্ডের উন্নয়ন, নদী ভাঙ্গন, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ, মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি, নিজস্ব কবরস্থানসহ নানা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে এ পৌরসভায়।

কালিয়া পৌসভার ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শেখ সরোয়ার হোসেনের অভিযোগে জানা যায়, অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপোযোগী।শহরের অন্যতম ব্যস্ততম কলেজ-বাজার সড়কে খানখন্দের কারণে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। শহরে কুকুরের উৎপাত বেড়েছে।সড়কে বিদ্যুতের পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের ব্যবস্থা নেই।এ কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা অন্ধকারে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে। একমাত্র বাসস্ট্যান্ডের দীর্ঘদিন কোন উন্নয়ন হয়নি। স্যানিটেশন ব্যবস্থার আরও উন্নতী দরকার।

১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা উৎপল কুমার ঘোষ বলেন,এ শহরে বিনোদনের কোন ব্যবস্থা নেই। দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌরসভা হলেও যে ধরণের নাগরিক সুবিধা থাকা দরকার তা নেই।শিশুদের জন্য কোন খেলার মাঠ বা পার্ক নেই।ট্যাক্সের প্ররিমান বেশী, সেবারমান কম।ময়লা আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই। পৌরসভার জন্মলগ্ন থেকে যত্রতত্র যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য ফেলে আসছে।এ জন্য পরিবেশ দুষিত হচ্ছে।এছাড়া নদী ভাঙ্গনে পরিকল্পিত পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।

৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও একজন পশু ব্যবসায়ী মো.শহিদুল শেখ বলেন,পশুর হাটটি ভেঙ্গে যেতে বসেছে।এ কারণে পৌরসভা মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ পশু হাটের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন। এছাড়া নদী ভাঙ্গন একটি বড় সমস্যা বড়কালিয়া,কুলশুর,বেন্দায় নবগঙ্গা নদীর ভাঙ্গন লেগেই আছে। ওই সমস্ত গ্রামের বাসিন্দারা নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে।এটা তাদের জন্য বিরাট একটা সমস্যা । ভাঙ্গনরোধ নিরসন হওয়া উচিত।

বিশ্ববিখ্যাত নৃত্য শিল্পী উদয় শংকর সহোদর বিশ্ববরেণ্য সেতার বাদক ররি শংকরের স্মৃতি বিজড়িত বাসভবনের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ‘স্মৃতি স্তম্ভ’ ও ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের’ পাশে ময়লার স্তুপ দেখা গেছে। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। অপরদিকে জনস্বার্থে অতীব জরুরী হওয়া সত্বেও পৌরসভার নিজস্ব কোন কবরস্থান নেই।

এসব বিষয় নিয়ে কালিয়ার পৌর মেয়র ফকির মুশফিকুর রহমান লিটন বলেন, গত নির্বাচনের পূর্বে পৌরবাসীকে কোন প্রতিশ্রুতি দেইনি। তবে পৌরবাসীদের সঙ্গে নিয়ে সকল সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করবো এ কথা দিয়েছিলাম। নির্বাচনের পর পৌরবাসীর সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ সার্বিক বিষয় কাজ করে যাচ্ছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাফল্য আছে। কিছু কিছুু ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও রয়েছে। পৌরসভার প্রধান প্রধান সড়কে রাতে আলোর জন্য বাতির ব্যবস্থা করেছি। গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিকসহ নানাভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। পৌরবাসীর ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়নি। অপরদিকে সেবা নিতে এসে কেউ হয়রানির শিকার হননি। নাগরিকদের ডেঙ্গুসহ সর্বক্ষেত্রে সচেতন করার জন্য সভা-সমাবেশ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছি। বিশেষ করে চলমান ডেঙ্গু সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। প্রতি ওয়ার্ডে এডিস লাভা ধ্বংসসহ মশা নিধনের জন্য কাউন্সিলরদের পাশাপাশি কর্মচারীরা ৯টি ওয়ার্ডে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পৌরসভাকে শতভাগ দূর্নীতিমুক্ত করতে পেরেছি। ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দ্রুটি রয়েছে।বাজেটের অপ্রতুলতা এবং সংশ্লিষ্টদের সহযোগীতা না পাওয়ার কারণে এ সমস্যা সমাধান করতে পারিনি।

