নড়াইলে হেভিওয়েট প্রার্থী যুবদের আইকন মাশরাফি

0
22
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল: সাম্প্রতিককালে ক্রিড়াঙ্গনে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। গত কয়েকবছর ধরে দেশের তরুণ-যুব সমাজের আইকন হিসেবে পরিচিত মাশরাফি এখন রাজনীতিতে ভোটের মাঠে। মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের হয়ে নৌকা প্রতীকে। মাশরাফি নির্বাচনে আসছেন এমন গুঞ্জন চলছিল গত ৬ মাস ধরে। মাশরাফি ভক্তদের মাঝে তার রাজনীতিতে আসা নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও অবশেষে গুঞ্জন সত্যি করে মাশরাফি ভোটে মাঠে নামছেন।
নড়াইলের তরুণদের এই ব্যাপারে আগ্রহের শেষ নাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মাঠের আলাপে এখন শুধুই মাশরাফি। ফেসবুক খুললেই দেশ ও দেশের বাইরে থাকা ম্যাশ ভক্তরা লাইভে মাশরাফির নানা প্রসংসা তুলে ধরে তাকে একচেটিয়া নির্বাচনের জন্য আহবান জানাচ্ছেন। মাঠে যেমন তিনি বাঘের মতো হুংকার দিয়ে দলকে জিতিয়ে আনেন তেমনি এলাকা ছেলে-বুড়ো সবাই যে যার মতো নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। এলাকার মাশরাফি ভক্তরা যে যার মতো নির্বাচনী প্রচার ও উঠান বৈঠক করে যাচ্ছেন। কারো কোন নির্দেশনা দরকার হচ্ছে না। আওয়ামীলীগের প্রার্থী হলেও এলাকার মাশরাফিভক্ত বিএনপি সমর্থক, নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাশরাফিকে নিয়ে তার সফলতা আর চিন্তা চেতনা নিয়ে লেখালেখি করছেন। প্রকাশ্যে কাজ করছেন শত শত ভিন্ন ভিন্ন দলের নেতাকর্র্মীরা। তাদের কাছে সাফ কথা মাশরাফির সাথে কারো তুলনা চলবে না।
নাম প্রকাশ না করে ছাত্রদলের একজন জেলা পর্যায়ের নেতার বক্তব্যে বলেন, নড়াইলে এ যাবত কালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থী হচ্ছেন আমাদের কৌশিক (মাশরাফির ডাক নাম)। আমরা প্রায়ই মানুষকে বলতে শুনি সৎ, যোগ্য দেশপ্রেমিক লোককে নির্বাচিত করবো। মাশরাফির মতো সবগুণ সম্পূর্ণ আর একজনও প্রার্থী বাংলাদেশেই আর নাই।
অনেকে প্রতীক নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মাশরাফিভক্তদের একটাই কথা মার্কার চেয়ে ব্যক্তি বড় হবে, মাশরাফি নড়াইলে এমপি হলে জেলার উন্নয়ন হবে, আত্মমানবতার ভালো হবে। তিনি মন্ত্রীও হতে পারেন। এ সুযোগ ছাড়তে চান না নড়াইলের সব রাজনীতির মানুষ। তাদের দাবী স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নড়াইলে একজন প্রতিমন্ত্রীও আমরা পেলাম না, তাইতো আওয়ামীলীগের ঘাটি হওয়া সত্ত্বেও গত ১০ বছরে আমাদের জেলার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। পাশের জেলা গোপালগঞ্জের উন্নয়নের পাশে আমাদের ছিটেফোটাও লাগেনে। মাশরাফি আসলে আমাদের সেই আক্ষেপ দুর হবে।
বন্ধুপ্রাণ মাশরাফি সবসময়ই বন্ধুদের জন্য কিছু না কিছু করার চেষ্টা করেন। বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে এলাকার মানুষের জন্য সব সময়ই সহয়োগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এলাকার মানুষের সেবা আর অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়ে নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের প্রায় সব টাকাই শেষ করেছেন তিনি। বাল্যকালের বন্ধু রবিদাসের বোনের বিয়ে সেখানে তাকে নির্দিধায় দিয়ে দিলেন দুই লক্ষ টাকা, বন্ধু সুমন দাস, অসীমের চাকুরী কিম্বা রাজুর জন্য গার্মেন্ট ব্যবসা সবই তিনি করেছেন অবলীলায়। নড়াইলে রিক্সা চালায় রব্বানী তার বাড়ি সাতক্ষীরায় কিন্তু তাতে কি? তার মাথার টিউমার চিকিৎসার জন্য ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে ভারতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন মাশরাফি।
মাশরাফির বন্ধু পায়েল চৌধুরী জানান, বন্ধুদের যখন যা লাগবে তাই দিয়েছে, এরকম কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছেন অন্যের সহায়তায়। রাজনীতি না করেও মাশরাফির এই মহানুভবতার পরিচয় নড়াইল ছেড়ে বাইরে চলে গেছে। এখন প্রতিনিয়ত মাগুরা, যশোর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা থেকে সাহায্যের জন্য অসহায় লোকেরা মাশরাফির কাছে ছুটে আসে।
এলাকার নাম না জানা অন্তত: ১০ জন মেধাবী ছেলে-মেয়ে মাশরাফির টাকায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিম্বা প্রকৌশলী বিভাগে লেখাপড়া করছে। কখনও তাদের নাম উল্লেখ করেন না তিনি। আর এগুলো কোথাও প্রচার হোক এটাও চাননা, সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রেখে মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন যুবক দেশপ্রেমিক।
