বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফিল্ম বানাবে ভারত সরকার!

45

‘মন্থন’, ‘অঙ্কুর’, ‘নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস—দ্য ফরগটেন হিরো’র নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক এক পত্রিকার প্রতিনিধিকে জানান, বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক বানাতে ভীষণ আগ্রহী তিনি,‘দিন সাতেক আগে ভারত সরকারের তরফ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং জানতে চাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বায়োপিক বানাতে আগ্রহী কি না। আমার আগ্রহের কথা তাদের জানিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর মতো ক্যারেক্টার এই দুনিয়ায় বিরল। তাঁকে নিয়ে ফিল্ম বানানো অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার, একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জও। সুযোগ দিলে বানাতে চাই।’
শ্যাম বেনেগালের কাছ থেকে তাঁর মেইল আইডি নিয়েছেন ভারত সরকারের ওই কর্মকর্তা। জানানো হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর কাছে পুরো প্রস্তাবটি লিখিত আকারে পাঠানো হবে। সে অপেক্ষায়ই আছেন বেনেগাল।

২০০৮ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর চিত্রনাট্যে বঙ্গবন্ধুর ওপর চলচ্চিত্র ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিকস’ নির্মাণের ঘোষণা এসেছিল। এটি নির্মাণ করার কথা ছিল শ্যাম বেনেগালের। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয়ের কথা ছিল অমিতাভ বচ্চনের। কোনো কারণে সেটি আর হচ্ছে না, জানালেন বেনেগাল।

তবে গৌতম ঘোষ জানালেন, এখনো ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব আসেনি তাঁর কাছে। কেউ যোগাযোগও করেনি। যোগাযোগ করা হলে করবেন বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক? ‘যদি প্রস্তাব পাই, অনেক কিছু ভেবে দেখতে হবে’—বললেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’ ও ‘শঙ্খচিল’ পরিচালক।

‘শব্দ’, ‘বিসর্জন’ ও ‘দৃষ্টিকোণ’ নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানালেন।
পরে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাসখানেক আগেই তাঁকে ফোন করে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়, ‘প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছি। এটা অনেক সম্মানের একটি বিষয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কনফারমেশন মেইল এখনো পাইনি। দেখা যাক, সুযোগ পাই কি না। তবে আমি ভীষণ আগ্রহী।’
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের স্ক্রিপ্ট বা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন কি না, এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে সিনেমা করা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়, ঐতিহাসিক ভ্যালু আছে প্রচণ্ড। এই সব কিছু মাথায় রেখেই গবেষণা করতে হবে। তবে গবেষণার কাজ এখনো শুরু করিনি। সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই শুরু করব।’

দাউদ হোসাইন রনি
সর্বপ্রথম তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন অবলম্বনে চলচ্চিত্র হবে। তিন বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে সম্মত হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ। এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে। ২০২০ সালে বঙ্গন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে মুক্তি পাবে বড় বাজেটের এই ছবি।’ গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ছবিটি কে পরিচালনা করবেন এবং কারা অভিনয় করবেন, এত দিনেও তা জানা যায়নি।

তবে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানিয়েছিলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই শুরু হবে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের শুটিং।

নতুন খবর হলো, ১২ জুলাই দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক পরিচালনার জন্য তিনজনের নাম প্রস্তাব করে ভারত—শ্যাম বেনেগাল, গৌতম ঘোষ ও কৌশিক গাঙ্গুলি। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা দেশে ফিরে সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে একজন পরিচালক চূড়ান্ত করবেন বলে জানা গেছে।

এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের নির্মাতা হিসেবে সম্ভাব্য ভারতীয় তিন পরিচালকের নাম প্রকাশ পাওয়ার পর ফেসবুকে এই পোস্ট দেন বাংলাদেশের ছোট পর্দার নির্মাতা মাহমুদ দিদার

‘ছি! লজ্জা! এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু। জাতির জনককে নিয়ে যে চলচ্চিত্র হবে, সেটা অবশ্যই বাংলাদেশের পরিচালক হতে হবে। ভারত চাইলে তাদের মত করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমা বানাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের টাকায় ভারতের প্রাচীনপন্থী, আধা-বিকশিত নির্মাতারা এই সিনেমা বানানোর সাহস করে ক্যামনে? বাংলাদেশ থেকে কারা এদের কথা ভাবে? এই ভারতমুখিনতা ক্ষতিকর। আমাদের চিন্তার সামর্থ্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তলানিতে নিয়ে যাওয়া আরো ভয়াবহ। ভারতের কোনো নির্মাতা এই বায়োপিক বানালে সেটা আমাদের ক্রিয়াশীল, সার্বভৌম চিন্তার পরাজয় হবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকাররা তখন একটা বৃহত্তম ভারতবর্ষীয় আঙুল দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে cultural hegemony নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিতে পারেন।’

দুই উদাহরণই আছে ভারত-পাকিস্তানে

লতিফুল হক
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেন ব্রিটিশ পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরো। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে গান্ধীও হয়েছিলেন একজন বিদেশি—বেন কিংসলে। বহুল প্রশংসিত ছবিটি ১১ ক্যাটাগরিতে অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল, জিতেছিল আটটি। তবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে চলচ্চিত্র ‘জিন্নাহ’ তৈরি করেন পাকিস্তানি নির্মাতাই। জামিল দেহলভির ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালে। এ ছবিতেও মূল চরিত্র করেন একজন বিদেশি। ব্রিটিশ অভিনেতা ক্রিস্টোফার লিকে দেখা যায় জিন্নাহরূপে, যা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে স্বীকৃত। ছবিটি সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত হয়, পাকিস্তানের মানুষও সাদরে গ্রহণ করে।
তথ্য সূত্র: অনলাইন