হিযবুত তাহরীর সক্রিয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক

53

নড়াইল কণ্ঠ :বছরখানেক নিস্ক্রিয় থাকার পর স্কুল শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় থেকে চট্টগ্রামে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থী সংগঠন হিযবুত তাহরীর। নির্বাচনের মৌসুম শুরুর আগমুহূর্তে হিযবুত তাহরীরের এই সক্রিয় হয়ে উঠাকে সতর্কভাবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এই অবস্থায় জামিনে থাকা হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের অবস্থান যাচাই, নতুন করে যুক্ত হওয়া কর্মীদের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহবুবর রহমান।
এছাড়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জোরালো জনমত তৈরিতে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মসজিদে মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের কাছে বক্তব্য তুলে ধরা ও পরামর্শ চাওয়ার জন্য নগরীর ১৬ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার।
নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুবর রহমান জানান, ‘হিযবুত তাহরীরের হঠাৎ সক্রিয়তা আমাদের নজরে এসেছে। যে কোন একটা বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সেটাকে পুঁজি করে উসকানিমূলক কথাবার্তা লিখে পোস্টার-লিফলেট বিলি করে সংগঠনটি। এখন আবার সক্রিয় কেন হয়েছে সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের মধ্যে কারা জেলে আছে, কারা জামিনে আছে সেটার তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছি। গোয়েন্দা কার্যক্রমও অব্যাহত আছে।’
সূত্র মতে, আগস্টের শুরুতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে বিভিন্ন দেওয়ালে পোস্টার লাগায় হিযবুত তাহরীর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেনেও লাগানো হয় পোস্টার। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উসকানিমূলক লিফলেটও বিলি করা হয়, যাতে বর্তমান সরকারের পতন ঘটিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক দেওয়া হয়।
এসময় শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করতে হিযবুত তাহরীরের কর্মীরা আন্দোলনের মধ্যে ছদ্মবেশে ঢুকে পড়ে বলেও তথ্য পায় পুলিশ।
এরপর বুধবার (২৯ আগস্ট) চট্টগ্রামে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির আকারে লিফলেট বিলি করে আসে হিযবুত কর্মীরা। এতেও বর্তমান সরকারের পতন ঘটিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বানের কথা আছে। লিফলেটে সেনাবাহিনীর প্রতিও উসকানি আছে।
এই কর্মকাণ্ড জানাজানির পর বৃহস্পতিবার (৩০ আগস্ট) নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে হিযবুত তাহরীরের এক সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। হয়ত জঙ্গি সংগঠনটি বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। এই ধরনের তৎপরতা চালিয়ে কেউ পার পাবে না।’
২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহরীর। উগ্র মতবাদ প্রচার ও কর্মকাণ্ডের কারণে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এরপর চট্টগ্রাম নগরীতে একটি গ্রেফতার অভিযানে গিয়ে পুলিশ হিযবুত তাহরীরের একটি খসড়া সংবিধান উদ্ধার করে যাতে বাংলাদেশকে ইসলামী খিলাফতভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ আছে।
নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকা হিযবুত তাহরীর বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল ও প্রচারপত্র বিতরণ করে নিজেদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের কথা জানান দেয়।
সিএমপি সূত্রমতে, প্রকাশ্যে না হলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত হিযবুত তাহরীর কর্মীরা চট্টগ্রাম নগরীতে সক্রিয় ছিল। ৫-৭ মিনিটের ঝটিকা মিছিল, পোস্টার লাগানো, গণমাধ্যমের কার্যালয়ে গিয়ে লিফলেট ও প্রেস রিলিজ পৌঁছানোর কাজ তারা নিয়মিত করত।
২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর পুলিশ হিযবুত তাহরীরের কর্মকাণ্ড মোকাবেলায় মাঠে জোরালো কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসময় পুলিশ ও র‌্যাব মিলে চট্টগ্রাম নগরীতে হিযবুত তাহরীরের কয়েক’শ কর্মীকে গ্রেফতার করে। এরপর হিযবুত তাহরীরের নিয়মিত কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে আসে।
কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্টের শেষদিকে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে যখন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ, শিশুদের আসা শুরু হয়, তখন আবারও সক্রিয় হয়ে উঠে হিযবুত তাহরীর। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে এবং উসকানিমূলক বিভিন্ন বক্তব্য লিখে পোস্টার লাগায় হিযবুত তাহরীর।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে গণমিছিলের ডাক দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে পোস্টার সাঁটে হিযবুত তাহরীর। এরপর স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবারও সক্রিয় হয়ে এখনও পর্যন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে সংগঠনটি।
এই অবস্থায় সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে প্রতি শুক্রবার নগরীর মসজিদগুলোতে গিয়ে জুমার নামাজের আগে জনগনের সহায়তা চেয়ে বক্তব্য রাখছেন থানার ওসিরা। জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি মাদক বিক্রেতাদের তথ্য চেয়ে তারা মসজিদে আসা মুসল্লিদের সহযোগিতা কামনা করছেন।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন জানান, জুমার নামাজের আগে খুতবার মনোযোগী শ্রোতা থাকেন সাধারণ মুসল্লিরা। ইমামের খুতবার পাশাপাশি ওসিরাও মুসল্লিদের অনুমতি নিয়ে কথা বলছেন।
‘নিজের এলাকায় কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হচ্ছে কি না, কারও আচরণ সন্দেহজনক কি না, এই ধরনের তথ্য থাকলে থানায় এসে কিংবা ওসিকে ফোন করে জানানোর অনুরোধ করা হচ্ছে। মাদক ও জঙ্গিবাদের মধ্যে মুসল্লিদের সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে’ বলেন ওসি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ১৬টি থানায় ছোট-বড় ৫ হাজারের বেশি মসজিদে প্রতি শুক্রবার ১৫ লাখের বেশি মুসল্লী জুমার নামাজ আদায় করেন। প্রতিটি মসজিদে অন্তত একবার গিয়ে মুসল্লিদের উদ্দেশে ওসিদের মাধ্যমে বক্তব্য পৌঁছানোর টার্গেট আছে সিএমপির নীতিনির্ধারকদের।