সমাজ পরিবর্তনে সকলের সহযোগিতা নিয়ে আরো ভালভাবে কাজ করা জন্য ২০১৭ সালে উদ্যোগ নেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’ গড়ার। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রান ফর নড়াইল এর মাধ্যমে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। “নড়াইল হবে প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ বাসস্থান”এই শ্লোগান নিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আইটি, কৃষি সহ মোট ১১ টি ক্ষেত্রে কাজ করতে যাত্রা শুরু করে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন।
২০১৭ বিপিএল এ রংপুর রাইডার্স চ্যাম্পিয়ন হবার পরে তাদের দেয়া অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে নড়াইল এক্সপ্রেস এর কর্মকান্ড শুরু হয়। কথিত আছে রংপুর রাইডার্স এর উপহার হিসেবে কোটি টাকার গাড়ি প্রত্যাখ্যান করে অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছেন তিনি। এরপর নিজে ব্যন্ড আ্যাম্বসাডার হবার সুবাদে প্রান ডিংকিং ওয়াটার এর কাছ থেকে পানির বিক্রিলব্ধ অর্থের একটি অংশ নড়াই এক্সপ্রেস এর জন্য বরাদ্দ করা হয়। দরিদ্র মানুষের সেবার জন্য ২০১৮ সালের মার্চ মাসে আয়োজন করা হয় “কনসার্ট ফর দ্যা হেল্পলেস” এখানের আয় করা সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা আসহায় মানুষের তালিকা করে প্রদান করার হয়েছে। এখানেই শেষ নয় যেখানেই মাশরাফির কদর সেখান থেকেই আদায় করেছেন নড়াইলের মানুষের জন্য সুবিধা। আইপিডিসি’র কাছ থেকে নড়াইলের খেলোয়াড়দের একটি জীম, আর ৩ বছরে ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবলের প্রশিক্ষণের জন্য বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় বাছাই করে ক্রীড়াঙ্গনকে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। অতীশ দিপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নড়াইলের ২০ জন ছাত্রকে বিনামূল্যে পড়ানোর চুক্তি করেছেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা প্যাথলজি প্রতিষ্ঠান থাইরোকেয়ার এর সাথে চুক্তি করে নড়াইলে তার শাখা খুলেছেন। ঢাকার প্রেশক্রিপশন পয়েন্টে নড়াইলের রোগীরা ৫০ ভাগ অর্থ দিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন সে ব্যবস্থা করেছেন। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন জেলায় ১’শ ৫০ টি রাস্তার পাশের ডাস্টবিন ৩টি শৌচাগার নির্মাণ করেছেন। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে নড়াইল পৌর এলাকা ও লোহাগড়া পৌর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক ধান গবেষনা সংস্থার (ইরি) সাথে চুক্তি করে বিনামূল্যে কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষকের মাঝে জিংক সমৃদ্ধ উন্নতমানের বীজধান বিতরণ করা হয়েছে। এসবই করেছেন নড়াইলের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করার জন্য নয়। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেনের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম অনিক জানান, ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাশরাফি তার ব্যক্তিগত সুবিধা না দেখে সব অর্জনই নড়াইলের উন্নয়নে কাজে লাগাচ্ছেন, তিনি রাজনীতিবীদ না হয়ে যা করছেন এটা আমাদের জন্য আরো ভালোভাবে করতে পারবেন মনে করেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এলাকার উন্নয়ন ছাড়া তিনি আর কিছুই ভাবেন না। তার সাথে কাজ করতে পেরে আমরা গর্বিত।
নড়াইল চৌরাস্তার প্রবীণ মুদি ব্যবসায়ী আব্দুর রব খান বলেন, যে যাই বলুক এবার আর কোন মার্কার নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হবে মাশরাফির। সে এ যাবতকাল বিনা রাজনীতিতে মানুষের যে সেবা করে চলেছে তাতে এ ধরনের মানুষের জন্য মার্কা চলে না। এলাকায় এতদিন যারা অন্য মার্কায় ভোট দিয়েছে তারা সবাই মাশরাফিকে ভোট দেবার জন্য পাগল হয়ে গেছে।
এদিকে মাশরাফি ভোটে দাড়িয়ে নড়াইলে হাজির না হলেও তার জন্য প্রচারে নেমেছে রাজনীতির বাইরের মানুষেরা। এলাকার বিভিন্ন বাঁধাই এর দোকানে মাশরাফির ছবি বাঁধাইয়ের ধুম পড়ে গেছে। শরহরে তুলি আর্ট এ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এখানে গড়ে প্রতিদিন ১০/১৫ টি মাশরাফির ছবি বাঁধাইয়ের অর্ডার আসছে।
নড়াইলের বাইরে ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনায় লেখাপড়া করছে এমন শিক্ষার্থীরা নড়াইলে এসে ভোট দেবার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ শেষ করে গুলশানে সিটি ব্যাংকে ইন্টার্নশীপ করছেন মহিষখোলা গ্রামের প্রাপ্তি, সে একজন নতুন ভোটার। সে জানায়, যেভাবেই হোক নড়াইলে ভোট দিতে আসবো, প্রথম ভোটটি একবারে প্রিয় একজনকে দিতে পারবো এর চেয়ে আনন্দের আর কি আছে?
ভিক্টোরিয়া কলেজে অনার্স পড়–য়া নতুন ভোটার শামান্তা শারমিন, লায়লা খানম, রাবেয়া বশরী, নয়ন অধিকারী। এদের প্রত্যেকের বক্তব্য আমরা এমন একজনকে ভোট দেবো যাকে আমরা অত্যন্ত ভালোবাসি। রাজনীতি না করেও এরকম একজন ভালোমানুষকে প্রথম ভোটটি দিতে পারবো এটা সৌভাগ্যের ব্যাপার সবার কপালে এটা জুটবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here