প্রতিবন্ধিতা হার মানাতে পারেনি চিত্রশিল্পী সাখিকে

64

নড়াইল কণ্ঠ : চিত্রশিল্পী আরিফুজ্জামান সাখি (৪৫)। জন্মগতভাবেই যিনি প্রতিবন্ধী। দু’টি হাতের পাঞ্জা শক্তিহীন হয়েই তার জন্ম। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা তাঁকে হার মানাতে পারেনি। হাত দু’টি স্বাভাবিক না হলেও ছোটবেলা থেকেই তাঁর নেশা বা আকর্ষণ ছবি আঁকার প্রতি। এই নেশা থেকেই আঁকিয়ে হিসেবে নেমে পড়েন চারুকলার কঠিনতম মাধ্যম ‘পেন স্কেচ আর্ট’ অনুশীলন যুদ্ধে। পেনস্কেচ খুব কম শিল্পীই চর্চা বা অনুশীলন করে থাকেন। এ মাধ্যমে তিনি সফলতাও পেয়েছেন। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্মান। ২০১৩ সালে তিনি জাপানের ইয়াসাকিকো প্রতিযোগিতায় পেনস্কেচ-এর ওপর ছবি এঁকে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এ কৃতিত্বের জন্য জাপান থেকে তাঁকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। যা নড়াইল তথা সমগ্র দেশবাসীর জন্য গৌরবের। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্পী বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নাম আরো উজ্জ্বল করবে বলে অনেকে মনে করেন। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের একনিষ্ঠ ভক্ত সাখি বর্তমানে নিভৃত জীবনযাপন করছেন নড়াইল পৌরসভার নড়াইলগ্রাম’এর এক জীর্ণ কুটিরে। সেখানেই নড়াইলকণ্ঠের সঙ্গে তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন।

শিল্পী সাখি ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার পাঁচুড়িয়া গ্রামে নি¤œমধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা বালাম সরদার (মৃত্যু), মা মিনি বেগম। বাবা ছিলেন একজন জীবন বীমা কর্পোরেশনে চাকুরী করতেন। ৪ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সকলের ছোট। প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিবার বা সমাজ থেকে বিশেষ কোন সুযোগ সুবিধা তিনি পাননি। বাবার চাকুরির সুবাদে যশোর মডেল স্কুলে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এরপর আর পড়ালেখা করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু মন ছিল তার ছবি আঁকায়। তাইতো ১৯৯৮ সালে নড়াইল শহরে এসে নিজে নিজেই শুরু করেন ছবি আঁকার চর্চা। তেমন কেউ তাকে তামিল বা আঁকা শেখাননি। জানাগেছে, জেলার মিঠাপুর গ্রামের শিল্পী মোর্ত্তজা কাছ থেকেই কাজ শিখেছেন।

এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সে নড়াইল শহরে নড়াইল গ্রামে একটি দরজা-জানালা ও বিদ্যুৎবিহীন টিনের ছাবড়া ঘরে রাত্রি যাপন করে চলেছে। খাওয়া-দাওয়া চলে যখন যেমন তেমন, যেখানে যা পায় তার উপর। গোসল করা, কাপড় পরিস্কারের কাজ নিজে সারেন অন্যের বাড়িতে। তিনি এখনও পর্যন্ত বিবাহ করেনি। তার ইচ্ছা তিনি চিরকুমার থাকবেন।

প্রতিবন্ধী চিত্রশিল্পী সাখি তার সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আমাদের জানান, বিশ্ববরণ্যে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান এঁর রেখা চিত্র এঁকে জাপানে ইয়াসাকিকো প্রতিযোগিতায় ২০১৩ সালে প্রথম স্থান হিসেবে এয়ার্ড পান [Mood of Artist S. M Sultan (Pen Sketch one line drawing)]

উল্লেখ্য, এ এওয়ার্ড পাওয়া শিল্পকর্মটি জাপানে প্রতিযোগিতায় পাঠাবার মতো অর্থও ওই সময় আমার ছিলো না। নড়াইল শহরে আমার ঘনিষ্টতমদের মধ্যে অন্যতম সমাজকর্মী কাজী হাফিজ ভাইয়ের সহযোগিতায় ১ হাজার পাঁচ শত টাকা খরচ করে তিনিই আমার শিল্পকর্মটি পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে জাপানে পাঠান। যেদিন আমার কাজটি পোষ্ট করা হয় তখন জাপানে কাজটি পৌঁছাবার সময় ছিলো মাত্র ৪৮ঘন্টা। তিনি পোষ্ট করার পরপর তার ইমেইল থেকে জাপানের ওই প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেন যে, আরিফুজ্জামান সাখির শিল্পকর্মটি বিশেষ ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এ সময় কাজী হাফিজ ভাই আমাকে জানান, আমার এ কাজে অর্থ দিয়ে আরো একজন সহযোগিতা করেছেন, তিনি হলেন, আব্দুল হাই সিটি কলেজের সহকারি অধ্যাপক মলয় কান্তি নন্দী। আমি এসব মানুষের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।

