বৃহত্তর যশোরবাসি’র উন্নয়নে ১১দফা দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন

35

নড়াইল কণ্ঠ : প্রায় শত বছরের পুরাতন যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও যশোরে ৪টি অর্থনৈতিক জোনসহ বৃহত্তর যশোরবাসীর মোট ১১টি দাবি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এক মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বৃহত্তর যশোর উন্নয়ন ও বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদ ঢাকা ও যশোর কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

যশোর প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন বৃহত্তর যশোর উন্নয়ন ও বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদ যশোর কমিটির সভাপতি এ্যাড. এনামুল হক। সভায় সভাপতিত্ব করেন বৃহত্তর যশোর উন্নয়ন ও বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদের ঢাকা কমিটির সভাপতি ইঞ্জি. শৈলেন্দ্রনাথ সাহা।

সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন বৃহত্তর যশোর উন্নয়ন ও বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হাসান ইকবাল, যশোর কমিটির সহ-সভাপতি হারুন অর-রশিদ, ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাসানূজ্জামান বিপুল, যশোর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাবিবুর রহমান খান, ঢাকা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব রহমান খান, কোষাধ্যক্ষ মোঃ নাসির উদ্দিন, সদস্য শরীফ হাসান ইমাম আরজু, সদস্য মিয়া মাসুদুর রহমান, সদস্য মোঃ হাবিবুর রহমান।

মানবন্ধনে বক্তব্য রাখেন, দৈনিক কালের কন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক ফকরে আলম, আওয়ামী লীগ নেতা মোবাশ্বের হোসেন বাবু, শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হাসান বুলু, ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু, মহিল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তন্দ্রা ভট্টাচার্য, মহিলা পরিষদের আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাড. কনা, ছাত্র মৈত্রীর জেলা সভাপতি শ্যামল শর্মা, ছাত্রলীগ যশোর এম. এম. কলেজ শাখার সহ-সভাপতি মোঃ নাহিদ, শ্রমিক লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ। মানববন্ধন কর্মসূচী ও সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন যশোর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাবিবুর রহমান খান।

সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনে জানানো হয় ১৭৮১ সালে বাংলার অন্যতম প্রাচীন জেলা যশোর দেশ ও জাতীর উন্নয়নে যে ভুমিকা রেখে চলেছে সেই হিসেবে এই অঞ্চল উন্নয়নের দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। বেনাপোল বন্দর হতে প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায় সরকার এবং কৃষি ও শিল্প খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা আয় হয়। বৃহত্তর যশোর হতে অর্জিত এই অর্থ এ অঞ্চলের উন্নয়নে খুব সামান্যই ব্যয় করা হয়। শুধু উন্নয়নের দিক দিয়েই যশোর পিছিয়ে নেই, সরকারের মন্ত্রী পরিষদে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এ অঞ্চলের মানুষের গুরুত্ব সব সময় কম থাকে। এ অঞ্চলের উন্নয়নের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বলিষ্ট ভুমিকা রাখা ব্যক্তির অভাব রয়েছে।

যশোর এ উপমাহদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা। মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোর প্রথম জেলা যা পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত হয়েছিলো। ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট গঠিত হয় যশোর পৌরসভা। কলকাতা ও হাওড়ার পরেই যশোর পৌরসভার স্থান ছিলো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই জেলাটি ভারত বিভক্তের পর থেকে নানাভাবে পিছিয়ে পড়ে।

২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোর ঈদগাহ ময়দানের এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘যশোর একটি পুরোনো শহর’। আমরা যদি আগামীবার ক্ষমতায় আসতে পারি, তাহলে যশোরকে সিটি করর্পোরেশন করবো। সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছি।’ গত ৬ বছরে যশোরবাসীর সেই আশা পূরণ হয়নি।


সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতাদের প্রধান দাবি যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ। সেখানে এ বিষয়ে বলা হয়, ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কয়েকটি বিমানবন্দর নির্মাণ করে, তার মধ্যে একটি এই যশোর বিমানবন্দর। ঢাকার তেঁজগাও বিমানবন্দর তৈরির পরের বছর যশোর বিমানবন্দর তৈরির কাজ শুরু হয়। অথচ ৭৬ বছরের এই পুরাতন বিমানবন্দরটি যেমন উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল সে তুলনায় হয়নি। যশোর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে এর পক্ষে যৌক্তিক কিছু কারণ তুলে ধরেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

১) পদ্মার ওপারে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলায় মোট ৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। অথচ পদ্মার এপারে বৃহত্তর ফরিদপুর, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, বরিশাল বিভাগ ও খুলনা বিভাগের মোট ২১ জেলার মানুষের জন্য কোন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। এ অঞ্চলের মানুষ পুরোপুরি ঢাকার উপর নির্ভরশীল। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে ২১টি জেলার মানুষ উপকৃত হবে।

২) যশোর জেলা খাদ্যশস্য, মাছের পোনা, সবজি, খেজুরের গুড়, ফুল, গাড়ীর যন্ত্রাংশ, সবজী উৎপাদনে বিখ্যাত। বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা যোগ হয় এসকল খাত থেকে। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে এখান থেকে সরাসরি এ সকল দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৩) দেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ২১ জেলায় ২১টির অধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সরাসরি বিদেশ হতে আসা যাওয়া ও পণ্য আনা নেয়া সুবিধা হবে। ঢাকার উপর নির্ভরশীল হতে হবে না।

৪) যশোর জেলা খুলনা বিভাগ তথা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ও প্রবেশদার। ঢাকা-কোলকাতা শহরের সংযোগকারী শহর এই যশোর। বৃহত্তর যশোর, বৃহত্তর খুলনা, বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও বৃহত্তর ফরিদপুর হতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসা, ভ্রমণ, চাকরি ও ব্যবসায়িকসহ নানা প্রয়োজনে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে। দ্রুত যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাদেরকে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। যে কারণে অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হয় এবং রাজধানী ঢাকার উপর অনেক চাপ পড়ে। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে উপরোক্ত সমস্যাগুলো সহজেই সমাধান হতে পারে।

৫) শিল্পনগরী নওয়াপাড়ায় নৌবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের মত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোন রয়েছে এই জেলায়। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে এ অঞ্চল তথা সমগ্র বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হবে।

৬) প্রতি বছর এ অঞ্চলের প্রচুর মানুষ হজ্জ করতে সৌদি আরব যায়। এদের একটা বড় অংশ বৃদ্ধ। তাদের জন্য ঢাকা হয়ে সৌদি আরবে গিয়ে হজ্জ করে আবার ফিরে আসা অত্যন্ত কষ্টকর এবং অর্থের অপচয়। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে তাদের কষ্ট অনেক দিক দিয়ে কমে যাবে এবং অর্থ সাশ্রয় হবে।

৭) নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু চালু হবার পর দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হবে যশোর। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে ২১টি জেলার মানুষ যে সুবিধা পাবে, যশোর ছাড়া অন্য কোন জেলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে এ অঞ্চলের প্রচুর মানুষ সেই সুবিধা হতে বঞ্চিত হবে।

৮) একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রচুর দক্ষ জনবল ও অর্থ প্রয়োজন হয়। যশোরে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি থাকার কারণে অন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিমান বাহিনী খুব সুন্দরভাবেই করতে পারবে এবং সরকারের অর্থ সাশ্রয় হবে।

৯) যশোর বন্যা, জলশ্বাস, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মুক্ত ও কম ভুমিকম্পন প্রবণ এলাকা। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আন্তর্জাতিক বিমান উঠা নামার ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাধাপ্রাপ্ত হবে না।

১০) বৃহত্তর যশোরের ঐতিহ্য, অবদান, প্রশাসনিক অবকাঠামো, ভৌগলিক অবস্থান, প্রকৃতিক পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের প্রাণের দাবিকে বিবেচনা করে যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে মর্যাদা পাবার জন্য সর্বোচ্চ বিবেচনার দাবি রাখে।

সংবাদ সম্মেলনে যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের পাশাপাশি বৃহত্তর যশোরের মোট ১১ দফা দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট এই ১১ দফা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১) যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ, ২) নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও যশোরে ৪টি অর্থনৈতিক জোন, ৩) যশোরকে পৃথক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা ও বাস্তবায়ন, ৪) পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, লালন ও মধুসূদনের নামে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়, মহিলা ক্যাডেট কলেজ, নড়াইল ও ঝিনাইদহে মেডিকেল কলেজ স্থাপন, ৫) বেনাপোল স্থলবন্দর আধুনিকায়ন, ৬) দৌলদিয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা টানেল অথবা পদ্মাসেতু নির্মাণ এবং দৌলদিয়া-যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, ৭) চার জেলায় আন্তঃজেলা রেল যোগাযোগ, ঢাকা-খুলনা চলমান রুটে নতুন একটি রেল চালু এবং খুলন-কোলকাতা ট্রেন যশোরে যাত্রাবিরতী, ৮) বৃহত্তর যশোরের চারটি জেলায় গ্যাস সরবরাহ, ৯) বৃহত্তর যশোরে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণ, ১০) বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা স্থাপন, ১১) পর্যটন করর্পোরেশনের মাধ্যমে একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ।

বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।