দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাটারি রি-সাইকেল প্লান্ট নড়াইলে

0
582

কিষাণ অ্যাকুমুলেটরস্ লিমিটেড

নড়াইল কণ্ঠ : প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে ঘেরা চিত্রা, কাজলা, মধুমতি নবগঙ্গা বিধৌত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহি জেলার নাম নড়াইল জেলা। দেশের অন্যান্য জেলাসমূহে দৃশ্যমান বিভিন্ন উন্নয়নের ছোঁয়া পেলেও নড়াইল জেলাতে তেমন কোন উল্লেখ্যযোগ্য উন্নয়নের ছায়া পড়েনি।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে বাংলাদেশের প্রথম জেলা টাঙ্গাইল এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নড়াইল জেলা। এ জেলার আপামর জনগণের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক অবদান থাকলেও স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও নড়াইলে উল্লেখ্যযোগ্য তেমন কোন শিল্প কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকারের সময়কালে পদ্মা সেতু, মধুমতি নদীর ওপর কালনা সেতু, ঢাকা-নড়াইল-বেনাপোল-কোলকাতা মহাসড়ক এবং রেল লাইনের কাজ শুরু হওয়ায় শিল্প উদ্যোগতাদের নিকট ভৌগোলিকভাবে এ জেলার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। এ এলাকায় শিল্পকলকারখানা স্থাপনের জন্য জমি কেনা-বেচাসহ বিভিন্নভাবে দৌঁড় ঝাপ শুরু হয়েছে শিল্পপতি-ব্যবসায়িদের। ইতিমধ্যে নড়াইলে ছোট-খাটো কয়েকটা শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি নড়াইল জেলা শহরের উজিরপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘ব্যাটারি রি-সাইকেল প্লান্ট’ “কিষাণ অ্যাকুমুলেটরস্ লিমিটেড” শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি। পরিবেশ বান্ধব ‘ব্যাটারি রি-সাইকেল প্লান্ট’টি ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সফলতার সাথে উৎপাদন শুরু করে আসছে। ইতোমধ্যে এই কারখানার ‘সীসা’ জায়গা করে নিয়েছে নাভানা, লুকাস, সাইফ পাওয়ার টেকসহ দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যাটারী কারখানাতে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে মধুখালি, গাজীপুর এবং নড়াইলে মোট তিনটি ব্যাটারি রি-সাইকেল প্লান্ট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন নড়াইল জেলা শহরের উজিরপুর গ্রামের এই ‘ব্যাটারি রি-সাইকেল প্লান্ট’। খুলনা, সিলেট, চিটাগাং, কুমিল্লা, ঢাকা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুরাতন ব্যাটারি ক্রয় করে সম্পূর্ন মেশিনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থান থেকে কেটে পুরাতন ব্যাটারির সীসা আলাদা করা হয়। পরে সীসাকে গলিয়ে বর্জ্য আলাদা করে বিশুদ্ধ সীসা বের করা হয়। পিওর সীসাকে গ্রে-অক্সাইড ও রেড-অক্সাইড দুইভাগে ভাগ করে নাভানা, লুকাস, সাইফ পাওয়ার টেকসহ দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যাটারী কারখানাতে সেই সীসা বিক্রি করা হয়।

উল্লেখ্য, এই কারখানা হতে পুরাতন অব্যবহৃত ব্যাটারি থেকে এখানে মাসে ৫শ’ টন টন সীসা উৎপাদন করার ক্ষমতা রয়েছে। এখানে রয়েছে নিজস্ব ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও বায়ু ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ব্যবস্থা। এ কারখানার সব বর্জ্য পানি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে ফিলটারিং হয়ে কারখানার মধ্যেই নির্দিষ্ট পুকুরে যায়। সেই পুকুরে মাছের চাষ করা হয়। বায়ু দুষন রোধ করার জন্য এখানে বায়ু ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ব্যবস্থা করা রয়েছে। মেশিনের মাধ্যমে বায়ু পরিশোধিত হয়ে উঁচু পাইপের মাধ্যমে বের করা হয়।

কারখানায় কর্মরত কর্মকর্তারা জানান, সীসা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেখানে সেখানে পুরাতন ব্যাটারি দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে সেই ব্যাটারির সীসায় পরিবেশের অনেক ক্ষতি হয়। এই কারখানায় পুরাতন ব্যাটারি সংগ্রহ করে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সীসা সংগ্রহ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরাতন ব্যাটারি সংগ্রহ করায় পরিবেশের অনেক উপকার হচ্ছে।

এই কারখানায় দেড় শতাধিক শ্রমিক কাজ করে। এখানে স্থানীয় শ্রমিক রয়েছে অন্তত ১শ’ জন। কারখানাটিতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক। এখানের নারী শ্রমিক ও পুরুষ শ্রমিকদের কোন বেতন বৈষম্য নেই। প্রতিটা শ্রমিককে প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজ করতে হয়। ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করলে সে শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময়ের মজুরী পান। একই কাজে প্রতিটা নারী-পুরুষ সমান মজুরি পান। একজন শ্রমিক মাসে অন্তত ১২/১৩ হাজার টাকা আয় করেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রতিটা শ্রমিককে তিন বেলা খেতে দেয়া হয়। শ্রমিকদের জন্য বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট পোশাক রয়েছে। প্রতিটা শ্রমিককে মাসে একরাব করে কোম্পানির পক্ষ থেকে বিনামূল্যে ডাক্তার দেখিয়ে সারা শরীর পরীক্ষা করা হয়।

এ কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা জানান, এ কারখানায় যারা কর্মরত আছে তারা অধিকাংশ স্থানীয়। বাড়ি থেকে প্রতিদিন কারখানায় এসে কাজ করতে পেরে তারা খুশি। প্রতিদিন মূল ডিউটি করার পরে দিনে ৪/৬ ঘন্টা পর্যন্ত অভার টাইম করতে পারেন তারা। প্রতিমাসের ৫/৬ তারিখের মধ্যে তারা বেতন পান। এছাড়া বছরে ২টা ঈদে তারা বোনাস পাই।

কর্তব্যরত নারী শ্রমিক আসমা বেগম জানান, আগে তিনি ঢাকায় একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। সেখানে তার সাথে যে পুরুষরা কাজ করতো একই কাজ করে তার থেকে বেশি বেতন পেত তারা (পুরুষরা)। এই কারখানায় নারী-পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। প্রতিটা নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মুজুরি সমান। তাই তার মত সব নারীরা আনন্দের সাথে এখানে কাজ করে।

কারখানার নির্বাহী পরিচালক মো: সুরুজ্জামান জানান, এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী প্রকৌশলী কালাম সাহেবের বাড়ি নড়াইল জেলায়। মুলত: নড়াইলের মানুষের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে নড়াইলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান (কলকারখানা) তৈরী করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানটিতে সম্পূর্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করা হয়। যাতে এখানে কাজ করা শ্রমিকদের কোন রকমের শারিরিক ও মানসিক ভাবে ক্ষতি না হয়। নড়াইলের মানুষের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্র্মাণ কাজ চলছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here