সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্ত রুখে দিন

0
25

নড়াইল কণ্ঠ ডেস্ক : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো চক্রান্ত রুখে দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা। শনিবার (২০ জুলাই) এক যৌথ বিবৃতিতে মোর্চার নেতারা এ আহ্বান জানান।
তারা আরো বলেন, দেশে হঠাৎ করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পরিকল্পিত চক্রান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চার নেতৃবৃন্দ।
গত কিছুদিন ধরে হঠাৎ করেই দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলার একটি চাপা ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টি করে পরিকল্পিত অশান্তি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অপচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করছি। জনৈক প্রিয়া সাহা নাম্মী মানবাধিকার কর্মি কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ-বিরোধী বক্তব্য এবং বাংলাদেশে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের আহ্বান সেসব চক্রান্তেরই বহিঃপ্রকাশ বলে আমরা মনে করি।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও ঘটে চলেছে- এ বিষয়টি কেউ অস্বীকার করেনি। কিন্তু তার যে সংখ্যাগত পরিসংখ্যান প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর কাছে উপস্থাপন করেছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা বরাবরই সোচ্চার। বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আমরা পরিষ্কারভাবে মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিগত চেতনার উন্মেষ হয়েছিলো, তা ক্ষুণ্ন করেন দুই অবৈধ সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সংবিধানের ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে উল্টো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অধিকার দেওয়া এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়েছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় ওইসব সামরিক শাসকের আমলে এবং পরবর্তীতে বিএনপি-জামাত শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এখনও সংবিধানে বহাল রয়ে গেছে। আমরা আশা করবো, অনতিবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ওই ৮ম সংশোধনীও বাতিল করার উদ্যোগ নেবে বর্তমান সরকার। এই সরকারের আমলেও যে সমস্ত সংগঠিত কিংবা বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেসবেরও বিচার আমরা প্রত্যাশা করি।
আমরা মনে করি, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং দেশত্যাগের যে সমস্ত ঘটনা এখানে ঘটেছে, দেশের প্রচলিত আইনেই তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিচারের দাবিতে দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সকল শক্তিকেই ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও মনগড়া তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে বিদেশি কোনো বহিঃশক্তির কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ কামনা করা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। যিনি এ কাজ করেছেন, তিনি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও গর্হিত অপরাধ করেছেন। বাংলাদেশের সরকার এ ব্যাপারে তার নিজস্ব আইন অনুযায়ীই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা আশা করি।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি পত্রিকায় কলাম লিখে নিজ দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মনগড়া অভিযোগ তুলে ধরে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জিএসপি সুবিধা বাতিল করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসও তার গ্রামীণ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে মার্কিন সরকারের কাছে লবিং করেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী জামাতে ইসলামী বহুবার এ ধরনের কাজ করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি বাতিল করে ওই বিচারকাজ বন্ধ করতে জামাত-বিএনপি গোষ্ঠী বহু টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করেছে। বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমানও নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ও সাজার হাত থেকে বাঁচতে আন্তর্জাতিক লবিং করেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বহিঃশক্তির কাছে এ ধরনের হস্তক্ষেপ কামনা করা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ বলে আমরা পরিষ্কারভাবে মনে করি। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছি, এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতাকে কেউ কেউ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই পরিণত করেছে। আমরা এ ধরনের সকল অপতৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আহ্বান জানাই। একই সাথে এসব অপরাধের বিচার দাবি করি।
আশঙ্কাজনক হলো, রাষ্ট্রে যখন একটি গণতান্ত্রিক আবহ বিরাজ করছে, পুরো বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি অপেক্ষা করে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের জন্য, তখনই দেশে নতুন করে চক্রান্তমূলক উস্কানি ও পরিকল্পিত অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। কেবল প্রিয়া সাহার ঘটনাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের আশঙ্কাজনক গুজব গ্রাম-গঞ্জ-প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমরা দেশপ্রেমিক সকল শক্তি ও ব্যক্তির কাছে আহ্বান জানাই, এ ধরনের চক্রান্তমূলক কোনো উস্কানির ফাঁদে কেউ পা দেবেন না। একইসাথে পানি ঘোলা করে যারা মাছ শিকারে তৎপর আছে, তাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করুন।
বাংলাদেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্র বজায় রেখেই তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে। এখানে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সম্প্রীতি বিনষ্টের কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
২০১৫ সাল থেকেই জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা এ লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। আমরা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লড়াই থেকে কোনোভাবেই এক চুলও বিচ্যুত হবো না।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সকল অভ্যন্তরীণ বিষয় সমাধানের মালিক একমাত্র বাংলাদেশ ও তার জনগণ। কোনো নিকটতম প্রতিবেশী কিংবা দূরতম কোনো রাষ্ট্র আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কর্তৃপক্ষ নয়।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেন তারা হলেন, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা- সহ সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, অসীম সাহা- কবি ও সাংবাদিক, সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ- আহ্বায়ক, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা, ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল- সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, আব্দুজ জাহের- সহযোগী অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি- উপদেষ্টা, গৌরব ৭১, এস এম মনিরুল ইসলাম মনি- সভাপতি, গৌরব ৭১, ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা- সভাপতি, ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান), বাণী ইয়াসমিন হাসি- সম্পাদক, বিবার্তা.নেট, জয়নাব বিনতে হোসেন- সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাসুদ পথিক- কবি ও চলচ্চিত্র পরিচালক, সভাপতি, ওয়ার্ল্ড অটিজম এন্ড ইকোলজি ফিল্ড ফোরাম বাংলাদেশ, অনিকেত রাজেশ- সভাপতি, উঠোন সাংস্কৃতিক সংগঠন , অর্ণব দেবনাথ- সহ সভাপতি, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট, মুনতাহা বিনতে নূর- চেয়ারপারসন, এনভায়রনমেন্টাল কগনিশন এন্ড অ্যাওয়ারনেস ফর ডিসেনড্যান্টস, এফ এম শাহীন- প্রধান সমন্বয়ক, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা, ফারাবী বিন জহির অনিন্দ্য- কেন্দ্রীয় সদস্য, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা ও বাপ্পাদিত্য বসু- সমন্বয়ক, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here