আইসিটি খাতে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পে অনিয়মে উপার্জন!

0
26
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

নড়াইল কণ্ঠ : ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ (শিক্ষণ ও উপার্জন) প্রকল্প নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যে সরকার কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সীদের আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের উপার্জনের পথ তৈরি করা হয়। আইসিটি বিভাগের নেওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
৩১৯ দশমিক ৭৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৮ অনুসরণ না করেই নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি এই প্রকল্পের ‘প্রফেশনাল আউটসোর্সিং ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস ফর আইটি/আইটিইএস ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক সেবা ক্রয়ে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা বা ইওআই প্রকাশ করা হয়।তালিকায় এই অনিয়মের চিত্র ধরা পড়ে।
চলতি বছরের ৮ মে আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটে সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় প্রকল্পের পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেনের সই ছিল। প্রকাশিত তালিকায় ১৫টি লটে ৫৭ প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি লট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। লটগুলো হলো ৫, ৯ ও ১৫।
জানাগেছে, এই লটগুলোর ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৮ মানা হয়নি।

যা রয়েছে আইনে
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করে। সেই আইন অনুযায়ী, সংক্ষিপ্ত তালিকায় একটি লটে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির ক্ষেত্রে কমপক্ষে চারটি প্রতিষ্ঠানকে স্থান দিতে হবে।

আইনের ১১৫ নম্বর বিধির ৩ নম্বর উপ-বিধিতে লেখা রয়েছে, ‘প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি আগ্রহ ব্যক্তকরণের অনুরোধ বর্ণিত শর্তাদি পূরণ করিয়াছে এবং প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় আলোচ্য কার্য সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণে যথাযথ ও পর্যাপ্ত সামর্থ্য প্রদর্শন করিয়াছে, এইরূপ কমপক্ষে চারটি এবং সাতটির অধিক নহে এমনসংখ্যক আবেদনকারী সমন্বয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন করিবে এবং সুপারিশ সহকারে উহার প্রতিবেদন ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধানের নিকট অনুমোদনের জন্য পেশ করিবে।’

সংক্ষিপ্ত তালিকায় যদি চারটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া না যায়, তাহলে কী করতে হবে, তাও আইনে বলা আছে।আইনের ১১৫ নম্বর বিধির ৫ নম্বর উপবিধিতে বলা হয়, ‘মূল্যায়নের পর যদি সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চারের কম হয়, তাহা হইলে প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি নিম্নবর্ণিত বিষয়াদি যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে উক্ত কাজ পুনরীক্ষণ করিবে- (ক) আগ্রহ ব্যক্তকরণের অনুরোধের ছকটি সঠিক ছিল কি না; (খ) ইহা ক্রয়কারীর প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে কি না; এবং (গ) বিধি ৯০ অনুযায়ী যথাযথভাবে ইহার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হইয়াছিল কি না।’

৯৩ নম্বর বিধির ১১ নম্বর উপ-বিধিতে বলা হয়, ‘যদি ন্যূনতমসংখ্যক যোগ্যতাসম্পন্ন আবেদনকারী পাওয়া না যায়, তাহা হইলে ক্রয়কারী প্রাক-যোগ্যতার দলিল পুনরীক্ষণপূর্বক উহাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করিয়া ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধানের অনুমোদনক্রমে বিধি ৯০ অনুসারে পুনঃবিজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’

যা মানা হয়নি
প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত তালিকা অনুযায়ী, ৫ নম্বর লটে একটিমাত্র কোম্পনিকে স্থান দিয়েছে প্রকল্পটির মূল্যায়ন কমিটি। ৫ নম্বর লটে নাম ঘোষণা করা হয়েছে ‘বাংলানেট টেকনোলজিস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। এ ছাড়া ৯ নম্বর লটে দুটি প্রতিষ্ঠান (র‍্যাডিসন ডিজিটাল টেকনোলজিস লিমিটেড, লিডস ট্রেনিং অ্যান্ড কন্সাল্টিং লিমিটেড) এবং ১৫ নম্বর লটে (কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি এবং ইনেস্টিটিউট অব প্রোফেসনালস লার্নিং) নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এটি আইনের ১১৫ বিধির ৩ নম্বর উপ-বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন আবেদনকারী না পাওয়া সংক্রান্ত ৯৩ নম্বর বিধিও মানেননি প্রকল্প কর্মকর্তারা। তারা পুনঃবিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করেনি।

৯৪ নম্বর বিধির ১৪ নম্বর উপ-বিধিও মানেননি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ১৪ নম্বর উপ বিধিতে বলা হয়েছে, ‘ক্রয়কারী, মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের পর প্রাক-যোগ্য আবেদনকারীগণের তালিকা প্রকাশ করিবেন এবং প্রাক-যোগ্য হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে সকল আবেদনকারীকে অবহিত করিবেন।’

সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারটি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের যোগ্য হওয়া বা না হওয়ার বিষয়ে কিছু জানাননি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

ওই চার প্রতিষ্ঠানের একটির কর্মকর্তার দাবি, রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) ওপেনিংয়ের সময় সব অংশগ্রহণকারীকে ডেকে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে যাদের তারা (প্রকল্প কর্মকর্তারা) অনিয়মের মাধ্যমে কাজ দিয়েছেন, তাদের গোপনে ডেকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এমনকি আরএফপিতেও যেন তাদের নির্বাচিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর কাছে এ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ দেওয়া হয়নি।

