লোহাগড়ার ‘পজু দেওয়ান মাজার’ মসজিদ সংস্কার ও বেদখলি জমি উদ্ধারের দাবি

0
59

নড়াইল কণ্ঠ : নড়াইলের লোহাগড়া পৌর এলাকার রামপুর গ্রামে ঐতিহ্যবাহী ও ইসলামী নিদর্শন হিসেবে প্রায় চারশো বছর ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ ফয়জুল্লাহ দেওয়ান ওরফে পজু দেওয়ানের মাজার। মাজার সংলগ্ন মসজিদটি অযতœ আর অবহেলায় ধ্বংস হতে বসেছে। দীর্ঘদিনেও মসজিদটির মেরামত বা সংস্কার না হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। আধ্যাত্মিক সাধক পজু দেওয়ানকে ঘিরে এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঘটনা। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের ২ তারিখে এখানে বার্ষিক ওরস মাহফিল পালিত হয়ে আসছে।
জানা গেছে, আজ থেকে প্রায় চারশো বছর পূর্বে জীবীকার উদ্দেশ্যে এক বিধবা মা কিশোর বয়সী ছেলে পজু দেওয়ানকে সাথে নিয়ে লোহাগড়া পৌর শহরের রামপুর গ্রামে আসেন। পজু দেওয়ানের মা কচুবাড়িয়া গ্রামের ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি সীতারাম দত্তের বাড়িতে কাজের জন্য কিশোর ছেলে পজুকে রেখে দেন। জনশ্রুতি রয়েছে, কিশোর পজু দেওয়ান সীতারাম দত্তের বাড়ির গরু মাঠে চরাতেন। একদিন সীতারাম দত্ত মাঠে গিয়ে দেখেন গরু গুলো মাঠে ঘাস খাচ্ছে, আর পজু দেওয়ান মাঠের আইলের পাশে ঘুমিয়ে রয়েছে। এ সময় তাকে বিষধর দুটি সাপ ফনা তুলে তাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে। এ অলৌকিক ঘটনা দেখার পর সীতারাম আর কখনও পজুকে দিয়ে মাঠে গরু চরাতে দেননি। এর কিছুদিন পর সীতারাম কিশোর পজু ও তার মায়ের ভরণ পোষনের দায়িত্ব নেন এবং মা-ছেলের বসবাসের জন্য রামপুর মৌজায় একখন্ড জমি দান করেন। কিশোর পজু যৌবনে পদার্পনের পর তার মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় পজু নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ক্রমে ক্রমে পজু ইসলামী ধ্যান ধারনায় দীক্ষিত হন এবং আধ্যাত্মিকতা লাভ করেন। কথিত রয়েছে, পজু দেওয়ানের বাক্য শুদ্ধ ছিলো। তিনি অসুস্থ্য, অসহায় মানুষজনদের সাহায্য করতেন।
আরো জানা যাায়, পজু দেওয়ান রামপুর এলাকায় যেখানে বসবাস করতেন, সেখানে ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। তা ছাড়া, বিভিন্ন জীবজন্তু তার অনুগত ছিল। তিনি গভীর রাতে বাঘের পিঠে চড়ে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াতেন। তিনি যে এলাকা দিয়ে বিচরণ করতেন, সেই এলাকা গুলো পজু দেওয়ানের ‘জাঙ্গাল’ বলে পরিচিত লাভ করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই জাঙ্গালই সরকারি রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কথিত আছে, তিনি কুমিরের পিঠে চড়ে নবগঙ্গা নদী পার হতেন।
