ঢাকার বস্তির মানুষের দুশ্চিন্তা এখন এনজিও’র কিস্তি

8

নড়াইল কণ্ঠ : ঢাকার মিরপুরের রূপনগর চলন্তিকাসহ চারটি বস্তির ২৫ হাজারের মতো ঘর পুড়ে গেছে। এসব বস্তির বাসিন্দাদের বেশিরভাগেরই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে ঋণ নেয়া রয়েছে। ঋণের টাকায় কেউ ঘর তুলেছেন, কেউ রিকশা আবার কেউবা টিভি-ফ্রিজ কিনেছেন। প্রতি সপ্তাহেই তাদের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। সব হারিয়ে নিঃস্ব এসব মানুষ কীভাবে এই ঋণ পরিশোধ করবেন, কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
রূপনগরের চলন্তিকা মোড় থেকে আরামবাগের নিচু এলাকা পর্যন্ত মোট চারটি বস্তি রয়েছে। সেগুলো হলো- চলন্তিকা, ঝিলপাড়, আরামবাগ ও টবলক বস্তি। প্রতিটি বস্তিতে চার থেকে পাঁচ হাজার ঘর ছিল। সব পুড়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ অল্প টাকায় এখানে ভাড়া থাকেন। তাদের বেশিরভাগ পোশাক কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপনগরের ঝিলের মধ্যে গড়ে ওঠা বস্তিগুলোর হাজার হাজার ঘর পুড়ে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ ঘর থেকে কিছু বের করতে পারেননি। নিম্ন আয়ের মানুষ এক কাপড়ে বের হয়ে চোখের সামনে দেখেছেন জীবনের সব সম্বল পুড়ে যেতে। আগুনের পর বস্তির মানুষ চলন্তিকা মোড়, মিল্কভিটা ও আরামবাগ আবাসিক এলাকার সড়কে অবস্থান নিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষ বলছেন, বস্তিতে এমন আগুন তারা আগে কখনও দেখেননি।
পুরনো বাসিন্দারা নিজেরাই ঝিলের ওপর ঘর তৈরি করে থাকেন। অতিরিক্ত কিছু ঘর তৈরি করে সেগুলো এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় ভাড়া দেন কেউ কেউ। ঘর তুলতে তারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন।
ক্ষতিগ্রস্ত রাজিয়া বেগম বলেন, ‘সমিতি থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নয়টি ঘর তুলেছিলাম। এখনও ভাড়া দিতে পারিনি। এর মধ্যেই আগুন। আগুনে সবগুলো ঘর পুড়েছে। এখন কীভাবে এই ঋণ পরিশোধ করবো?’
পোশাক শ্রমিক শিল্পী এই বস্তিতে পরিবার নিয়ে থাকেন। তার জন্মও এখানে। বিয়ের পর স্বামী সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল। স্বামী ভ্যানে করে পিয়াজ-রসুন বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি লালমাটিয়ায় ছোট বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুই ছেলেও আমার সঙ্গে ছিল। সেখানে বসে আগুনের কথা শুনতে পাই। ঘরের ভেতরে বেতন-বোনাসের টাকা, স্বামীর ব্যবসার চালানের টাকা ছিল। ব্যাংকের ডিপিএসের কাগজপত্র সব পুড়েছে। সমিতি থেকে টাকা তুলে ফ্রিজ টিভি কিনেছিলাম, তাও পুড়েছে। কিছু রক্ষা করতে পারলাম না। কিস্তির টাকা কীভাবে দেবো বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেছেন, ‘কয়েক সপ্তাহ বস্তির বাসিন্দারা যেন কিস্তি থেকে অব্যাহতি পান, সেজন্য আমরা ওই সব এনজিও’র সঙ্গে কথা বলবো। আপাতত রূপনগরের পাঁচটি স্কুলে ক্ষতিগ্রস্তদের থাকতে দেয়া হয়েছে। রাত থেকেই তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।’ তবে এতো মানুষকে থাকার জায়গা দেওয়া তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি। এই পরিস্থিতিতে এলাকার মানুষ যেন তাদের পাশে দাঁড়ায় সেজন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রূপনগরের সবচেয়ে বড় এই বস্তিতে আগুন লাগে। বিভিন্ন এলাকার ৬০-৭০ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করেন। তিন ঘণ্টার আগুনে সব ঘর পুড়ে গেছে। এই বস্তির বয়স ৩০-৪০ বছর। বস্তির পরিধি দিন দিন বেড়েছে। একটি মহল বস্তিতে অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের আশঙ্কা করা হলেও শেষ পর্যন্ত এ রকম কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে চারজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, আগুনের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চারজন আহত হয়েছেন। ২৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। আগুন নিভে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই বলা যাচ্ছে না। তদন্তের পর বলা যাবে। পানির স্বল্পতা ও বস্তিতে প্রবেশের রাস্তা না থাকায় ঘটনাস্থলে পানি দিতে বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।