আদিখ্যেতা দেখাবেন না, প্রকল্পে খরচ কমানোর পরিকল্পনা করুন – প্রধানমন্ত্রী

142

নড়াইল কণ্ঠ : প্রধানমন্ত্রীর এলাকায় কোনো কাজে ‘বেশি বেশি’ করার আদিখ্যেতা না দেখাতে প্রকৌশলীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
“এই আদিখ্যেতাটা ভালো না যে প্রধানমন্ত্রীর জায়গা বলে বেশি করে ঢেলে দাও,” ‘বেশি খরচে অপ্রয়োজনীয় কাজ করা হচ্ছে। কম খরচে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করুন। খরচ বাড়ানোর পরিকল্পনা না করে কমানোর পরিকল্পনা করতে হবে। শনিবার আইইবি ৫৬তম সম্মেলনে প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “এক সময় কিছুই পেতাম না। সারাজীবন বঞ্চিত ছিলাম। আর এখন পাওয়ার ধাক্কা সামাল দিতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি সবাইকে মানা করছি। আপনাদের এত লাগবে না, যেটুকু লাগবে, সেটুকু করতে হবে।”

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) ৫৬তম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিজের জেলা গোপালগঞ্জের কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে একথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর এলাকায় যা কিছু করতে হবে একটু বেশি বেশি করতে হবে-এই চিন্তাটা পরিহার করতে হবে।

“বেশি বেশি করতে গিয়ে সবকিছু নষ্ট করে দেবেন না দয়া করে। আমার এলাকার পরিবেশটা যেন নষ্ট না হয়।”

গোপালগঞ্জের জলাভূমিতে স্লুইট গেইট নির্মাণে পরিকল্পনাহীনতার ‘তিক্ত অভিজ্ঞতার’ বিষয়টি উঠে আসে শেখ হাসিনার কথায়।

“আমার এলাকা, বিল, হাওর-বাঁওড় এলাকা। সেখানে একটা বিল বা খালের পাড়ে বাঁধ কত ফুট উঁচু লাগে? চার, পাঁচ ফুট বা তিন ফুট উঁচু হলেই তো যথেষ্ট। সেখানে তো সাত ফিট, আট ফিট বা চৌদ্দ ফিট উঁচু বাঁধের কোনো প্রয়োজন হয় না। অহেতুক এই খরচ কেন?”
নিজের শৈশব স্মৃতি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “যে খালটা যুগ যুগ ধরে আমি দেখছি, জোয়ার-ভাটা হয়। সেই খালের দুই মাথায় স্লুইচ গেইট লাগানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ওই খাল তো কখনও কোনো ক্ষতি করে না।

“হঠাৎ দেখলাম সেখানে বিরাট প্রকল্প নেওয়া হল। এই ধরনের পরিকল্পনা কেন নেওয়া হবে? এই ধরনের পরিকল্পনা পরিহার করতে হবে।”

সারাদেশে এ পর্যন্ত কতগুলো স্লুইস গেইট ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং তার ফলাফলটা কী- সে মূল্যায়ন করতে প্রকৌশলীদের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
“ওই বেড়িবাঁধ দিয়ে কতটুকু আমি ধান উঠাচ্ছি আর বিনিময়ে ওটার মেরামতে প্রতিবছর কত খরচ হচ্ছে এবং ওইটার কারণে অন্য জায়গার জলাবদ্ধতা, জমি নষ্ট এবং নদী ভাঙন সৃষ্টি (হচ্ছে)।”

এভাবে প্রকল্প নেওয়ার সময় অর্থ অপচয় বন্ধ করে সেবার মান বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেন সরকার প্রধান। প্রত্যেক উপজেলার উন্নয়নে একটা মহাপরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) করার ও উপরও জোর দেন তিনি।

সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রকৌশলে অবদান রাখার জন্য দুজন প্রকৌশলীকে ‘আইবি-২০১৫ স্বর্ণপদক’ দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে আইবির নতুন ১৫ তলা ভবনও উদ্বোধন করেন তিনি।

অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশেও জোর
অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানোর সময় পরিবেশের ক্ষতি যেন না হয়, সে দিকে নজর রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ইতোমধ্যে ১৬টা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে গিয়ে মানুষকে ‘বেশি’ না সরানো এবং পরিবেশ রক্ষার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

শিল্প স্থাপন বা আবাসন করতে গিয়ে প্রতিটি এলাকাই যেন জলাধার থাকে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। “যত্রতত্র যে কেউ যেখানে সেখানে একটা জমি কিনেই ইন্ডাস্ট্রি করবে, সেটা করতে পারবে না।”

পরিকল্পনা করার সময় প্রতিটি শিল্প কারখানা বা হাসপাতালে বর্জ্য নিষ্কাশণ ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং হাঁটাচলা বা খেলাধুলার জন্য প্রতিটি এলাকায় খোলা জায়গা রাখতেও বলেন তিনি।
প্রকৌশলীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোলার প্যানেল এমনভাবে বসাতে হবে যাতে তার নিচে কৃষিকাজ চালানো যায়।

যে কোনো প্রকল্প ‘আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশম্মত’ভাবে বাস্তবায়নের উপরও গুরুত্ব দেন শেখ হাসিনা।

“আমি চাচ্ছি আমাদের উন্নয়নের কাজটা খুব প্ল্যানওয়েতে হওয়া উচিৎ। বিদ্যুৎ, রাস্তা, পয়ঃনিষ্কাশণ সবকিছু এমন পরিকল্পিতভাবে করা উচিৎ জমি যেন নষ্ট না হয়, আর অল্প খরচে যেন করা যায়।”

“শুধু খরচ বাড়াবার জন্য পরিকল্পনা যেন না হয়। সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিতভাবে অধিক সেবা মানুষকে দিতে পারব সেভাবেই পরিকল্পনা করবেন-এটাই আপনাদের কাছে আমার দাবি থাকল।”

চলতি অর্থবছরে সরকারের নির্ধারণ করা সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় শুরু করেছি। প্রায় ১২শ মেগাওয়াট আমরা ওখান থেকে আনার ব্যবস্থা করেছি। ট্রান্সবর্ডার পাওয়ার সাপ্লাইয়ে আমরা নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।”

ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল কেনার কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
“যেটা আসাম রিফাইনারি থেকে সোজা পার্বতীপুর পর্যন্ত চলে আসবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি তৈরি করা হয়ে গেছে। পাইপলাইন হবে।”

বাংলাদেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারত-নেপাল-ভুটান এবং মিয়ানমার-চায়না-ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক জোট গড়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।