সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান : নড়াইল-২ আসনের হাল ধরলেন মাশরাফি

143

নড়াইল কণ্ঠ : সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নৌকার প্রার্থী হচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বরপুত্র জাতীয় ওয়ানডে দলের সফল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-০২ আসনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম রবিবার (১১ নভেম্বর) সকালে সংগ্রহ করবেন। আওয়ামী লীগ’র দলীয় ও মাশরাফির পারিবারিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (৯ নভেম্বর) রাতে মাশরাফি নড়াইল-২ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনার বিষয়টি নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রবিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের পাশে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা অফিস থেকে তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করবেন। নড়াইল থেকে কয়েকজন মাশরাফির কাছের মানুষ ঢাকায় আসছেন আজ। তারাও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় উপস্থিত থাকবেন।
এদিকে গত এপ্রিল মাসে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় বলেছিলেন, মাশরাফি ও সাকিব সংসদ নির্বাচন করবে। এই ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশ তথা নড়াইলে নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন দেশসেরা ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মর্তুজা। সেসময় নেতাকর্মীরা মাশরাফির বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন। মাশরাফিকে ঘিরে ছাত্রলীগের একটি অংশ সার্বক্ষণিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় এ ব্যাপারে খবর প্রচারও করে। যদিও এই ঘোষণার পর থেকে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে আগ্রহীরা একেবারে চুপসে যায়। হেভিওয়েট প্রার্থীরা মাশরাফিকে প্রতিদ্বন্দী মনে করে তাকে তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিতে থাকে। তাদের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাশরাফিকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। মাশরাফির নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সামাজিক কর্মকান্ডকে তারা নির্বাচনে নামার প্রক্রিয়া মনে করে তাতে পরোক্ষভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে।
তবে ঐসময়ে মাশরাফির সাথে রাজনীতি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কখনোই রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে আগ্রহ না দেখিয়ে বরাবরের মতো বলেছেন, ‘আগে ১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলতে চাই, তারপর রাজনীতি’। এরপরও ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীদের একটি অংশ মাশরাফিকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালাতে থাকলে তাঁকে অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতে শুরু করেন।
সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর দেশব্যাপী চতুর্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নড়াইলের লোহাগড়াবাসীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন। সেখানে তিনি মাশরাফিকে নড়াইলের বড় সম্পদ উল্লেখ করে তার সুস্থতার জন্য দোয়া চান নড়াইলবাসীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নড়াইলের সর্বত্র মাশরাফির প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন আরো বেগবান হয়।
তবে ঐসময় নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল-০২ আসনের মনোনয়ন প্রার্থী নিজাম উদ্দিন খান নিলু বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী মাশরাফির অসুস্থতার কারণে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। এখানে তার প্রার্থিতার ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত দেননি। এগুলো সবই অতিউৎসাহী লোকের গুজব।
নড়াইল-২ আসনের প্রার্থী সৈয়দ আইয়ুব আলী বলেছিলেন, মাশরাফি সবার উপরে, নেত্রী তাঁকে মনোনয়ন দিলে আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বো। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি অসুস্থ তাই প্রধানমন্ত্রী তার জন্য দোয়া চেয়েছেন। এখানে নির্বাচনের কোন ইঙ্গিত নাই।
ছেলের সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তখন বাবা গোলাম মর্তুজা স্বপনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেছিলেন, মাশরাফি কিংবা আমরা কখনোই নির্বাচন নিয়ে ভাবিনি। আমরা কোথাও আগ্রহ প্রকাশ করিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি চান তার চাওয়া ফেরত দেয়াতো সম্ভব নয়। জানি না মাশরাফি কি করবে।
নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এড. কাজী বশিরুল হকের বক্তব্য ছিল, মাশরাফি তো কখনোই নির্বাচনে আসার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাননি, তিনি ইতিপূর্বে যেটা বলেছেন সেটা হলো “প্রধানমন্ত্রী আমাকে খুবই ভালোবাসেন, উনি যদি নির্বাচনের মাঠে নামতে বলেন তাহলে আমার নামতে হতে পারে”। মাশরাফি নির্বাচিত হলে বিশ্বকাপে আমাদের একজন এমপি খেলবে এটাতো ভালই হবে।
এদিকে মাশরাফির প্রার্থী হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন তরুণ যুবক ও ভক্ত সমর্থকেরা। তাঁর এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখছেন বিভিন্ন মন্তব্য। এছাড়া মাশরাফির প্রার্থিতাকে ঘিরে নড়াইল-০২ আসনের সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসবের আমেজ। চলছে আনন্দ মিছিল।
মাশরাফির ভক্ত রাসেল বিল্লাহ বলেন, রাজনীতিতে সৎ ও ভাল লোকের অভাব। সুস্থ রাজনীতি চর্চার জন্য জাতীয় রাজনীতিতে মাশরাফির মতো একজন সৎ ও ভাল মনের মানুষের প্রয়োজন। মাশরাফিদের মতো মানুষরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে দেশ পিছিয়ে যাবে। খেলাধুলার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করছে সেটাও অসুস্থ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে মুখথুবড়ে পড়বে।
স্থানীয়রা জানান, দেশের যুবসমাজের আইকন মাশরাফি নড়াইলে আসলে সর্বস্তরের সাথেই চলাফেরা করেন, তার কাছে দলের চেয়ে ব্যক্তি সম্পর্ক অনেক বড়। বন্ধুবৎসল মাশরাফি কখনোই কোন দলের হয়ে কথা বলেননি। নিজের খেলা আর এলাকার গরিব মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি। তাঁর আর্থিক সহযোগিতায় লেখাপড়া করছে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল এবং প্রকৌশলের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। নড়াইল তথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে দিনে দিনে মাশরাফি একজন মহান মানুষ হয়ে উঠেছেন।
মাশরাফির একজন বন্ধু ও প্রতিবেশী জানান, তাঁর (মাশরাফি) কাছ থেকে ভালোবাসা কিংবা সহায়তা পাননি এমন অসহায় মানুষের সংখ্যা বিরল। তাইতো তিনি আর্তমানবতার সেবা ও খেলাধুলার উন্নয়নে গড়ে তুলেছেন নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন। স্পন্সর জোগাড় করে ক্রিকেট, ফুটবল ও ভলিবলের জন্য তিন বছরের কোর্স করাচ্ছেন, স্পেশাল জিম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। দরিদ্র মানষের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করেছেন। নিজের অর্জিত বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়ে চলছে নড়াইলবাসীর সেবা। এসব তিনি তার একান্ত নিজস্ব প্রচেষ্টায় করেন, কোন দলীয় কিংবা সরকারি সহায়তা ছাড়াই।
এদিকে ফেসবুকে চলছে মাশরাফি বন্দনা। অনিকা ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, ‘মাশরাফির ভক্ত আমি। তিনি নির্বাচন করবেন তা আগে ভাবতে পারিনি। আর এখন মনে হচ্ছে আমার জীবনের প্রথম ভোটটি তাকে দিতে পারব, এর আনন্দই আলাদা।’
মাসুদুর রহমান নামে একজন লিখেছেন, ‘যে যাই বলুক ভাই, আমরা মাশরাফিকেই চাই। মাশরাফি ছাড়া কোনো বিকল্প নাই।’
মনিরুল হোসাইন নামে একজন লিখেছেন, ‘নড়াইলবাসীর জন্য কৌশিক (মাশরাফির ডাক নাম) আশীর্বাদ স্বরূপ। আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কৌশিকের বিকল্প নেই।’