পরিবারের দাবি ঝিনাইদহের ১২৫ বছরের শের আলী বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ

54

দেলোয়ার কবীর, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুলবাড়িয়ার গ্রামে শের আলী হাওলাদারের বয়স ১২৫ বছর। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ বলে দাবী তার পািবারের। শের আলী মিয়ার বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে তিনি শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার রাহাপাড়া গ্রামে বসবাস করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশরা যখন সৈন্য সংগ্রহ শুরু করে, তখন শের আলী ও তার বড় মামা আমজাদ আলী সরদার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদলে নাম লেখান। সে সময় বৃটিশ সৈন্যরা তাদের একটি সার্টিফিকেটও দেন, যেটি তার ছেলেরা হারিয়ে ফেলেছেন। যুদ্ধ শুরু হলে মা-বাবাসহ বাড়ির সবাই কান্নাকাটি শুরু করেন। যুদ্ধে যাওয়া বাধ্যতামুলক করে ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন জোট নির্দেশনা জারি করলে শের আলী মিয়া ও তার বড় মামা যুদ্ধে না গিয়ে পালিয়ে যান ভারতের বনগাঁর কাঠালিয়া গ্রামে। পরবর্তীতে সপরিবারে ভারতে বসবাস শুরু করেন।

পরিবার জানায়, আনুমানিক ২০-২২ বছর বয়সে তিনি পাশ্ববর্তী ফরিদপুরের নলতা গ্রামের করম আলী খন্দকারের মেয়ে আছিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের এক কন্যা সন্তানের জন্ম হবার পর তর আর কোন সন্তান হবেনা ভেবে তিনি ওই গ্রামের তমিজ উদ্দীন মাঝির কন্যা রুপভান বেগমকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন্। দ্বিতীয় স্ত্রীর ৫ ছেলে ও ১ মেয়ে। ১৯৬৮ সালে দ্বিতীয় স্ত্রী রপভান ও ১৯৯৯ সালে প্রথম স্ত্রী আছিয়া খাতুন মারা যান বলে জানালেন শের আলী হাওলাদার ।

শের আলী হাওলাদারের ছোট ভাই আইজুদ্দিন মিয়া জানান, ১৯৪৬ সালে ভারতের পাঞ্জাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে সম্পত্তি বিনিময় করে তিনি ৫ ভাই ও বাবা-মার সাথে চলে আসেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার ভাদড়া গ্রামে। ভাদড়া গ্রামে ওইসময় নামাজ পড়ার কোন মসজিদ না থাকায় ১০-১৫ ঘর মানুষের বেশির ভাগ মুসলমান হিন্দু রীতি অনুসরণ করেন। এসময় চলে আসেন ঝিনাইদহের কুলবাড়িয়া গ্রামে। রাস্তাহীন গ্রামে এসে তিনি ও তার ভায়েরা কুড়ে ঘর বেধে বসবাস শুরু করেন। কুলবাড়িয়ার ইয়াকুব আলীর মাধ্যমে ৬৫ বিঘা জমি কেনেন ।

শের আলীর ছেলে স্কুলশিক্ষক আব্দুল হক জানান, তার পিতার বয়স এখন ১২৫ বছর চলছে। সদর উপজেলার কুলবাড়িয়া গ্রামে শের আলী মিয়ার বাড়ি। পিতার নাম মৃত আমির আলী বক্স। মাতা জয়গুন নেছা ওরফে যমুনা বিবি। শের আলী হাওলাদার ৭ প্রজন্মকে দেখছেন। তার ছেলে ও মেয়ের সন্তানসহ ৯০ জন বংশধর রয়েছে। বর্তমান তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পক্ষের ছোট মেয়ে মনোয়ারা বেগমের বয়স ৭০ বছর ও ছোট ছেলে শহিদুল ইসলামের বয়স ৫২ বছর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বড় মেয়ে আনোয়ারা খাতুন জীবিত থাকলে এখন তার বয়স হতো ৮৪ বছর। ২০০৪ সালে ৭৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন আনোয়ারা খাতুন।

শের আলীর ছেলে শহিদুল হকের স্ত্রী রিনিয়া খাতুন জানান, এখনো নিজে ওজু করে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন শের আলী হাওলাদার। জীবনে কোনো অসুখ বিসুখ তাকে স্পর্শ করেনি। জীবনের শেষ সময়ে এসেও তিনি এক প্রাণবন্ত মানুষ। চুল দাড়ি অনেকটাই কাঁচা আছে। জ্ঞান, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি ভালো থাকায় একাই নিজের কাজ নিজে করতে পারেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে তিনিই বিশ্বের সেরা বয়স্ক মানুষ। সে কারনে গিনেস বুক অব রেকেডর্স-এ তার নাম লেখানোর দাবি জানানো হয়েছে।

তার নাতি রাব্বি মিয়া জানানা, শের আলী হাওলাদারই পৃথিবীর দীর্ঘজীবী পুরুষ মানুষ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে। আর বাংলা সান ছিল ১২৯৯ সালের ভাদ্র মাস। বর্তমান জাপানের ১১২ বছর বয়সী নাগরিক মাসাজো নোনাকা পৃথিবীর সবচাইতে বেশি বয়সী পুরুষ হিসেবে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছে বলে তিনি জানান।

মেজো ছেলে আব্দুল হক জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী হাওলাদারের বয়স ১১০ বছর। কিন্তু এই বয়স তার আসল বয়স নয়। মিডিয়া ও দর্শনার্থীদের অহেতুক বিড়ম্বনা কমাতে তার ছেলেরা পিতার বয়স ১৫ বছর কমিয়ে দিয়েছেন।

বড় ছেলে ফজল মিয়া বলেন, তার পিতা জীবদ্দশায় ৯ বার বাড়ি বদল করেছেন। ভারতের কাঠালিয়া, পাঁচপোতা, যশোরের ভাদড়া, রহমতপুর, বর্তমান গ্রামের তিন স্থানেসহ ৯টি স্থানে ঘরবাড়ি করেছেন। ঘনঘন বাড়ি পরিবর্তনের কারণে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া সেনা রিক্রুটের সনদটি হারিয়ে যায় বলে ফজল মিয়া জানান।

মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম জানান, কুলবাড়িয়া গ্রামের শের আলী হাওলাদার সম্ভবত বিশ্বের সবচে প্রবীণতম পুরুষ। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বয়স কম দেখানো হয়েছে বলে তিনিও জানতে পেরেছেন। প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধ শের আলীর বয়স অনেক বেশি।