মায়ের হাতের খাবার খাই, মনের আনন্দে স্কুলে যাই

73

আনজুমান আরা, জেলা প্রশাসক, নড়াইল : শিশু মানেই স্বপ্ন দেখা এক আলোকিত ভবিষ্যৎ। তাই অংকুর থেকে শিশুকে গড়তে হবে সুস্থ্য ও উন্নতমনের অধিকারী করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিশুদেরকেও উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে।আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়তে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষার অগ্রগতি সর্বস্তরেই চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার এই ব্যাপক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন অর্থনীতির ভিত্তিকে ও করেছে মজবুত ও টেকসই। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে দিয়েছে পৃথক পরিচিতি। বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করেছে।উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য জাতির আগামীর নেতৃত্বদানকারী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই পরিচর্যা করতে হবে। সে গুরুত্ব অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “মিড ডে মিল”নামক এক সাহসী ও অগ্রগতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। একটা সময় ছিল যখন বিপুল সংখ্যক কোমলমতী শিশু স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেত না। বর্তমানে “মিড ডে মিল” সহ অন্যান্য পদক্ষেপের কারণে শতভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার ও ৪৮ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অপুষ্টিতে ভোগা দরিদ্র্য শিশুদের ঝরে পড়ার হারই বেশী। সুস্থ্ দেহমনের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো অপুষ্টি। ২০১৮ সালের গবেষণামতে বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। 1999 সালের Nutrition Country Profile শীর্ষক সমীক্ষামতে বাংলাদেশের প্রায় ৫৪% প্রাক বিদ্যালয়গামী শিশু অপুষ্টির শিকার ছিল। সরকার ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সমূহের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিশুর অপুষ্টির হার ২০১৭ সালে ৩৬% এ নেমে আসে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির পাশাপাশি সরকার ও বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির যৌথ উদ্যোগে দেশে প্রথম ‘মিড ডে মিল’ প্রবর্তন করা হয় বরগুনা জেলার ইসলামপুর উপজেলায়।পরবর্তীতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ, সচেতন সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রম ব্যাপকতা লাভ করে। এই পর্যন্ত দেশের ৯২টি স্কুলে ‘মিড ডে মিল’ চালু আছে।

একটি লম্বা সময় ধরে যদি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে অভুক্ত থাকে তবে ঐ শিক্ষার্থীর নিকট থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যায়না। দুপুরের খাবারই সাধারণত কর্মশক্তির যোগানদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাড়ী দূরে হলে বা অন্যান্য কারণে অনেক শিশু স্কুলের বিরতির সময় বাড়িতে যায়না। আবার দরিদ্র্য মা অনেক সময় খাবার যোগান দিতে পারেনা। সরকারের উদ্যোগে দুপুরে বিরতির সময় এক বেলা স্কুলে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তাই ‘মিড ডে মিল’। আবার কেউ যদি বাড়ি থেকে মায়ের হাতের বানানো খাবার নিয়ে আসে তাও ‘মিড ডে মিল’। সরকারের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এর ফলে শিশুরা অপুষ্টির হাত থেকে বাঁচে, স্কুলের প্রতি আগ্রহী হয়, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বত:স্ফূর্ততা ও পড়ালেখায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। একই সাথে খাবার খাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহযোগীতার মনোভাব সৃষ্টি হয় এবং কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পায়। স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়ার হার হ্রাসে ‘মিড ডে মিলের’ অবদান অপরিসীম। তবে ‘মিড ডে মিল’ বাস্তবায়নের প্রতি পদে নানা প্রতিকূলতা রয়েছে। তন্মধ্যে অনুদানের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবলের সংকট উল্লেখযোগ্য।

স্কুলে যখন ‘মিড ডে মিলের’ আয়োজন করা হয় তখন শিক্ষক ও স্থানীয় লোকজন এতে যুক্ত থাকে। যার কারণে পাঠদান ব্যাহত হয়। আবার খাবার রান্না করা, পরিবেশন করা ইত্যাদি নিয়ে ও থাকে নানান সমস্যা। এক জায়গায় এত সংখ্যক শিশুর উপস্থিতি হট্টগোলের সৃষ্টি করে এবং পরিবেশকেও নোংড়া করে। আবার প্রতিদিন এত ব্যাপক খরচ কোন দাতা সংস্থা, সরকার বা স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যোগাড় করা কষ্টসাধ্য।অধিকন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ রয়েছে যেমন- প্রচন্ড খরা,ঝড় ইত্যাদির কারণেও ‘মিড ডে মিলের’ আয়োজন ব্যাহত হতে পারে। আবার শিশুরা সবসময় একরকম খাবার খেতে পছন্দ করে না। একেক দিন একেক রকম খাবার খেতে পছন্দ করে। কেউ দেখা যায় শুকনো বা ভাজি ধরণের খাবার খায় কেউ আবার ঝোল বা রসালো খাবার খেতে মজা পায়। শিশুর এই পছন্দের ধরণটা কিন্তু মায়েরাই ভাল বুঝেন এবং আবদার বায়নাটাও শিশু মায়ের কাছেই করে। মিড দে মিলে প্রতিদিন সাধারণত একই রকমের খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রতিদিন একই রকমের খাবার পরিবেশন করা হয় বলে খাবারের প্রতি শিশুর অনীহা তৈরি করতে পারে যার দরুন অভুক্ত থাকার ফলে একদিকে যেমন শিশুর পুষ্টিগ্রহণ কার্যক্রম ব্যাহত হবে অন্যদিকে খাবারেরও অপচয় হবে। আবার কোনভাবে যদি ঐ ‘মিড ডে মিলে’ জীবানু সংক্রমণ ঘটে তবে তা পুরো স্কুলের বাচ্চাদের একসাথে অসুস্থ্য করে তুলতে পারে। কিন্তু এই কাজটি যদি কোন “মা” তার বাচ্চার জন্য করেন, দুপুরে খাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে খাবার তৈরি করে দেন তাহলে সেটা যেমন পুষ্টিকর তেমনি স্বাস্থ্যকর হবে। মায়ের কাছে তার সন্তান সবার উর্ধ্বে, তাই সব দিক নজর রেখেই তিনি তা তৈরি করবেন। এর ফলে বিদ্যালয়ে যেতে শিশুদের যেমন আগ্রহ তৈরি হবে তেমনি বন্ধুদের সাথেও তার মায়ের হাতের তৈরি খাবার ভাগাভগি করতে দ্বিধা করবে না।

