বাংলাদেশহতে পারে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু’

0
12
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

বিগত দশ বছরে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। আন্ত:দেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশ নিয়ে গঠিত বিমসটেকে বাংলাদেশের অবস্থান আজ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে ২০১৪ সালে বিমসটেকের সচিবালয় বাংলাদেশে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র আন্ত:দেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতির কারণে আগামীতে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতসহ, ভুটান, নেপাল ও আসিয়ানভুক্ত এবং পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো, যারা বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উপ-অঞ্চলে যোগাযোগ স্থাপন, নতুন বাজার সৃষ্টি, আমদানির বাজার বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবসার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। উপ-অঞ্চলে যোগাযোগ স্থাপন করতে বাংলাদেশ প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সড়ক, নৌ-পথ ও রেলপথে যোগাযোগ স্থাপন করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পূর্ণ যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। ভারত এরইমধ্যে বাংলাদেশকে সড়ক ও রেলপথের ট্রানজিট দিয়ে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে রাজি হয়েছে। এতে করে দেশটির উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমে আসবে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভুটান, নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশে যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে উপকৃত করবে। এরইমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথ ব্যবহার করে কলকাতা-আসাম রুটে পণ্য পরিবহন সুবিধা নিয়েছিল ভারত। ২০১৬ সালের জুন মাসে কলকাতা থেকে আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া পণ্যবাহী একটি জাহাজ বাংলাদেশের আশুগঞ্জ নৌপথ ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের আন্ত:দেশীয় নদীপথ ব্যবহারের সফল যাত্রা শুরু হয়। নৌপথের ট্রানজিট ব্যবহারের কারণে ভারতের দু’টি রাজ্যের দূরত্ব ৩০০০ নটিক্যাল মাইল থেকে মাত্র ৬০০ নটিক্যাল মাইলে কমে এসেছে। যার কারণে দুটি রাজ্যে পণ্য পরিবহনের খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের প্রতি টন পণ্য পরিবহনের কর হিসেবে পাচ্ছে ১৯২ দশমিক ২২ টাকা। একইভাবে ভারতে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌ ও সড়ক পথের ট্রানজিট সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদনও করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ট্রানজিট ব্যবহার করার জন্য যে প্রটোকল রয়েছে, তার কারণে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ নয় বরং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ব্যবস্থায় দু’টি দেশের মধ্যে পরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চুক্তির কারণে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যাপক সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল এবং ভারত [বিবিআইএন] মোটরযান চলাচল চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়, যার ফলে যাত্রীবাহী, ব্যক্তিগত ও কার্গো মোটরযান চারটি দেশের সড়ক পথ ব্যবহার করতে পারে। এই চুক্তির কারণে চারটি দেশের মধ্যে মানুষ ও পণ্যবাহী মোটরযান চলাচল করছে নির্বিঘ্নে। এতে করে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা আদায় করতে সমর্থ হচ্ছে। এই চুক্তির কারণে স্থলবেষ্টিত ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে চট্টগ্রাম ও কলকাতা বন্দরের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতের ভূমির উপর দিয়ে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সরাসরি বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এর আগে ঢাকা-কলকাতা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি রুটে সরাসরি বাস চলাচল শুরু হয় ২০১৫ সালে। এছাড়া খুলনা-কলকাতা এবং যশোর-কলকাতা রুটে সরাসরি বাস চলাচলের জন্য বাংলাদেশ ও ভারত একমত হয়েছে। পাশাপাশি উভয় দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য আরো ৮টি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো- দর্শনা-গেদে, বেনাপোল-পেট্রাপোল, রোহনপুর-সিংগাবাদ, বিরল-রাধিকাপুর, শাহবাজপুর-মহিশ্মশান, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বুড়িমারি-চেংড়াবান্দা এবং মোগলহাট-গিতালদহ। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুলাউড়া-শাহবাজপুর বাংলাদেশ রেলযোগাযোগ পুনঃস্থাপন, আখাউড়া-আগরতলা এবং চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার যৌথ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। খুলনার মংলা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ৪৩ কিলোমিটারের সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। এই রেললাইন মংলা বন্দরের পার্শ্ববর্তী নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এদিকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ও নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে ভারত ও নেপাল সরকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের সিংগাবাদকে ব্যবহার করতে পারবে নেপাল। বর্তমানে নেপাল-বাংলাদেশ কাকরবিত্তা ও বাংলাবান্ধা করিডোর ব্যবহার করছে। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে কার্গো যাতায়াতে নানাবিধ সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমারের দখল থেকে ফিরে পাওয়া সমুদ্র অঞ্চলে ব্ল অর্থনীতির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার করে বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হবে।
এছাড়া ভৌগলিক অবস্থানগত সুবিধার জন্য বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করবে। শুধু সার্কভুক্ত দেশ নয় বরং চীন ও এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার মতো সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও ভারত সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের জন্য চুক্তি সম্পাদন করেছে। যার ফলে উভয় দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় দুটোই কমেছে। পাশাপাশি ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণাপাটনাম এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সাথে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে লাভবান হচ্ছেন। এতে করে দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে দ্বিগুণ গতিতে।
২০১৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দরে যাত্রী ও পণ্যপরিবহনে গতি বৃদ্ধি করতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে পেট্রাপোল আধুনিক চেকপোস্টের উদ্বোধন করেন। যার কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উভয় দেশের মধ্যে দ্রুত পণ্য, যাত্রী সেবা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোকে স্থল ও নৌপথ ট্রানজিট ব্যবহার করতে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতে সমর্থ হয়েছে। অথচ বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে হুমকির অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আন্ত:যোগাযোগ স্থাপন ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া হয়নি। বরং শেখ হাসিনার সরকার বিষয়গুলো অনুধাবন করে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি ও বাণিজ্য প্রসারের বিষয়টি মাথায় রেখে আন্ত:দেশীয় যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এতে করে বাংলাদেশ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা কর আদায় করতে সমর্থ হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরা ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে বাণিজ্য করার সুযোগ পাচ্ছেন।
এরইমধ্যে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আন্ত:দেশীয় যোগাযোগ বৃদ্ধি ও করিডোরগুলো অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। যার ফলে এই দেশগুলোর মধ্যে শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হবে না বরং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন, রাজনৈতিক সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here