এই প্রকল্পে অনিয়ম নিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। ওই অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের ১৫ নম্বর লটের ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল লার্নিং (আইপিএল) অ্যান্ড জয়েন্ট ভেঞ্চার অ্যাসোসিয়েট আরএফপির সেকশন-১ এর ১৮.৩ ও ১৮.৪ প্রতিপালন করেনি।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আর্থিক প্রস্তাবের ফর্ম ৫বি১-এ দর প্রস্তাব ট্যাক্সসহ ও ট্যাক্স ছাড়া চাইলেও ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল লার্নিং (আইপিএল) অ্যান্ড জয়েন্ট ভেঞ্চার অ্যাসোসিয়েট তা আলাদা না করে একসঙ্গে প্রদান করে। এ কারণে আইপিএল অ্যান্ড জয়েন্ট ভেঞ্চার অ্যাসোসিয়েটের আর্থিক প্রস্তাব নিয়ম অনুযায়ী বাতিলযোগ্য। কিন্তু তা না হয়ে উল্টো সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান দেওয়ার হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ

সম্প্রতি ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের’ পরিচালক ইসমাইল হোসেন ও উপ-পরিচালক নবীর উদ্দিনের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীর কাছে লিখিত ওই অভিযোগটি পাঠিয়েছিল ১৫ নম্বর লটে স্থান পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, প্রকল্পে অনিয়ম ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের নাম বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়ার প্রতিবাদ করায় তাদের কর্মকর্তাকে মারধর করা হয়েছে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ভুয়া নামে প্রশিক্ষণার্থী, মিথ্যা তথ্যে অর্থ উত্তোলন’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আইসিটি বিভাগের এই প্রকল্পের অনিয়মের খণ্ড চিত্র তুলে ধরা হয়।

অনিয়মের অভিযোগ এনে মন্ত্রীর কাছে চিঠি
প্রকল্পের এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্টে (ইওআই) অনিয়মের অভিযোগ এনে গত ৫ জুন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছে চিঠি দেয় সাতটি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো ‘প্রফেশনাল আউটসোর্সিং ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস ফর আইটি/আইটিইএস ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক সেবা ক্রয়ে অংশ নিয়েছিল।

চিঠির অনুলিপি মন্ত্রী ছাড়াও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী, আইসিটি সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকেও দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ‘ম্যাগনিটো ডিজিটাল’, ‘স্টার কম্পিউটার সিস্টেমস লিমিটেড’, ‘ব্যাবিলন রিসোর্স লিমিটেড’, ‘অন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’, ‘এমআরআর ইন্টারন্যাশনাল’, ‘ইজেনারেশন লিমিটেড’ এবং ‘বিজনেস অটোমেশন লিমিটেড’।

প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্য
প্রকল্পে আইন না মানার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক ইসমাইল হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এটা যারা বলেছে, এরা না জেনে বলেছে। আইন না পড়ে বলেছে।’
বিষয়টি নিয়ে আরও বিশদভাবে জানতে চাইলে ইসমাইল বলেন, ‘এই পিপিআর তো সবার কাছেই রয়েছে। এইটা সবার অফিসে রয়েছে, ওয়েবসাইটে রয়েছে।’
১১৫ নম্বর বিধির কথা উল্লেখ করা হলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার কথা হলো, যেটা বলে, সেটা তো পুরাতন জিনিস। আমি একটা কথা আপনাকে বলি যে, এখানে আমি তো তিন না সাড়ে তিন মাস হলো। এখানে যা করা হয়েছে, তা আইনানুগভাবে করা হয়েছে। আইনের বাহিরে বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটেনি।
এখন কেউ যদি অভিযোগ করে, মনে করেন ১১২টা না ১১৩টা কোম্পানি আবেদন করেছিল, সবাই তো আর টিকবে না। সর্বশেষ গিয়ে টিকবে ১৫টি লটে ১৫ জন। বাকিরা তো বিভিন্ন কথা বলতেই পারে।’
৫ নম্বর লটে একটি মাত্র কোম্পানি রয়েছে, এমনটি জানিয়ে কারণ জানতে চাইলে ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘এতে সমস্যা কী? সমস্যা নাই তো কোনো কিছু। সর্বশেষ তো একটাই টিকবে। আমার এটা হলো ওটিএম। পেপারে পাবলিশড হইছে, অন্যান্য স্থানে পাবলিশড হইছে। এখন কেউ যদি ডকুমেন্টস দাখিল না করে, টেন্ডার দাখিল না করে, তাহলে কাউকে ডেকে এনে বেশি বেশি করার সুযোগ নাই আমাদের।
এইটা তো ওপেন টেন্ডার। এখন যদি হয় টেন্ডারটি চাপা ছিল, যথাযথভাবে পাবলিশড হয়নি, তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে। আর এটা যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইন-কানুন দেখে তারা অনুমোদন করেছেন।’
সংক্ষিপ্ত তালিকায় একটি কোম্পানি থাকলে আইন অনুযায়ী পুনঃবিজ্ঞাপন দিতে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক বলেন, ‘ওপেনিং টেন্ডারিংয়ে একটা, দুইটা, পাঁচটা বলতে কোনো বিষয় নাই।’
মন্ত্রীর কাছে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন এরা দিতে পারে। কী বলব? না বুঝে যদি তারা দেয় বা আইন যদি তারা না পড়ে, তাহলে কী করার আছে বলেন?’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here