পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির অভিযোগ বনাম বাস্তবতা

47

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যতম পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। নিজেদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে গুম, খুনসহ সকল ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। জনসংহতি সমিতির সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ সাধারণ পাহাড়িরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং জীবনমান উন্নয়নসহ শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে দীর্ঘদিন ধরে “অপারেশন উত্তরণ” এর আওতায় সেখানে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাহাড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) তথা সংস্কারবাদী গ্রুপের মতো বিভিন্ন পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে একাধিকবার পাহাড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তাদের ওয়েবসাইটে সেনাবাহিনীর উপর নানা ধরণের অভিযোগ করে একটি মনগড়া ও কল্পনাপ্রসূত প্রেস রিলিজ প্রকাশ করেছে।

প্রেস বার্তায় অভিযোগ করে বলা হয়েছে যে, রাঙামাটির বরকল উপজেলার সুবলং এলাকায় গত ২৭ জুন স্মৃতিময় চাকমা ওরফে কোকো নামের জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের সদস্য চাঁদাবাজি করতে গিয়ে অজ্ঞাতদের হাতে নিহত হয়। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসংহতি সমিতির সদস্য সহ ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এই মামলাকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে তা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায় জনসংহতি সমিতির সক্রিয় সদস্যদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বেই স্মৃতিময় চাকমা ওরফে কোকোকে হত্যা করা হয়েছে। আর যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে তা পিসিজেএসএস নিয়ন্ত্রিত এলাকা বলে নিশ্চিত করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গণমাধ্যম কর্মী। গত ২৭ জুন কংকর বোঝাই দুটি ট্রলার সুবলং বাজার হয়ে লংগদুর উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলো, এসময় জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের কিছু সদস্য ওই দুটি ট্রলারকে সুবলং বাজারে মাঝিঘাটে ভিড়ানোর নির্দেশ দেয়, এসময় ট্রলারের চালক নির্দেশ না মেনে হাজাছড়াস্হ আমবাগানের দিকে চলে যেতে থাকে। এসময় জনসংহতির সংস্কারপন্থী দলের স্মৃতিময় চাকমা কোকোসহ অন্য সদস্যরা ট্রলার দুটিকে ধাওয়া করে, এসময় আগে থেকে আমবাগানে ওৎ পেতে থাকা সন্তু লারমাপন্থী জনসংহতির সদস্যরা সংস্কারপন্থী জনসংহতি সমিতির সদস্যদের লক্ষ্য করলে গুলি ছুড়লে এতে স্পিড বোট চালক স্মৃতিময় চাকমা ওরফে কোকো গুলিবিদ্ধ হয়ে পানিতে পড়ে যায়, পরে তার লাশ লেক থেকে উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, নিহত কোকো সংস্কারবাদী গ্রুপের জনৈক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ট আত্মীয়।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রেস বার্তায় পাহাড়ে শান্তি প্রক্রিয়া বিনাশ করতে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মদদ দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ করলেও অভিযোগের পক্ষে তারা কোনো তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। এছাড়া প্রেস বার্তার এক জায়গায় একটি ঘটনার উল্লেখ করে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্হার বিরুদ্ধে ১৪ সদস্যদের সশস্ত্র দলকে নিরাপত্তা দিয়ে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে যা সম্পূর্ণ অবান্তর ও ভিত্তিহীন। তাছাড়া, মিয়ানমারের অন্য একটি বিদ্রোহী গ্রুপকে প্রশ্রয় দেয়ার মতো নির্জলা মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরোদ্ধে। মূলত সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করে দেশ ও বিদেশের নানা কুচক্রিমহলকে সুযোগ করে দিতে তারা এসব অপপ্রচারণায় নেমেছে বলে মনে করেন স্হানীয় শান্তিপ্রিয় জনগণ। মূলতঃ সেনাবাহিনী ও বর্তমান সরকান নিজের সর্বস্ব দিয়ে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে তারা অনেকখানি সফলতা অর্জন করেছে, যার স্বাক্ষী হচ্ছে পাহাড়ের সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণ।

প্রসঙ্গত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর ১১-সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। একদিকে জনসংহতি সমিতির দাবিদাওয়া ও পাহাড়ি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি সরকারের ইতিবাচক মূল্যায়ন এবং অন্যদিকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিহার করে রাজনৈতিক সমাধানে জনসংহতি সমিতির আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষ শান্তিচুক্তি স্থাপনে ঐকমত্যে পৌঁছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান ঘটে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর জনসংহতি সমিতি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তারা তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করেনি এখনো। বরং তাদের চাঁদাবাজি, গুম, হত্যা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা পূর্বের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এই দলের কাছে অসহায়। আর এসব অসহায় মানুষের পাশে থেকে চাঁদাবাজি, গুম ও খুনের পরিস্হিতি নির্মূলে সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী সেখানে কোন গ্রুপের প্রশয়দাতা না হয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে জড়িত সকলকেই আইনের আওতায় আনতে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে। পিসিজেএসএস এর এরূপ সেনাবিদ্বেষী ও রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে অপপ্রচারণা নতুন কোন বিষয় নয়। সংস্কারবাদী গ্রুপের শীর্ষনেতার ঘনিষ্ট আত্মীয় নিহতের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে, এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর যাদের আসামী করা হয়েছে তারা সকলেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত বলে জানান চাপে পড়ে ইউপিডিএফ থেকে পিসিজেএসএস এ যোগদান করা স্হানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করায় খোদ পিসিজেএসএস এর বরকল উপজেলা শাখার জনৈক শীর্ষ মহিলা নেত্রীও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনি চাকমাও এতে বিব্রত বোধ করছেন বলে অত্র প্রতিবেদকের সাথে মোবাইল কথোপকথনে জানিয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে এরূপ প্রচারণা কখনই দলের জন্য সুফল বয়ে অানবেনা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে সর্বদা সচেষ্ট। পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক ও জনবিরোধী উদ্যোগ নেই। ভূমি কমিশন গঠন ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল ২০১০’ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ধারণা সবাই মেনে নিয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার প্রচেষ্টাকে সহায়তা ও সমর্থন করা সেখানকার উন্নয়নের জন্য জরুরি বলেও মনে করছেন একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। পাশাপাশি পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ধারা বজায় রাখতে যেকোন ধরণের অপপ্রচার চালানো থেকে সকলকেই বিরত থাকতে আহবান জানিয়েছেন স্হানীয় একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যম কর্মী।