কালিয়া হাসপাতাল এখন চরম চিকিৎসা সংকটে!

265

নড়াইল কণ্ঠ : নড়াইলের কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন মাত্র চিকিৎসা কর্মকর্তা (মেডিকেল অফিসার)। রোগী দেখছেন চিকিৎসা সহকারিরা (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট)। বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি হওয়া রোগীদের সামাল দিচ্ছেন তাঁরা। প্রচুর রোগীর ভিড়। ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন রোগীরা, তারপরও পাচ্ছেন না চিকিৎসা সেবা।

চিকিৎসক-সংকটের এ চিত্র নতুন নয়। বরাবরই এ চিত্র নড়াইলের কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হঠাৎ গত মাসে (২০ জুন) একদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ হাসপাতালে অবস্থান করে এ চিত্র দেখা যায়। এহেন পরিস্থিতিতে এ উপজেলায় প্রায় তিন লাখ জনসংখ্যা মানুষ অত্যাবশকীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ।

এদিকে হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালটি ছিল ৩১ শয্যার। ২০০৮ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। চিকিৎসকের পদ আছে ২১টি। এরমধ্যে ৮টি চিকিৎসা কর্মকর্তা পদের মধ্যে আছেন একজন। ১০টি বিশেষজ্ঞ পদের মধ্যে আছেন শুধু গাইনি বিশেষজ্ঞ। আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ও ডেন্টাল সার্জন পদও শূণ্য। এদিকে উপজেলায় একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটিতে আছে একজন করে চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ। তার সবগুলোই শূণ্য।

চিকিৎসা সহকারী ও কর্মচারীরা জানান, এতদিন ছোটখাটো অস্ত্রোপচার হচ্ছিল। অ্যানেসথেসিয়ার কাজটি করতেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি সম্প্রতি বদলি হওয়ায় অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে। অত্যাধুনিক এক্স-রে যন্ত্রটি প্রায় ১০ বছর ধরে বিকল। অপারেটর না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রটি প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে পড়ে আছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে কর্মরত ফার্মাসিস্ট আশিষ বাগচী জানান, প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন শ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়। কোনো কোনো দিন পাঁচ শ রোগীও হয়। এর অধিকাংশই নারী রোগী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে রোগী দেখছেন চিকিৎসা সহকারীরা। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শরীফ সাহাবুবুর রহমান ঘুরে ঘুরে সব বিভাগ সামলাচ্ছেন। বহির্বিভাগের ১১ নম্বর কক্ষে রোগী দেখছিলেন মুক্তা পাল। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ১৫০-২০০ রোগী দেখি।’ ১০ নম্বর কক্ষে বসে রোগী দেখছিলেন লিপু অধিকারী। তিনি বলছিলেন, ‘চিকিৎসা কর্মকর্তা না থাকায় সব বিভাগ আমাদেরই সামাল দিতে হয়। সাড়ে চার বছর ধরে এভাবে সামলাচ্ছি।’

দুই অশীতিপর বৃদ্ধা গোলেজান বিবি (৮২) ও আখিতোননেছা (৮১) পাশাপাশি বসে আছেন বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে মেঝেতে। দুজনেরই মাথায় জ্বালা-পোড়া। সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের। তখনও ডাক্তার দেখাতে পারেননি তাঁরা। কালিয়ার সিতারামপুরের বাসিন্দা গোলেজান বিবি বলছিলেন, ‘ডাক্তার দেখাতি আইছি সকাল সাতটায়। বিটার বউ আমারে নিয়ে আইছিল, কয়ঘণ্টা বসে অধর্য্য অয়ে সে চলে গেছে।’ কলেজপাড়ার বাসিন্দা আখিতোননেছা বললেন, ‘সকাল সাতটায় আইছি, হ্যান্নেও টিকিট কাটতি পারিনেই। লাইনি দাঁড়াইছিলাম, ঠেলাদে ফেলায় দেছে, এহেনে বসে রইছি।’

একইভাবে ইসলামপুরের মুরছালিনা (৫০) এসেছেন সকাল আটটায়, বিলবাউচের রাজিয়া বেগম (৬২) সাড়ে আটটায় ও বড়কালিয়ার নমিতা মাঝি (২৮) নয়টায় এসেছেন। তাঁরা দুপুর ১২টায়ও চিকিৎসা নিতে পারেননি।
নার্স তত্ত্বাবধায়ক বিদিশা রায় জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে। সবাইকে বিছানায় দেওয়া যায় না। চিকিৎসক না থাকায় সেবা ব্যাহত হয়। এসব কারণে নার্সদের ওপরই যত চড়াইওতরাই। হামলাও শিকার হতে হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শরীফ সাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘একজন মাত্র চিকিৎসা কর্মকর্তা, তাও নারী। হাসপাতালের এ অবস্থায় পারিবারিক অতিপ্রয়োজনেও তিনি ছুটিতে যেতে পারেন না। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজে একদিনের ছুটিতে গেছেন। এ অবস্থায় ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, বহির্বিভাগ ও ভর্তি হওয়া রোগীদের সামাল দেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য। এরপর রয়েছে প্রশাসনিক কাজকর্ম, প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন সভায় যোগদান, মামলার সাক্ষ্য দেওয়াসহ নানা কাজ।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ হাসপাতালটি সম্পর্কে কালিয়াবাসীর নেতিবাচক ধারণা ছিল। আমি আসার পর হাসপাতালমুখী করেছি রোগীদের। রোগী বেড়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রোগীদের সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। সমস্যার ব্যাপারে নিয়মিত লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।