জানা গেছে, বিশ্ববরণ্যে চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের নিজের হাতে তাঁর বাগান বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত লাল বাউল ললিতকলা একাডেমির শিশু শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধী শিল্পী সাখি ‘পেন স্কেচ’ আর্ট শিখান। তিনি ‘পেন স্কেচ’ মাধ্যমে একাডেমির কমলমতি শিশুদের অবৈতনিকভাবে প্রতি শুক্রবার দির্ঘ একযুগ ধরে রেখা চিত্র, প্রাকৃতিক দৃশ্য, জীবন্ত ছবি আঁকা শিখিয়ে আসছেন।

শিল্পী তার ‘পেন স্কেচ’ আর্টের বৈশিষ্ট সম্পর্কে জানান, ‘পেন স্কেচ’ এমন একটি মাধ্যম যে মাধ্যমে কাজ করাটা কঠিন। পেন দিয়ে একটানে কোন ওভাররাইটিং হবে না। কোন মুছামুছি বা ইরেজ করার সুযোগ নেয়া যায় না। আমি সুলতানের এক মিনিটের ছবি এঁকেছি, এ্যাবস্ট্রাক ছবি এঁকেছি দেড় মিনিটে। এই পেন স্কেচের রেখাচিত্র কাজের আরও একটি বৈশিষ্ট্য, সেটা হলো কোন ব্যক্তির ছবি পেন স্কেচ করলে তার মানসিকতা, বিশেষ কোন বৈশিষ্ট বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ ন্যাচারাল ছবি হয়।

এ সময় তিনি আমাদের জানান, আমার কয়েক’শ ‘পেন স্কেচ’ ছবি সংরক্ষণের অবাবে নষ্ট হতে বসেছে। কোন সহযোগিতা পেলে আমার এই কাজগুলি সংরক্ষণ করতে পারলে আগামি প্রজন্ম দেখে অনুপ্রেরণা পেতো। জানি না আদৌ আমার কাজগুলি সংরক্ষণ করা যাবে কিনা।

শিল্পীর জীবন-যাপন সম্পর্কে জানান, আমি মানুষের পোর্টেট আঁকি, তারা খুশি হয়ে গুরুদক্ষিণা যা দেয় তা দিয়ে চলি। সারাদিন ছবি আঁকি, রাতে বাতিবিহীন ঘরে মমবাতি জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার ঘরে, পানি, বাতি, গোসল, বাথরুম করার ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনে পাশের বাড়ির গোসলখানা, বাথরুম ব্যবহার করি। খাওয়া-দাওয়ার কোন ঠিক ঠিকানা নেই।

শিল্পীর ইচ্ছা সম্পর্কে তিনি আমাদের জানান, সমাজের কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সরকার আমার আঁকা ছবিগুলি সংরক্ষণ করে দিলে আমি মানসিক শান্তি পেতাম। কাজগুলি ফ্রেমিং করতে পারলে একটি প্রদর্শনী করতে ইচ্ছা হয়। শিল্পীদের মূল্যায়ণ করা হলে আগামি প্রজন্মের মানুষের মধ্যে মানবিকমূল্যবোধ বৃদ্ধি পাবার সুযোগ সৃষ্টি হতো।

এছাড়া আমার এ কাজগুলি বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিতে চাই। পৃথিবীর মানুষের কাছে জানাতে চাই ‘পেন স্কেচ’ আর্ট কতো জরুরি। আমার কাজগুলি বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিতে কেউ উদ্যোগ নিক এ কামনা করি।

উল্লেখ্য, ‘প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজের বোঝা নয়, সুযোগ পেলে সেও সমাজ ও দেশের অনেক ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে’। একটি মানুষ সমাজ ও পরিবারের ভুলের কারনে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়। এ জন্য ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বাদ রেখে ওই পরিবার, সমাজ ও দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের গড়ে প্রায় ১০% মানুষ প্রতিবন্ধী। নড়াইলে প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। তার মধ্যে আরিফুজ্জামান সাখি একজন।