সংলাপ-আন্দোলন একসঙ্গেই

0
11
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারামুক্তি না পাওয়ায় অতীত অভিজ্ঞতায় শুধু সংলাপ আলোচনায় ভরসা পাচ্ছে না বিএনপি। তবুও ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে বিএনপি যে ভুল করেছিল, তা এবার করতে চায় না। তাই সমঝোতার পথ খোলা রেখে চূড়ান্ত আন্দোলনের ছক কষছে বিএনপি।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, তসফিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করবেন দলটির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে সরকার সাত দফা বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে রাজপথই বেছে নেবেন তারা। ওই দিন থেকেই আন্দোলন শুরু হবে। মূলত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে শুরু হবে চূড়ান্ত আন্দোলন। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিতে তৃণমূলে বার্তা পাঠানো হয়েছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথ দখলে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে রাখা হচ্ছে। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা একান্ত আলাপকালে প্রিয়.কমের কাছে আন্দোলন ইস্যুতে এমন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, সংলাপকে ইতিবাচক হিসেবে নিলেও তা ফলপ্রসূ হবে না বলে শঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে সংলাপ সফল হোক বা না হোক, এর দায় যেন বিএনপির ওপর না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখা হবে। জনগণের কাছে তারা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক থাকবে, যাতে সরকারের ফাঁদে পড়ে না যায়। এ জন্য আন্দোলনের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করছে দলটির হাইকমান্ড।

সেই আলোকে সাত দফা দাবিতেই আন্দোলনকে টার্গেট করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। দলটির ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের এ বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে তফসিল ঘোষণার পরপরই আন্দোলনেই যাচ্ছে বিএনপি। কারণ সংলাপকে ‘সময়ক্ষেপণের কৌশল’ ভাবছেন তারা।

শুধু সংলাপের দাবি আদায় যথেষ্ট নয়। সে জন্য একদিকে সংলাপ আলোচনা অন্যদিকে থাকছে রাজপথে দাবি আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রস্তুতি। সে ক্ষেত্রে সরকারকে সময় দিতে রাজি নয় দলটির নেতৃত্ব। খুব শিগগির রাজপথে আন্দোলনের নামার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিএনপি এবং সেই আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ দেওয়া হবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরপরই।

এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রিয়.কমকে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেওয়া। কেননা তারা (সরকার) একদিকে সংলাপের কথা বলছে আর অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি করেছে। তাই আন্দোলনের বিকল্প নেই। আন্দোলনের বিষয়ে বার্তাও দেওয়া হয়েছে। সমঝোতা বা আলাপ-আলোচনা যা-ই বলি না কেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। তাকে নিয়ে নির্বাচনে যেতে চাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রিয়.কমকে বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন ও দলের কারাবন্দী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করতে সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিএনপি। হঠাৎ করে খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি, সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, নানা অজুহাতে গায়েবি মামলায় গ্রেফতারসহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার বিএনপিকে ‘নো রিটার্নে’ ঠেলে দিয়েছে। তাই আন্দোলনকেই তারা দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে নিচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিন স্তরের নেতাকর্মীকে আন্দোলন সফলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তফসিল ঘোষণা হলে তা বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশন ও সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি আসতে পারে। যদিও কর্মসূচি কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজপথ আন্দোলনের পরীক্ষিত সাবেক ছাত্রনেতা ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রভাব রয়েছে এমন স্থানীয় নেতাকর্মীদের সেই বিশেষ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নির্বাচন পদ্ধতি বা ধরন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতার এড়িয়ে সতর্কভাবে চলাফেরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৌশলগত পরিকল্পনা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই বিশেষ কমিটির দায়িত্বে থাকাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে না। তবে এবার অন্যান্য জেলার চেয়ে ‘ঢাকাকেন্দ্রিক’ আন্দোলন জোরদার করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

৩১ অক্টোবর, বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক কর্মসূচিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ রয়েছে। এ সংলাপে আওয়ামী লীগ কতটুকু আন্তরিক, সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা জনগণ বুঝতে পারছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা ও সাজার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে সংলাপের সফলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা মনে করি, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে কোনো সংলাপ বা নির্বাচন ফলপ্রসূ হবে না ।’

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বন্ধুরা, আমরা দেশে মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র এবং ভোটের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছি। আসুন আমরা এই সংগ্রামকে আরও সুসংগঠিত করি। খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তার জন্য সংগ্রাম করি।’

৩১ অক্টোবর, বুধবার সন্ধ্যায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের উদ্দেশ্য নিয়েও জোট নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বরং সংলাপ আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলনে যাওয়ার ব্যাপারে বৈঠকে নেতারা একমত হন এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকেই লাগাতার কর্মসূচি দিতে মতামত তুলে ধরেছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাবি আদায়ে সংলাপ-আন্দোলন একে অপরের পরিপূরক। তবে দীর্ঘদিন সংলাপের বিপক্ষে অনড় থাকা সরকার ও শেখ হাসিনা হঠাৎ কী ভেবে সংলাপের আয়োজন সরকারের কৌশলও হতে পারে। তারা সময়ক্ষেপণ করতে চাইছে, যেন আমরা আন্দোলনে যেতে না পারি।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে, আজ (বুধবার) মানববন্ধন পালন করা হয়েছে, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত গণ-অনশন পালন করা হবে। কাজেই সংলাপের বার্তায় বিএনপি দাবি আদায়ে আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি। বরং নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আদায় ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রামে নামার অপেক্ষায় এবং সেই অপেক্ষা তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত।’

দলটির একটি নির্ভরশীল সূত্র মতে, গত এক মাস ধরে আন্দোলনের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই মোতাবেক ঢাকাকে টার্গেট করে আন্দোলন সফলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং আন্দোলন সমন্বয় করার জন্য বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের সাত দফা দাবি মেনে নেবে বলে মনে হচ্ছে না। বিএনপিকে বাদ দিয়ে তারা আবারও একটি একতরফা নির্বাচন করার চেষ্টা করবে। দাবি আদায় না করে নির্বাচনে গেলে সরকার নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে যেনতেন একটি নির্বাচন করবে। দাবি আদায়ের আন্দোলনে অনড় থাকলে সরকার চাপে পড়বে। দেশি-বিদেশিরাও তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। ফলে ২০১৪ সালের মতো যেনতেন একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে ফের ক্ষমতায় যাওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও দাবি আদায়ে আন্দোলনের কথাই বলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবির প্রতি দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই উপযুক্ত কর্মসূচি দেওয়া হবে। এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে এ সরকারের পরিবর্তন আনা সম্ভবপর হবে। পরিস্থিতি বলে দেবে কী ধরনের কর্মসূচি দিতে হবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল (উত্তর) জেলার সাধারণ সম্পাদক আ ক ন কুদ্দুসুর রহমান প্রিয়.কম বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। শুধু কেন্দ্র থেকে নির্দেশের অপেক্ষা মাত্র।’

দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আন্দোলন ও নির্বাচনকে টার্গেট করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে বহিষ্কৃত ও সংস্কারপন্থীদের দলে ফেরানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সাত দফা দাবি ও ১২ লক্ষ্য সংবলিত লিফলেট আমরা সব সাংগঠনিক জেলায় পাঠিয়েছি। এ ছাড়াও জেলা শাখার নেতারাও নিজেদের উদ্যোগে লিফলেট তৈরি করে বিতরণ করছেন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here