দুদক দুর্নীতির ৮৯ উৎস বন্ধে ১০৭ সুপারিশ করলো

0
70

নড়াইল কণ্ঠ : সরকারি সাত সেবাদানকারী দপ্তরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতির ৮৯টি উৎস চিহ্নিত করেছে। এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে, ভূমি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য, আয়কর, হিসাবরক্ষণ, বিমান ও সিভিল এভিয়েশনখাতের অসঙ্গতি উল্লেখযোগ্য। একইসাথে দুদক দুর্নীতি রোধে ১০৭টি সুপারিশও করেছে।
দুদক বলছে, এসব দপ্তরের সেবা সমূহের পদ্ধতিতে ফাঁক-ফোকর থাকায় দুর্নীতি বাড়ছে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি রোধে দুদকের করা সুপারিশগুলো সরকারের আমলে নিয়ে কাজ করা উচিত। তাহলে অনেকাংশে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে।
২০১৮ সালে দুদকের বার্ষিক রিপোর্টে ভূমি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য, আয়কর, হিসাবরক্ষণ, বিমান ও সিভিল এভিয়েশনখাতের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ভূমিতে দুর্নীতি উৎস রয়েছে ৮টি, সুপারিশ রয়েছে ১০টি, পাসপোর্টে দুর্নীতির উৎস রয়েছে ৫টি সুপারিশ রয়েছে সাতটি, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির উৎস রয়েছে ১১টি, সুপারিশ রয়েছে ২৭টি, আয়করখাতে দুর্নীতির উৎস রয়েছে ১৩টি আর সুপারিশ রয়েছে ২৩টি, হিসাবরক্ষণে দুর্নীতির উৎস রয়েছে ৩৩টি আর সুপারিশ রয়েছে ২১টি, বিমানে দুর্নীতির উৎস রয়েছে ৮টি আর সুপারিশ রয়েছে ৮টি, সিভিল এভিয়েশনে দুর্নীতির ১১টি উৎস ও রোধে ১১টি সুপারিশ করেছে দুদক।
ভূমিতে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক ৮টি উৎস চিহ্নিত করেছে সেগুলো হচ্ছে, ভূমি রেজিস্ট্রি, নামজারি, ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি কর, ভূমি রেকর্ড, খাস জমি, পরিত্যক্ত ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি হয়ে থাকে এবং ১০টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সুপারিশ হচ্ছে, খাস, পরিত্যাক্ত জমি, হাট-বাজারসহ সরকারি সকল সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা। একই সঙ্গে এ সকল সম্পত্তিতে সরকারি বিল বোর্ড বসানো।
পাসপোর্টে দুর্নীতি প্রতিরোধে ৫টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে উৎসগুলোর মধ্যে দালালদের দৌরাত্ম্য, যাচাই-কার্যক্রমে পুলিশের ঘুষ নেওয়া, জনশক্তির স্বল্পতা এবং ৭টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গেজেটেড কর্মকর্তা কর্তৃক আবেদনপত্র এবং ছবি সত্যায়ন করার প্রক্রিয়া বিলুপ্ত করা এবং পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়া।
স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে ১১টি উৎস চিহ্নিত করেছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা, কেনা পণ্যের দাম বেশি দেখানো, নিম্নমানের কোম্পানির মালামাল কেনা, ঔষধ কেনা ও সরবরাহ, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অনৈতিক ব্যবসা করার সুযোগ সৃষ্টি করা। আর দুর্নীতি রোধে ২৭টি সুপারিশ করেছে দুদক। যার মধ্যে অন্যতম সুপারিশ হচ্ছে, দালালরা যাতে অন্য হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নিতে না পারে সেটি তদারকি করা। এ জন্য একটি মনিটরিং টিম গঠন করার তাগিদ দিয়েছে দুদক। এছাড়া, স্বাস্থ্যখাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও দুদকের সুপারিশে বলা হয়েছে।
আয়করখাতের দুর্নীতি বন্ধে ১৩টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে, নথি নিষ্পত্তি নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া, বদলি বা পদায়নে অসৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার শিথিলতা, আয়কর মেলার নামে বিলাসবহুল প্রচারণার মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ে অস্বচ্ছতা। একই সাথে দুর্নীতি রোধে ২৩টি সুপারিশ করেছে দুদক। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হচ্ছে, আদালতের মামলা জট কমাতে এনবিআরের এডিআর পদ্ধতি শক্তিশালী করা।
হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে দুর্নীতি বন্ধে ৩৩টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে, কর্মকর্তাদের সার্ভিস বুক ভেরিফিকেশনের নামে অনিয়মিতভাবে অর্থ আদায়, কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ তহবিল হিসাব খোলার সময় অর্থ আদায়, ভূয়া ভ্রমণভাতা বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ। এছাড়া, দুর্নীতি বন্ধে ২১টি সুপারিশ করা হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, অভিযোগ দায়ের ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সহজ করা, পেনশন সহজীকরণ, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় অফিসগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা।
বিমানে দুর্নীতি বন্ধে ৮টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক। কয়েকটি হচ্ছে, বিমান কেনা ও লিজখাতে দুর্নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো সার্ভিস, যাত্রী সেবা, অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ, টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রে দুর্নীতি ইত্যাদি। এছাড়া, দুর্নীতি বন্ধে ৮টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সুপারিশ হচ্ছে, বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দুর্নীতির পরিমাণ নির্ধারণ করা।
সিভিল এভিয়েশনে ১১টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে, ক্রয়খাত, নির্মাণ ও উন্নয়নমূলকখাত,সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরে স্পেস ও বিলবোর্ড ভাড়ায় দুর্নীতি,কলসালটেন্ড নিয়োগ,বিদেশ প্রশিক্ষণে দুর্নীতিসহ প্রভৃতি। এছাড়া ১১টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হচ্ছে, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ও এয়ার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতির ক্ষেত্র সমূহ চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুদকের সুপারিশমালার বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি দুদকের সুপারিশকে স্বাগত জানাই। সরকারের উচিত সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে কাজ শুরু করা। দুর্নীতি একটি দেশকে ভঙ্গুর করে দেয়। কাজেই দুর্নীতি বন্ধে দুদককে আরও যেমন শক্ত হতে হবে একই সাথে সরকারকেও সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, ‘দুর্নীতি একটি ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতি রোধে দুদক যে সুপারিশগুলো করেছে সেগুলো সরকারের আমলে নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা উচিত। তাহলে দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও অনেকাংশে কমে আসবে। আমরা আশা করি সরকার দুদকের সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে অতি দ্রুতই কাজ শুরু করবে।’
দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের সুপারিশের বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে যে সুপারিশগুলো করেছি সেগুলোতে সাধারণ মানুষ বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। আর দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সবাইকে দুর্নীতি রোধে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় গলদ আছে। আমরা সেগুলো সংষ্কারের জন্য বলছি।’ তবে সবাই সচেতন হলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনিও মনে করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here