নড়াইলে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

0
23
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

নড়াইল কণ্ঠ : ক্লাসে ভর্তিতে নিয়ম বহির্ভূত টাকা নিয়ে ভর্তি বাণিজ্য, উপবৃত্তির টাকা উত্তোলনে অর্থ আদায়, শিক্ষার্থীদের জেএসসি, এসসি সার্টিফিকেট গ্রহণে টাকা নেয়াসহ যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির উৎস নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বাবরা-হাসলা ইউনিয়নের একমাত্র হাইস্কুল ‘দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে’। এ সকল অনিময়ম ও দুর্নীতির ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা এ স্কুলে।
জানাগেছে, বর্তমানে এস্কুলে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণিতে ৪’শ ৯২ জন ছাত্র/ছাত্রী রয়েছে। এই স্কুলে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী-অভিভাবক আর ব্যবস্থাপনা কমিটি এ নিয়ে ভোগান্তিতে থাকলেও প্রধান শিক্ষকের ভয়ে কিছুই বলতে পারেন না।
আরো জানাগেছে, এই স্কুলে ছাত্রদের ভর্তির সময় ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করা হয়। কোন শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের নির্ধারিত ভর্তি ফি দিতে না পারলে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। বাইরের কোন স্কুল থেকে নতুন কেউ ভর্তি হতে এলে নেয়া হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। শুধু তাই নয় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেয়া হয় ৫-৬’শ টাকার বিনিময়ে। জেএসসি ও এসএসসি সনদ গ্রহণে নেয়া হয় ৫’শ টাকা করে। টাকা ছাড়া কোন কাজই করেন না এ প্রধান শিক্ষক। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে নানা জায়গায় আবেদন করেও কোন ফল পাননি এলাকার লোকেরা।

