চারটি মুক্তযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করে দৃষ্টান্ত করলেন ঝিনাইদহের ইউএনও শাম্মী ইসলাম

42

দেলোয়ার কবীর, ঝিনাইদহ : সরকারী কর্মকর্তারা সাধারনত গতানুগতিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকেন। এজন্য তারা ধন্যবাদও পেয়ে থাকেন। কিন্তু ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাম্মী ইসলাম উপজেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের গোড়ার কথা, অর্থাৎ বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ আন্দোলন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের লালসবুজের পতাকাসহ বেশ কয়েকটি প্রামান্য ছবিসম্বলিত তার এই কর্মকান্ড শুধু জেলার নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন ছুটে আসছেন প্রতিনিয়ত।
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে ইউএনও শাম্মী ইসলাম জানান, শৈশব থেকেই তিনি বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে শুনে আসছেন অভিভাবক ও বয়:জ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে। কিন্তু ইদানিং বিভিন্ন মাধ্যমে এবং কোন কোন ব্যক্তির মুখ থেকে বিষয়সম্পৃক্ত হলেও অনাকাঙ্খিত কথাবার্তা শুনে বিষ্মিত হচ্ছেন। অনাগত, বর্তমাণ ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য তাই তিনি কিছু প্রামান্যচিত্র স্থাপন করে নির্দিষ্ট কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চান। এক্ষত্রে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত বিবেচনা করে সেখানে চারটি মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ কর্ণারগুলোর নাম দিয়েছেন “মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কর্ণার”।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথের তত্বাবধানে পিটিআই ঝিনাইদহ, বিষয়খালি শহীদ মোস্তফা হাইস্কুল, উত্তরনারায়নপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও নারিকেলবাড়িয়া সরকারি প্রাইমারি স্কুলে স্থাপন করেছেন কর্ণারগুলো। শাম্মী ইসলাম জানান, একটি বিশালাকার লালসবুজ পতাকা, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ, ঝিনাইদহের বিষয়কালীর যুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সাতটি নির্বাচিত ভাষন, মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালিন প্রশিক্ষণ, নীরিহ জনসাধারনের ওপর পাকিস্তানী বাহিনীর নির্মম নির্যাতন, ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ, বাহান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদপ্রত্রের প্রকাশিত খবর ইত্যাদি তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে কর্ণারগুলো।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন বিষয়ে ইউএনও জানান, যেহেতু কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পাঠগ্রহন করে পাঠশালায়, কর্ণারগুলো তাদের পাঠের অংশ হিসাবেই বিবেচিত হতে পারে। শিক্ষকরাও এখান থেকে মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কিছুটা তথ্য পাবেন যা তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষাদানে সহায়ক হতে পারে । শাম্মী ইসলাম জানালেন, স্বচ্ছ কাঁচের ওপর স্থাপিত প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার নির্মাণে ৩৭ হাজার টাকার মত খরচ হয়েছে যা টেস্টরিলিফ কর্মসূচি থেকে খরচ করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট আতিয়ার রহমান জানালেন, তার শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে “মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কর্ণার” স্থাপিত হওয়ায় তিনি গর্বিত। এখানে ১৮ মাসব্যাপি প্রশিক্ষণ নিতে আসা প্রতি ব্যাচের ১৮০ ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) প্রশিক্ষণার্থী, শিক্ষক ও কর্মকতা এবং এক্সপেরিমেন্টাল প্রাইমারি স্কুলের সাড়ে চারশ কোমলমতি শিক্ষার্থী প্রায় প্রতিদিনই কর্ণারটি দেখছেন। তারা মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ক্যামেরায় ধারণকরা ছবি দেখে শিখছেন, অনুধাবন করছেন এবং শ্বিাস করছেন। এতে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও ত্যাগ জন্ম নিচ্ছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবর রহমানের ওপর তাদের শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হচ্ছে।
পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া আশিকুর রহমান, নুসরাত ফারহা, কুলসুম আরা, মিরাজ হোসেনসহ শিক্ষার্থীরা জানায়, মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার তাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে শিখতে সাহায্য করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসক ভাষণ তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে বলে জানায় শিশুরা।
ডিপিএড প্রশিক্ষণার্থী স্কুলশিক্ষক সেলিনা খাতুন, খাদিজা খাতুন ও উত্তম কুমার বিশ্বাস জানালেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কর্ণার তাদের জানার পরিধিকে বিস্তৃত করে, স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানতে স্পৃহা তৈরি করে। বিষয়কালীর যুদ্ধ যেহেতু স্থানীয় বিষয়, এটি তাদের কাছে একটি জ্বলন্ত উদাহরণ । তারা স্ব-স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে বিষয়গুলো আরও ব্যাপকভাবে শিশুদের জানাবার প্রয়াস অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।
ঝিনাইদহ-কুষ্ট্য়িা মহাসড়কের পাশে বিষয়খালি বাজারে শহীদ মোস্তফা হাইস্কুলে “মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কর্ণার” উদ্বোধনের পর জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মী ইসলামের উদ্যোগে চারটি মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপিত হবার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পেরে তিনি গর্ববোধ করেন। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মত সারাদেশে শাম্মী ইসলামের মত উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কিছুটা হলেও জ্ঞান লাভ করবে বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ।