শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এঁর ৪৮তম শাহাদৎবার্ষিকী পালিত

51

নড়াইল কণ্ঠ : মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী, বাংলার সূর্যসন্তানদের অন্যতম, নড়াইলের কৃতি সন্তান স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সন্তান শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এঁর ৪৮তম শাহাদৎবার্ষিকী নড়াইলে পালিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (০৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ ট্রাস্টের আয়োজনে নূর মোহাম্মদ নগর এলাকা হতে একটি র‌্যালি বের হয়। র‌্যালিটি নূর মোহাম্মদ নগর প্রদক্ষিণ শেষে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ নিজ গ্রামের বাড়িতে (সাবেক মহিষখোলা) এসে শেষ হয়। এখানে তাঁর স্মৃতিবেদিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ট্রাস্ট, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট, জেলা পরিষদ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ মহাবিদ্যালয়, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। পরে পুলিশ বাহিনী এই বীরের প্রতি রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সালাম প্রদান করা হয়।

বেলা ১১টায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্মৃতি গ্রন্থাগার ও যাদুঘর মিলনায়তনে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ ট্রাস্টের সভাপতি ও নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা’র সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম, সিভিল সার্জন নূপুর কান্তি দাস, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালমা সেলিম, বীরশ্রেষ্ঠ নূরমোহাম্মদ ট্রাস্টের সদস্য সচিব মোঃ আজিজুর রহমান ভুইয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান হিলু, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট এস এ মতিন, মোল্যা কওছার উদ্দিন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ সরদার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও স্কুল কলেজের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ। আলোচনা শেষে দোয়া মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক শেখ নূর মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার (মহিখোলা) বর্তমান নূর মোহাম্মদ নগরে জন্মগ্রহন করেন। দরিদ্র পিতা মোঃ আমানত শেখ ও মাতা মোসাঃ জেন্নাতা খানমের আশা ছিল ছেলে বড় হয়ে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশের মুখ উজ্জল করবে। কিন্তু ডানপিটে নূর মোহাম্মদ আর বেশিদুর এগোতে পারেননি। স্থানীয় বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত অবস্থায় তাঁর শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে।

এরপর ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ নূর মোহাম্মদ তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্থান রেজিমেন্টে যোগদান করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে একই বছরের ০৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর সেক্টরে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৭০ সালের ০১ জুলাই যশোর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ ৮ নং সেক্টরে সাবেক ইপিআর ও বাঙ্গালি সেনাদের নিয়ে গঠিত একটি কোম্পানীতে যোগদান করেন। ‘৭১ এর ০৫ সেপ্টেম্বর নূর মোহাম্মদ যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গোয়ালহাটি গ্রামের সম্মুখ যুদ্ধে একটি টহলের নেতৃত্ব দিচ্ছেলেন। সঙ্গী ছিল আরও ৪ জন সৈন্য। তারা পার্শ্ববর্তী ছুটিপুর পাক হানাদার বাহিনীর ঘাঁটির ওপর নজর রাখছিলেন। পাকবাহিনী টের পেয়ে বিপদজনক অবস্থার মুখে টহলদারী মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করে। হানাদারদের এই পরিকল্পনা বুঝে উঠতেই নূর মোহাম্মদ সঙ্গীদের নিয়ে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করেন। শুরু হয় সম্মূখ যুদ্ধ। মারাত্মক আহত হলেন সঙ্গী নান্নু মিয়া। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলে হানাদারদের মর্টার শেল মারাত্মকভাবে জখম করে নূর মোহাম্মাদকে। মৃত্যু আসন্ন বুঝে তিনি সিপাহী মোস্তফা কামালের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে সবাইকে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেন। উপায়োন্তর না পেয়ে তারাও তাই করলেন, কিন্তু একটি এসএলআর রেখে যান মারাত্বক আহত কমান্ডারের কাছে। নূর মোহাম্মাদ মৃত্যুপথযাত্রী হয়েও এসএলআর নিয়ে শেষবারের মত ঝাঁপিয়ে পড়েন হানাদারদের উপর সেখানেই তিনি শহীদ হন। পরবর্তীতে নিকটবর্তী একটি ঝোঁপের মধ্যে এই বীরের মৃতদেহ পাওয়া যায়। শত্রুর বেনয়টে তার দেহ ছিল ক্ষত বিক্ষত, চোখ দু’টি কোটর থেকে উপড়ে ফেলেছিল নরপিশাচেরা।

ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ সঙ্গী সৈনিকদের প্রতি যে ভালবাসা প্রদর্শন করেন এবং মৃত্যু নিশ্চিত বুঝে দেশের জন্য আবারও হানাদারদের খতমের জন্য একা ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতার পথ সুগম করার চেষ্টা চালিয়ে দেশপ্রেমের যে প্রমাণ রেখেছেন তার কোন তুলনা নেই। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এদেশের মাটিতে নূর মোহাম্মাদের রক্তের গন্ধ পাওয়া যাবে। যতদিন এ জাতি থাকবে ততদিন নূর মোহাম্মাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।