একসময় বাংলাদেশকে বলা হত “তলা বিহীন ঝুড়ি”।কিন্তু সময় পাল্টেছে। এখন বাংলাদেশকে অন্য অনেক দেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দেখে। উদীয়মান ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তৈরিতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি । ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে এদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। সে লক্ষ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে যাচ্ছেন। এর কিছু লক্ষণ ও আমরা দেখতে পাই। যেমন বর্তমানে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তাহলে একজন বিদ্যালয়গামী শিশুকে তার মা খাবার তৈরি করে দিতে পারবে না দারিদ্র্যতার কারণে এটা সব ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া যায় না। বরং ‘মিড ডে মিলে’ যে খরচটা হবে তা যদি বাছাইকৃত অসহায় দুঃস্থ পরিবারসমূহকে দেওয়া হয় তাহলে সেই টাকায় ঐ সব পরিবারের মায়েরা অনায়াসে তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত টিফিন তথা মিড ডে মিল নিশ্চিত করতে পারবে। এ ছাড়া সকল বাচ্চাদের মাঝে টিফিন বক্স সরবরাহ করেও মায়ের হাতের টিফিন আনতে বাচ্চাদের উৎসাহিত করা যায়। স্থানীয় উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের টিফিন বক্স সরবরাহ করা হয়েছে যা ভালো ফল দিচ্ছে।

‘মিড ডে মিলের’ চালের বস্তা চুরি এমন খবর ও জানা যায়। এটাও একটা সমস্যা। যদি এই চালের টাকা শিশুর মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয় তাহলে তা হবে নিরাপদ বিনিয়োগ। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যার জন্য সমগ্র বাংলাদেশের সকলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন। আর এটা সম্ভব হবে যদি আমরা একটি সুস্থ্য সবল মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি এবং সাথে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা সম্ভব। কারণ বর্তমানে ৩১ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছে। একসময় শিক্ষার জন্য শুধু ভারতেই ৪০ হাজার শিক্ষার্থী গমন করত। যেটা এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। বরং ২ হাজারের বেশি বিদেশী শিক্ষার্থী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে মানসম্মত ও যুগোপযোগী করার জন্য ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরণের তথ্য প্রযুক্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে। এসব দিক বিবেচনা করে ‘মিড ডে মিল’ এখন আর সময়ের দাবি নয়। বরং কিভাবে একটা পরিবারকে উন্নত করে পরিবারটিকে জাতির উন্নয়নের অংশীদার করা যায় সে ব্যবস্থা নিতে সরকার ও সকল মহলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

শিশুদের প্রতি মায়েদেরকে আরো অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। মায়েদের একটু সদিচ্ছাই ‘মিড ডে মিল’ তৈরির জন্য যথেষ্ট। দুপুরের খাবার যেহেতু (৫-১০) বছর বয়সী শিশুদের শরীর গঠনের জন্য জরুরী। সে জন্য দামী খাবার নয় বরং পুষ্টিকর খাবারই হতে পারে তাদের জন্য নিয়ামক। মা সমাবেশের মাধ্যমে শিশুর যত্ন, পুষ্টি এবং সুস্থ্যতা নিয়ে আলোচনা করে মায়েদের সচেতন করতে হবে। পারিবেশের আশে পাশের পরিচিত পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে মায়েদের ধারণা দিতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবারের উপকারিতা মায়েদের বোঝাতে হবে। শত ব্যস্ততার এবং অসুবিধার মধ্যে থেকেও প্রত্যেক মায়েরই তার সন্তানের কল্যাণের জন্য দুপুরের খাবার যত্নের সাথে তৈরি করে বিদ্যালয়ে পাঠানো আবশ্যক বিষয়টি মায়েদের উপলব্ধিতে আনতে হবে।

ক্ষুধা ও অপুষ্টি মুক্ত শিক্ষাঙ্গন সৃজনের মাধ্যমেই আমরা অর্জন করব মানসম্মত সার্বজনীন শিক্ষা যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে সহজ ও ত্বরান্বিত করবে। তাই এখন প্রতিটি শিশুর প্রাণের দাবীকে উপেক্ষা করার কোন অবকাশ নেই এবং তাইতো চলুন সবাই মিলে করি নিশ্চিত ‘মায়ের হাতের খাবার খাই-মনের আনন্দে স্কুলে যাই’

লেখক : আনজুমান আরা, জেলা প্রশাসক, নড়াইল।