দুর্নীতি ঠেকাতে যেয়ে রোষানলে পড়েছেন প্রধান শিক্ষক মালতী পাঠক

170

নড়াইল কণ্ঠ : কম্পিউটারের ভূয়া সনদে চাকুরীতে সহায়তা না দেয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ে চাকুরী হারানোর আশংকায় নড়াইল সদরের মালিয়াট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মালতী বালা পাঠক। খোদ খুলনা মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) উপ-পরিচালক নিভা রাণী পাঠক অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে শিশির বিশ্বাসকে এমপিওভুক্ত করে দেওয়ার জন্য চাপ দেবার অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে টেলিফোনে কয়েক দফা হুমকি আর কারন দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন ঐ উপ-পরিচালক। এ ঘটনায় ভীত হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রধান শিক্ষক মালতী পাঠক।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, স্থানীয় শিশির বিশ্বাস ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর মালিয়াট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক (কম্পিউটার ) পদে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির তৎকালিন সভাপতি অজিত বিশ্বাস ও ভার প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ক্ষিরোদ বিশ্বাস নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং তারিখ বিহীন দুই লাখ টাকার একটি চেকসহ সাত লাখ টাকা চুক্তিতে তাকে নিয়োগ দেন। কিন্ত দীর্ঘদিনে এমপিও ভূক্ত না হওয়ায় তিনি বিদ্যালয় ছেড়ে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি সদরের দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নিয়ে চলে যান। কিন্ত সেখানে ৩ বছরের কম্পিউটার ডিপ্লোমা কোর্সের ভূয়া সনদ প্রদানের জালিয়াতি প্রমাণ হওয়ায় এনটিআরসিএ হতে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন পেয়েও যোগদান করতে পারেননি। দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাসুদেব সেন তার এ জালিয়াতির বিষয়টি ধরে ফেলেন। ধরা পড়ে শিশির বিশ্বাস, বাসুদেব সাহা সহ অন্যদের কাছে ক্ষমা চেয়ে পুলিশে না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে পার পেয়ে যান।
জালিয়াতির কারনে দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করতে না পেরে পুনরায় মালিয়াট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। সেখানে এসে গত ০৬ ফেব্রুয়ারি নি¤œœ মাধ্যমিক শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত করে দেওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক মালতি পাঠককে নানাভাবে চাপ দিতে শুরু করেন। প্রধান শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি রঞ্জন মিশ্র জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ নেয়া শিক্ষক শিশির বিশ্বাসকে এমপিওভূক্তির জন্য আবেদনে সম্মত হননি, এমনকি সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুল হক ও শিশিরের আবেদনে সাড়া দেননি।
ভূয়া এই শিক্ষকের এমপিও ভুক্তির আবেদনের কাগজ পত্রে স্বাক্ষর করতে রাজী না হওয়ায় প্রধান শিক্ষক মালতি পাঠককে স্কুলের ভিতরই অপমান করে চাকুরী খেয়ে ফেলার হুমকী দেন শিশির বিশ্বাস।
হুমকী দিয়েই ক্ষান্ত হননি শিশির বিশ্বাস। উপ-পরিচালক নিভা রাণী পাঠকের বড় ভাই প্রদীপ পাঠক এর মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানায়, উপ-পরিচালক নিভা রানীর বড় ভাই প্রদীপ পাঠককে ঘুষ দিয়ে তার মাধ্যমে নিভা রানীকে ম্যানেজ করেন শিশির বিশ্বাস।
বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি রঞ্জন মিশ্র বলেন, শিশিরের কাগজপত্র ছেড়ে দিতে উপ-পরিচালক নিভারানী পাঠক প্রধান শিক্ষকেকে হুমকী দিয়েছেন এটা আমিও শুনেছি। তবে প্রধান শিক্ষক আইনের ব্যত্যয় হচ্ছে এই ভয়ে তিনি এটি করতে গড়িমশি করছেন।
এদিকে শিশির বিশ্বাসের নিয়োগের জন্য নিজ উদ্যোগেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দ্বায়িত্ব দেন উপ-পরিচালক নিভা রানী পাঠক। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উপরের কর্তার চাহিদা মোতাবেকই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরী করেছেন।
নড়াইল সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, মালতী পাঠক ম্যানেজিং কমিটির দ্বারা ১০ বছর চাকুরীচ্যূত ছিলেন, পরে হাইকোর্টে রিট করে চাকরী ফেরত পেয়েছেন, সেই জন্য হয়ত তিনি কমিটিকে বাইপাস করে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন। আমার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ আমাকে বাদ দিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করালে এখানে আমার কি করার আছে।
অভিযুক্ত শিশির বিশ্বাস বলেন, আমি আমার বেতন এমপিও হবার জন্য নিয়ম মতো বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি। উপ-পরিচালক আমার আতœীয় হয় তাই ডিডি অফিসে ওনার কাছে গিয়েছি, তার ভাইকে উৎকোচ দেবার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
মালতি পাঠকের সাথে কথা বলে জানা যায়, আপন আতœীয় হওয়ার সুবাদে উপ-পরিচালক নিভা রাণী পাঠক গত ৪ এপ্রিল প্রথম দফা, ১৫ এপ্রিল ২য় দফা এবং ২৩ মে ৩য় দফা প্রধান শিক্ষক মালতী পাঠককে মোবাইলে শিশির বিশ্বাসের এমপিও না হলে প্রধান শিক্ষকের বেতন বন্ধ করা হবে এই বলে হুমকি দেন। এছাড়া স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে নিভা রাণী পাঠক এর বড় ভাই প্রদীপ পাঠক গত ২৭ মে মালিয়াট বাজারে শিশিরের বেতন ভাতা এমপিও করার জন্য হুমকি দেন।
মালতি পাঠক আরো বলেন, এর আগে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে ২০০৬ সালে আমাকে বরখাস্ত করেন তৎকালীন স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষক। আমি আদালতে মামলা করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে ২০১৬ সালে আবার চাকুরী ফেরত পাই। ষড়যন্ত্রের কারনে দশ বছর আমি বেতন পাইনি, আবারও ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে এবার আমার বড় দিদি নিভারানী পাঠক আমার চাকুরী খেয়ে ফেলার হুমকী দিচ্ছে, অন্যায় মেনে নিলে সবার কাছে ভালো থাকা যাবে, আমি অন্যায় সমর্থন করছি না বলে আজকে আমার এই দশা, আমি যাব কোথায়, কার কাছে বিচার চাইবো।
উল্লেখ্য, সদরের মালিয়াট গ্রামেই বাড়ি খুলনা মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) উপ-পরিচারক নিভা রাণী পাঠক। তিনি এলাকার নানা বিষয় সরাসরি তদারক করেন। শিশির বিশ্বাসকে এমপিওভুক্ত করে দেবার চাপ প্রসঙ্গে বলেন, আমি চাপ দিতে যাব কেন? আপনারা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন। আমার ভাই এসব করতে যাবে কেন? বরং আমার কাছে খবর আছে প্রধান শিক্ষক এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি শিশির বিশ্বাসের কাছে অনৈতিক কিছু দাবী করেছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাইয়েদুর রহমান বলেন, আমাকে ম্যাডাম (মাউশি) উপ-পরিচারক নিভা রাণী পাঠক) বললেন বিষয়টি দেখতে তাই আমি কয়েকবারই স্কুলে গেছি। একটা তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছি।
জালিয়াতির মাধ্যমে শিশিরের অনৈতিক বিষয় নিয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি সহ স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।