শাহ্ ফয়জুল্লাহ দেওয়ান মুসল্লীদের নামাজ আদায়ের জন্য ১টি গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি কত সালে বা কোন শাসনামলে নির্মিত হয়েছে এর সঠিক কোন ইতিহাস পাওয়া যায়নি বা কেউ বলতে পারেন না। তবে স্থানীয় প্রবীণদের ধারনা, এ মসজিদটি কমপক্ষে চারশত বছর আগে নির্মিত এবং এ মসজিদটি এ জেলার প্রথম মসজিদ। মসজিদটিতে ইমামসহ ৯জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারতেন বলেও জানা গেছে। চুন-সুড়কির গাঁথুনীর মাধ্যমে এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি নির্মাণ এক অপূর্ব নিদর্শন। মসজিদটির ওপরের চার পাশের ছোট চারটি গম্বুজ ভেঙ্গে গেলেও মুল বড় গম্বুজ অক্ষত রয়েছে। মসজিদটির কেবলা খুবই ছোট। বাইরে থেকে মেহরাব বোঝা যায় না। মসজিদটির দক্ষিন পার্শ্বে রয়েছে একটি ছোট পুকুর। মসজিদটি কয়েকশত বছর আগে নির্মিত হলেও প্লাষ্টার আর রংহীন ছাড়া ভবনের কোন ক্ষতি হয়নি। বিগত ২০০২ সালে তৎকালীন নড়াইল-২ আসনের এমপি মুফতি শহিদুল ইসলাম উদ্যোগী হয়ে গম্বুজকে অক্ষত রেখে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করেন। পজু দেওয়ান নড়াইল-লোহাগড়া সড়কের রামপুর নামক স্থানে এক রাতে বিশাল দীঘি খনন করেন এবং দীঘির পশ্চিম পাড়ে একটি এবাদতখানা নির্মাণ করেন। সেই দীঘি ও মাজারটি আজও স্ব-মহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাজারকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালে এখানে গড়ে উঠেছে দেওয়ান শাহ্ ফয়জুল্লাহ এতিমখানা লিল্লাহ্ বোডিং মাদ্রাসা। বর্তমান এখানে শতাধিক এতিম, অসহায় ও হতদরিদ্র শিশু-কিশোররা লেখাপড়া করছে।
পজু দেওয়ান তার মায়ের নামাজ আদায়ের জন্য নির্মাণ করেছিলেন মা বরকতের মসজিদ। তবে কবে, কখন এ মসজিদটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন তার ইতিহাস সঠিক ভাবে কেউ বলতে পারেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটিতে মহিলা মুসল্লীরা নামাজ আদায় করতে পারেন। পুরানো আমলের ইট-সুড়কি ও চুন দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। বহু বছর রংহীন ও সংস্কার না হওয়ায় মসজিদটি রংচটা, নোংরা, ময়লা, গাছপালায় ঢেকে একাকার হয়ে রয়েছে। মহিলাদের নামাজ আদায়ের জন্য নড়াইল জেলার মধ্যে এটাই একমাত্র মসজিদ। এ জেলায় আর কোথাও মহিলাদের নামাজ আদায়ের কোন মসজিদ নেই। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তবৃন্দ মুরগী, ছাগল, সিন্নি ও তবারক নিয়ে মনবাসনা পূরণের আশায় মাজারে আসেন। পজু দেওয়ান ও তার মায়ের মৃত্যূর পর দুজনকে মসজিদের দক্ষিণ পাশে শায়িত করা হয়। প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষনের জন্য প্রতœতত্ত্ব বিভাগের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লীরা। এ সব বিষয়ে কথা হয় দেওয়ান শাহ্ ফয়জুল্লাহ এতিমখানা লিল্লাহ্ বোডিং মাদ্রাসার সুপার ও খতিব হাফেজ মাওলানা শরীফ আরিফুজ্জামান হিলালীর সাথে। তিনি আলাপকালে বলেন, অত্র অঞ্চলে শাহ্ ফয়জুল্লাহ দেওয়ান ওরফে পজু একজন আধ্যাত্মিক সাধক ও বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর মাজারে মানত করলে ভক্তের মনবাসনা পূরণ হয়। তাঁর আনুমানিক তের একর ৭২ শতাংশ জমির মধ্যে অধিকাংশ জমি প্রভাবশালীরা নামে-বেনামে দখল করে নিয়েছে। তিনি পজু দেওয়ানের রেখে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধারসহ মসজিদটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here