বরেণ্য চিত্রশিল্পীর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

0
9
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৪ সালের এই দিনে অগণিত ভক্তদের কাঁদিয়ে যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় বাসভবনের উত্তর কোণে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় রঙ তুলির এই শিল্পীকে।
শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-মাছিমদিয়া শিল্পীর বাসভবনে কোরআন তেলাওয়াত, মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
খ্যাতিমান এই চিত্র শিল্পী ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা চিত্রা পাড়ের মাছিমদিয়া গ্রামের দরিদ্র রাজমিস্ত্রি মেছের আলীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। মা মাজু বিবির কোল আলোকিত করে সেদিন দরিদ্র পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন লাল মিয়া। শিল্পীর অসাধারণ চিত্রকর্মের বদান্যতায় লাল মিয়া থেকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন এসএম সুলতান নামে।
এসএম সুলতান ১৯৪১ সালে কোলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হয়েও তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসায় থেকে কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পান। কয়েক বছর পর এক ঘেয়েমি শিক্ষাজীবন তাকে দুর্বিষহ করে তোলে। এরপর ১৯৪৩ সালে তিনি ‘খাকসার’ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এক বছর পর ১৯৪৪ সালে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে শুরু করলেন বোহেমিয়ান জীবনের। চলে গেলেন কাশ্মীর। সেখানে উপজাতিদের সঙ্গে শুরু করেন বসবাস।
ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টি হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সে সময় হার্ডসন নামে এক কানাডিয়ান মহিলার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। তার সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে কাশ্মীরের সিমলায় তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়।
দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি কাশ্মির ছেড়ে লাহোরে চলে যান। সে সময় শিল্পী ও পন্ডিত নাগী চুগড়তাই, শাকের আলী, শেখ আহম্মদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে লাহোরে ও ১৯৪৯ সালে করাচির ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের চিত্র প্রদর্শনীতে তিনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।
এসএম সুলতান ১৯৫০ সালে নিউইয়র্কে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ব্রকলিন ইনস্টিটিউট অফ আর্ট প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০টি প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি। ১৯৫৩ সালে তিনি ফের দেশে ফিরে আসেন।
প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কোন প্রদর্শনী করতে পারেননি। তবে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তার একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
এই ২১টি বছর তিনি নড়াইলের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের ছবি আঁকায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। পাশাপাশি নিজ গ্রামে নন্দন কানন প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, ফাইন আর্ট স্কুল, ১৯৬৯ সালে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামে ফাইন আর্ট স্কুল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৩ সালে যশোরে একাডেমি অব ফাইন আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যশোরের ফাইন আর্ট স্কুলটি পরে চারুপীঠ নামে পরিবর্তন করা হয় এবং কুড়িগ্রামের ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে শিশুস্বর্গ নামকরণ করা হয়।
এসএম সুলতান ১৯৮৩ সালে প্রথম সরকারের সহযোগিতা পান। শিল্পীর প্রিয় পশুপাখি ও ভালবাসার মানুষদের নিয়ে জীবনের শেষ কটা দিন তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমি নড়াইলেই বসবাস করেন। হেয়ালী শিল্পী শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের শিশুস্বর্গ। সরকারি সহযোগিতায় নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামে চিত্রা নদীর পাড়ে ২ বিঘা জমিতে তার বাসভবন নির্মাণ করা হয়। নড়াইলের মাটি, প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবনের শেষ ক’টা দিন অতিবাহিত করেন।
চিত্রশিল্পী সুলতানের আঁকা ছবি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শতি হয়েছে। ১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলা, ১৯৪৮ পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি, ১৯৫৯ সালে লন্ডন, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে, ১৯৮৭ সালে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকায় এবং ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের খ্যাতনামা নয়জন চিত্রশিল্পীর সাথে যৌথ প্রদর্শনী ছাড়া দেশে-বিদেশে আরও অনেকবার চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিল্পীর অসাধারণ চিত্রকর্মের অবদান হিসেবে শিল্পী সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পদকে ভূষিত হয়েছেন।
এদিকে শিল্পী সুলতানের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে (বুধবার) সকালে শিল্পীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জিয়ারত, মিলাদ মাহফিল, কোরআনখানি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here