মওলানা ভাসানীর ৩৯তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ

0
181

নড়াইল কণ্ঠ : মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৯তম ওফাত বার্ষিকী আজ। ৯৬ বছর বয়সে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আজীবন বিদ্রোহী এই প্রয়াত স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। পরদিন তাকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। ইসলামের সাম্যবাদ, স্বাধীনতা, মূল্যবোধ ও কমিউনিজমের শোষণ-নিপীড়ন বিরোধী লড়াইয়ের অঙ্গীকারের সমন্বয়ের প্রতীক মওলানা ভাসানী ওফাতের পরেও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্কটে-সঙ্কল্পে প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে জন্ম নেন। জীবনের শুরুতে মক্তবে শিক্ষা নিয়ে সেখানে কিছুকাল শিক্ষকতা করেন তিনি। অল্প বয়সেই আত্মাধিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা শাহ নাসিরউদ্দিন বোগদাদী (রহ:)-এর সংস্পর্শে এসে তিনি নতুন জীবনবোধে অনুপ্রাণিত হন। ইসালামি শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯০৭ সালে উপমহাদেশের বিখ্যাত কওমি মাদরাসা দেওবন্দে অধ্যয়ন শুরু করেন তিনি। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে যান। মওলানা ভাসানী ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময়ই তিনি ১০ মাস কারাভোগ করেন। কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসানচরে প্রথম কৃষক সম্মেলন করেন। সেই থেকেই তার নামের পেছনে ‘ভাসানী’ শব্দ যুক্ত হয়। ১৯৩১ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষের কাগমারীতে, ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের কাওরাখোলায় এবং ১৯৩৩ সালে গাইবান্ধায় বিশাল কৃষক সম্মেলন করেন। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে আসাম থেকে পূর্ববাংলায় ফিরে আসেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪৯-এর ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠন করে এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। ১৯৪৯ সালে ভুখা মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৫০ সালে সরকারি নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট করেন এবং মুক্তিলাভ করেন। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরি হলে তার সভাপতিত্বে এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জন্য আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৬ সালে বাংলায় খাদ্যজনিত দুর্ভিক্ষ রোধে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকায় অনশন করেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে একই বছর ২৫ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করে এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন ভাসানী। মওলানা ভাসানী ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী গণ আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমান সহ এ মামলার সকল আসামীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ভাষণ দিয়ে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি উত্থাপন করেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।এ সময় তিনি ভারতে ছিলেন।১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এবং একই বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক কথা পত্রিকা প্রকাশ করেন। মুজিব সরকারের ব্যাংক বীমা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নীতি ও ১৯৭২ সালে সংবিধানের প্রতি সমর্থন প্রদান করেন। তবে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের শোষণ, লুণ্ঠন ও ভারতমুখী নীতি ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তিনিই সবার আগে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ভারতের সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ড ও পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার থেকেছেন এবং মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মূলত তার এ আন্দোলনের চাপেই ভারতকে প্রথমবারের মতো ফারাক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ৯৬ বছর বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন মওলানা ভাসানী। ওফাত বার্ষিকীর বাণী মওলানা ভাসানীর ওফাত দিবস উপলক্ষে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ তার বাণীতে ভাসানীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলেন, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্। আজীবন তিনি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। জাতীয় সংকটে জনগণের পাশে থেকে তিনি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে সকলকে উদ্বুদ্ধ করতেন। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে তিনি সবসময় প্রাধান্য দিতেন। মওলানা ভাসানীর আদর্শ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মওলানা ভাসানী আজীবন কাজ করে গেছেন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ মওলানা ভাসানী বাঙালি জাতিসত্ত্বা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আদর্শিক ঐক্য ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা। শোষণ ও বঞ্চনাহীন এবং প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার বাণীতে বলেন, মওলানা ভাসানী জীবদ্দশায় সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, উপনিবেশবাদ বিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে আপোষহীন নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের নিপীড়িত-নির্যাতিত কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মজলুম জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শোষকের বিরুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল নির্ভীক ও বলিষ্ঠ। দেশে যখনই গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মানুষের মৌলিক-মানবাধিকার হুমকির সম্মুখীন হয় তখনই মওলানা ভাসানী জাতির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে যান। তার শেখানো পথ অনুসরণ করলেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে চিরদিন সাহস জোগাবে। কর্মসূচি মওলানা ভাসানীর ওফাত বার্ষিকী উপলেক্ষে টাঙ্গাইলে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে ভাসানী বিশ্ববিদালয় কৃর্তপক্ষসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। মাজার প্রাঙ্গনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাসানী’র ভক্ত-অনুসারী ও মুরীদানরা আসতে শুরু করেছেন। আজ সকাল ৭টায় সন্তোষে মরহুম জননেতার মাজারে ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ আলাউদ্দিনের পুস্পস্তবক অর্পন মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। মওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন, ভাসানীর পরিবার, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতালীগ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাসানীর মাজারে পুস্পস্তবক অর্পন ও ফাতেহা পাঠ করবেন। এ ছাড়া দিনভর ভাসানীর মাজার প্রাঙ্গণে চলবে কাঙ্গালী ভোজ। এদিকে ভাসনী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মাজার প্রাঙ্গণে পাঁচ দিনব্যাপী মেলা শুরু হয়েছে। মওলানা ভাসানীর ওফাত বার্ষিকী উপলেক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ৯টায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মাজার জিয়ারত এবং ১৮ নভেম্বর দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভা। এদিকে ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী পালনে আজ ন্যাপ-ভাসানী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মওলানা ভাসানীর মাজারে সকালে পুষ্পার্পণ, মাজার জিয়ারত এবং আলোচনা সভা।