আসামিরা আদালতে

33

একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় পড়তে শুরু করেছেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন।
লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ৩১জন আসামিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়েছে।
দুইটি মামলায় তারেক রহমান, এটিএম আমিনসহ অন্য ১৮জনকে পলাতক দেখানো হয়েছে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণ কী?
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে পরস্পরকে দায়ী করেছেন রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের আইনজীবীরা।

রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী বলেছেন, ” আসামী পক্ষের আইনজীবীরা মামলা দুটি পাঁচ বার উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়ায় আদালতের ২৯২ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে”।
এছাড়া তারা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে কালক্ষেপণ করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন বিএনপির আইনজীবী বলেন, “এই মামলায় শুরুতে ৬১ জনের সাক্ষী নেয়ার পর অধিকতর তদন্তের আবেদন করা হয়। দ্বিতীয় রিপোর্ট আসা পর্যন্ত কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। এছাড়া প্রত্যেকটা আসামীর পক্ষে আলাদা আলাদা আইনজীবী জেরা করছেন। ”
২০১২ সালের ২৮ মার্চ: মামলার বিচার শুরু
একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায়, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮শে মার্চ বুধবার৷
এই মামলায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানসহ ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচারকার্য শুরু হয়েছিল৷ আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ গ্রহণ করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
সাত বছরে ৬ তদন্ত কর্মকর্তা
গ্রেনেড হামলার পর মামলা হয়েছিলো পৃথক তিনটি। এর মধ্যে প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ই জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্র পক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন।
১৩ দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার তদন্ত শেষ হয়।
‘জ্ঞান ফিরে নিজেকে পেয়েছিলাম লাশের ট্রাকে’
“আইভী আপা চিৎকার করে উঠলো। ধরতে চেষ্টা করলাম কিন্তু নিজেরই শক্তি নেই। বসে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করলাম। আবার গ্রেনেডের শব্দ।পেটের ভেতর ঢুকে গেলো স্প্রিন্টার। কাপড় পুড়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পেলাম আমার পা ছিড়ে চলে যাচ্ছে”।
যেভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা
যখন গ্রেনেড হামলা শুরু হলো, তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেন – যাতে তাঁর গায়ে কোন আঘাত না লাগে।
যেসব নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তখন মি: হানিফের মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি মারা যান।
গ্রেনেড হামলার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কান্না জড়িত কণ্ঠে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমার নেতা-কর্মীরা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে অনেকেই ইনজিউরড (আহত) হয়েছে। তাদের রক্ত এখনও আমার কাপড়ে লেগে আছে। আমার নেতা-কর্মীরা তাদের জীবন দিয়েই আমাকে বাঁচিয়েছে।”
আদালতের সামনের এলাকা থেকে বিবিসির সংবাদদাতা কাদির কল্লোল জানাচ্ছেন,

নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টোদিকের ভবনে আদালতের কার্যক্রম শুরুর জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। চারদিকে ব্যাপক পুলিশের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। শুধু সড়কে নয়, আশেপাশের ভবনের ছাদেও পুলিশ রয়েছে। আদালত ঘিরে চারপাশের সড়কগুলোয় ব্যারিকেড তৈরি করেছে পুলিশ। এখন সেখানে কোন যানবাহন চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না। মানুষজনকেও চলাফেরার ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুরনো ঢাকায় আদালতের সামনের এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ
এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল -১ এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আশেপাশের সড়কগুলোয় র‍্যাব ও পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
”শেখ হাসিনা কয়েক হাত দুরে। তাকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেছেন তার দলের নেতারা। গ্রেনেডের শব্দ শেষে শুরু হলো গুলির শব্দ। এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়াই এবং গুলি থামলে ট্রাক থেকে নেমে আসি। নামার পর যা দেখি সেটি আরেক বিভীষিকা। চারদিকে আর্তনাদ, গোঙ্গানি। রক্তাক্ত পড়ে আছে বহু নারী পুরুষ। কে জীবিত কে মৃত বোঝা মুশকিল। নিজে বেঁচে আছি বুঝতে পেরে আবার ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করতে আরম্ভ করি”।
১৪ বছর পর এই মামলার রায় হচ্ছে
ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে ১৪ বছর ৪৮ দিন আগে।
২০০৪ সালের একুশে অগাস্টে ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো ২৪ জন – যে ঘটনা একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা হিসেবে পরিচিত।