উল্লেখ্য, নদীভাঙ্গন এলাকার একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হবার পরে ভালোভাবেই চলছিলো। ২০১৪ সালের ৮ জুন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তুষার কান্তি ঘোষ যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আর্থিক নির্যাতন। সেই থেকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিতে মগ্ন এই প্রধান শিক্ষক।
অভিযোগে জানা যায়, বছরের বিভিন্ন সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির কার্ড তৈরী করা কথা বলে প্রধান শিক্ষক কয়েকজন ছাত্রের কাছ থেকে ৬’শ টাকা করে নিয়ে তাদের উপবৃত্তির টাকা পাইয়ে দিয়েছেন। গত বছর অন্তত: ২০ শিক্ষার্থীকে অর্থ নিয়ে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেন এই শিক্ষক।
স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী শিল্পী বিশ্বাস, সুখী বিশ্বাস, চুমকি সিকদার অভিযোগে বলেন, ৯ম শ্রেণির মাঝামিাঝি সময়ে হেডস্যার আমাদের উপবৃত্তির কথা বলে ৬’শ টাকা করে নিয়েছেন। একই সময়ে ৩’শ টাকা দেয়ায় উপবৃত্তি হয়নি রিপা খানমের।
৭ম শ্রেনির ছাত্রী ফারজানা, তমা, রাবেয়া জানান, ৬ষ্ট শ্রেণিতে থাকাকালীন তাদের কাছ থেকে উপবৃত্তির ফরম পূরন করা হলেও তাদের উপবৃত্তি দেয়া হয়নি। একই ক্লাসের ফার্স্ট বয় সাজ্জাদুল ইসলাম জানায়, স্যারেরা বলেন, মেধাভিক্তিক নাকি উপবৃত্তি দেয়া হয়। আমাকে আজও উপবৃত্তি দেয়া হয়নি।
হাচলা গ্রামের কৃষক কুতুবদ্দিন জানান, আমার মেয়ে ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। উপবৃত্তির জন্য হেডস্যার ৬’শ টাকা চেয়েছেন, আমি ৩’শ টাকা দিয়েছিলাম; কিন্তু হেডস্যার আমার মেয়েকে উপবৃত্তিও দেয়নি আমার টাকাও ফেরত দেয়নি।
সুক্তগ্রামের বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, আমার দু’টি মেয়ে এই স্কুলে সেভেনে আর এইটে পড়ে। হেডস্যার বলেছে ভর্তির জন্য প্রত্যেকের সাড়ে ৮’শ করে টাকা লাগবে। আমি একজনের ভর্তি ফি দিয়ে বাকিজনের টাকা পরে দিতে চাইলাম, কিন্তু হেডস্যার আমার আরেকটি মেয়েকে বের করে দিলো।
এদিকে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিক বেসরকারি স্কুল গুলোর উপজেলা পর্যায়ে সেসন চার্জসহ বেতন সাকুল্যে ৫’শ টাকা নেবার কথা। কিন্তু দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট এবং ৭মশ্রেণির ভর্তিতে ৮’শ ৫০, ৮ম শ্রেনীর ৯’শ ৬০ এবং ৯ম ও দশম শ্রেনিতে ভর্তির জন্য নেয়া হয় ১হাজার টাকা। যদিও নানা অযুহাতে ভর্তি ফি’র বাইরেও মাত্রাতিরিক্ত হারে নেয়া হয়। দশম শেণির ছাত্রী বন্যা জানায়, ৯ম শ্রেণিতে আমার গ্যাপ যাওয়ায় হেডস্যার আমার কাছ থেকে নিয়েছেন ৩ হাজার টাকা; কিন্তু রশিদে লেখা হয়েছে ৮’শ ৫০ টাকা। এখানেই শেষ নয় অন্য স্কুল থেকে এই স্কুলে ভর্তি হতে এলে তাদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত টাকা নিয়ে থাকেন প্রধান শিক্ষক।
স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত নানা শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্কুলে নতুন বই প্রদানে জনপ্রতি ১০-১৫ টাকা, এস এসসি ও জে এস সি পরীক্ষার্থীদের নিকট থেকে ২’শ থেকে ৩’শ টাকা এমনকি জেএসসি ও এসএসসি পরিক্ষার্থীদের সনদ প্রদানে ২’শ টাকা করে গ্রহণ করা হয়। আর এসব প্রধান শিক্ষক নিজেই করেন।
৪ বছর আগে এসএসসি পাশ করা প্রাক্তন ছাত্র কাইয়ুম মোড়ল জানায়, আমি গতবছর আমার জেএসসি এবং এসএসসি সার্টিফিকেট তোলার জন্য গেলে প্রধান শিক্ষক আমার কাছে দুটো সার্টিফিকেট এর জন্য একহাজার টাকা দাবী করেন। আমি দু’শ টাকা দিলেও আমাকে সার্টিফিকেট দেননি। প্রবীণ শেখ মতিয়ার রহমান জানান, আমার নাতি এই স্কুলে পড়ে। ২০১৮ সালে তার এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিতে ৫’শ টাকা দিতে হয়েছে আমাকে।
এখানেই শেষ নয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ এর ভাই পিযুষ কান্তি ঘোষ একই স্কুলের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) পদে নিয়োগ পেয়ে এমপিও বন্ধ হওয়ায় ২০১৩ সাল থেকে স্কুলে অনুপস্থিত। পরবর্তীতে পুনরায় এমপিও চালু হলে গত ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসের বেতন উত্তোলন হয়েছে ৫ বছর অনুপস্থিত এর শিক্ষকের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিযুষ কান্তি ঘোষ ২০১৪ সালের আগে থেকেই ঢাকার “বেঙ্গল সোসাইটি” নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইনভেস্টমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
স্কুলের সহকারি শিক্ষক মাওলানা নাসির উদ্দীন জানান, আমি ২০১৪ সালে এই স্কুলে যোগদান করি। এ সময় থেকে এই স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষক পিযুষ কান্তিকে কখনো দেখিনি, আমি তাকে চিনিও না; কিন্তু আমাদের বেতনের খাতায় তার নাম দেখি।
নিজের কাছে গোপন রশিদ তৈরী করে তার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে স্কুলের নামে আসা নানা ধরনের তহবিল থেকে ৬ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা আতœসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত অভ্যন্তরিন নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে। আর নিজে রেজুলেশন খাতায় এসব লিখে দায় মিটিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম আর দুর্নীতি প্রসঙ্গে পরিচালনা কমিটির সদস্য শাহজাহান শেখ বলেন, গত চার বছরে এই স্কুলে যে সব ধরনের আর্থিক দুর্নীতি হয়ে আসছে। এই স্কুলে লেখাপড়ার কোন মানই নেই, দিন দিন ছাত্র-ছাত্রী কমে যাচ্ছে। এই হেড মাষ্টার টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না।
সকল অনিয়মের কথা জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সকল কাজ করা হয়েছে। যে সকল টাকা ছাত্রদের কাছ থেকে নেয়া হয় তা রশিদে লিখে দেয়া হয়। স্কুলে ভর্তি ফি ৫’শ টাকা নির্ধারিত হলেও প্রধান শিক্ষক অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেন।
স্কুলে ৫ বছর অনুপস্থিত শিক্ষক পিযুষ কান্তির নামে বেতন তোলার ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক জানান, টাকা তোলা হয়েছিল, কিন্তু সেটা গত ৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকে করেছি।
এদিকে অনুপস্থিত থেকে বেতন উত্তোলনকারী ঢাকার “বেঙ্গল সোসাইটি”র ইনভেস্টমেন্ট অফিসার পিযুষ কান্তি ঘোষ এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমার একাউন্টে টাকা আসতে পারে তবে তা উত্তোলন কিম্বা ফেরত দেয়া হয়নি।
জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মর্তারা নিয়মিতই স্কুল পরিদর্শন করেন। সর্বশেষ ২১ জানুয়ারী পরিদর্শন করেন সহকারি পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন। যদিও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম সায়েদুর রহমানের এ স্কুলের কোন অনিয়মের কথাই জানা নেই। তবে তিনি বলেন, আমি ইতিমধ্যে খোঁজখবর নিয়েছি, অনিয়ম ধরা পড়লে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে, আর আর্থিক অনিয়ম বেশী হলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবহিত করবো।
সম্প্রতি ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান শিক্ষকের এসব কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভে স্কুল পরিচালনা কমিটির অধিকাংশ সদস্য, অভিভাবক, প্রাক্তন ছাত্র সহ এলাকার প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ অংশ নেয়। মানববন্ধন এ বাধা দিতে স্কুল সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের ব্যবস্থা করেন প্রধান শিক্ষক। মানববন্ধন এ পরিচালনা কমিটির সদস্য ওহিদুল মোল্যাসহ অন্যরা আগামি দ্রুত দুর্নীতিবাজ প্রধান শিক্ষকে অপসারনের দাবী জানান তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here