মেয়র আরও বলেন, গত সাড়ে তিন বছরে কালিয়া পৌর এলাকায় জনস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ১কোটি ৪৭লক্ষ ৫৭হাজার,এডিপির ৪কোটি ৭লক্ষ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে-৭ কোটি ৪৫লক্ষ টাকা,সর্বমোট ১২ কোটি ৯৯লক্ষ ৫৭হাজার টাকার উন্নয়ন মূলক কাজ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জরাজীর্ণ খানাকন্দের সড়কগুলি মেরামতের জন্য টেন্ডার হয়ে গেছে।শিগগিরই সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হবে। সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হলে যাতায়াত ও যানবহন চলাচলের আর কোন সমস্যা থাকবে না।একমাত্র বাসস্ট্যান্ডের উন্নয়ন করা হয়েছে এবং আগামীতে আরও করা হবে। পৌরসভার ভিতর অবস্থিত কবরস্থান গুলোকে আর্থিক সহযোগীতা করা হচ্ছে।চলতি বছরে চাঁদপুর কবরস্থানে ১লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনে সৃষ্টি কর্তা যদি অংশগ্রহন করার সুযোগ দেয় এবং বিজয়ী হই।তাহলে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করার চেষ্টা করবো। সে কারণে পৌরসভার রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এখন থেকেই কাজ করে যাচ্ছি। অপরদিকে কালিয়া পৌরসভাকে একটি আধুনিক মডেল পৌরসভায় রুপান্তিত করতে চাই। স্বাস্থ্য সেবায় কালিয়া পৌর সভা পিছিয়ে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পৌসভার কর্মী নিয়োগ দিয়ে সহায়তা করছি।উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কুকুরের কামড়ের কোন ভ্যাকসিন নেই।ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হলেই রোগীরা পৌরসভায় আসেন এবং ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পৌরসভার চাহিদা মোতাবেক সরকারী বরাদ্দ পেলে জলবদ্ধতা নিরসনে আরও ড্রেন নির্মানের পরিকল্পনা আছে। অপরদিকে নদী ভাঙ্গন রোধে নড়াইল-১ এর এমপি মো.কবিরুল হক মুক্তির সহযোগীতায় কাজ চলছে।পয্যায়ক্রমে সব এলাকার ভাঙ্গনরোধের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন,এ পৌরসভার মধ্যে রয়েছে অনেক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন তার মধ্যে সরকারী শহীদ আব্দুস সালাম ডিগ্রী কলেজের মধ্যে পাক-ভারত উপমহাদেশের সর্ব বৃহৎ সম্পূর্ণ পিতলের তৈরী বিভিন্ন দেব-দেবীর কারুকার্যপূর্ণ ৫টন ওজনের জগন্নাথ দেবের রথ। এছাড়া পৌরসভার পুরতন ভবনের পূর্বপাশে উদয় শংকর ও রবিশংকর এর স্মৃতি বিজড়িত সৌন্দর্য মন্ডিত দ্বিতল আদী বাড়ী রয়েছে। এ পৌরসভার মধ্যে ভারতের স্বনামধন্য প্রয়াত নায়িকা সুচিত্রা সেনের মামা বাড়ীর স্মৃতিও রয়েছে।প্রতিদিন অনেক গুনিজন এসব স্মৃতি বিজড়িত কালিয়া শহরকে একনজর দেখতে আসেন।

শিশুদের জন্য পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র প্রসঙ্গে মেয়র বলেন,একটি শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা করা একান্তভাবে প্রয়োজন।যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অপরদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়েরও সার্বিক সহযোগীতা প্রয়োজন।পৌরসভার একজন খাদেম হিসেবে পৌরবাসীর খেদমত করে যাচ্ছি। সাফল্যের পাশাপাশি কিছুটা যে ব্যর্থতা আছে এটা আমি অকোপটে স্বীকার করতে দ্বিধা করবো না। অপরদিকে মাদক, সন্ত্রাস, জমিদখল, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য সংঘঠিত অপরাধ দমনে প্রশাসন, স্থানীয় সুধীজন ও নির্বাচিত জনপ্রতিধিদের পাশাপাশি পৌরবাসির সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহায্য।