কমরেড জ্যোতি বসু ভারতের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের এক উজ্জল নক্ষত্র -কমরেড বিমল বিশ্বাস

184

কমরেড জ্যোতি বসু ১৯১৪ সালের ৮জুলাই বর্তমান বাংলাদেশের সোনার গাঁ উপজেলার বারুদিগ্রামে এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। কলিকাতে শহরেই শিক্ষা জীবনের শুরু এবং ১৯৩৫ সালে ব্যারিষ্টারী কোর্স সম্পাদনের জন্য লন্ডন যান এবং ১৯৪০ সালে ব্যারিষ্টারী পাস করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন দেশে ফিরে এসেই কমিনিউস্ট পার্টির একজন সার্বক্ষনিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করবেন। ১৯৩৫ সাল থেকে দেশ মাত্রিকার মুক্তির জন্য প্রগতিশীল ধ্যানধারনার মধ্যে থাকলেও কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে সরাসরি কোন যোগসূত্র ছিল না। বিলেতে থাকাকালিন সময় কমিনিউস্টি পার্টির ঘনিষ্ট সানিধ্যে আসেন।

বিশেষ করে তৎকালিন ভারতবর্ষে সভিয়েত ভারত সুহৃদ সমিতি গঠিত হলে ঐ কমিটির সাথে থেকে কাজ করতেন এবং ১৯৪১ সালে সভিয়েত-ভারত সুহৃদ সমিতির বাংলা প্রদেশ কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐসময়ে ১৯৪১ সালে ঢাকায় সভিয়েত সুহৃদ সমিতি সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে ভারতীয় কমিনিউষ্ট পার্টি প্রথম কনগ্রেসে যোগদান করেন। ঐ কনগ্রেসে শ্রমিক আন্দোলন ও সংগঠনের কাজের রূপরেখা প্রণয়নে শ্রমিক ফ্রন্টে কর্মরত পার্টি নেতৃত্বের যে সভা অনুষ্ঠিত হয় সেই সভায় কমরেড জ্যোতি বসু সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কমরেড জ্যোতি বসু পার্টি কাজের জন্য শ্রমিক ফ্রন্টে বিশেষ করে রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন ও সংগ্রাম গড়ে তোলা ও শ্রমিকদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কাজে মননিবেস করেন। বাংলা ও আসাম ছিল কমরেড জ্যোতি বসুর কাজের ক্ষেত্র।

১৯৪৬ সালে মার্চে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে যুক্তবাংলার ব্যবস্থাপক সভায় রেল শ্রমিকরা তাকে নির্বাচিত করেন। ১৯৪৬ সালে তেঁভাগা আন্দোলনের সময় যশোর জেলার বাকড়ি গ্রামে তেঁভাগা সংগ্রামের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছিলেন। তিনি ১৯৪৭ সালে ৪র্থ প্রাদেশিক সম্মেলনে অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে মাদুরায়ে পার্টি কনগ্রেসে তিনি সিপিআই’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবাংলার রাজ্য কমিটির সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬২ সালে চীন ভারত যুদ্ধের সময় তৎকালিন পার্টির অভ্যন্তরে চীন আক্রমনকারী এই ধরনের যে ভ্রান্ত মতামত দেখা যায় কমরেড জ্যোতি বসুসহ একাংশ সঠিকভাবে বলেছিলেন মার্কিন সাম্্রাজ্যেবাদের উস্কানিতে ভারতই চীনকে আক্রমন করেছে। কমরেড জ্যোতি বসুুসহ এই অংশের নেতৃবৃন্দেও বিরুদ্ধে তৎকালিন ভারতীয় কনগ্রেস নেতৃত্বাধিন সরকার সীমাহীন নির্যাতনের স্টীমরোলার চালায়।

১৯৬৪ সালের সভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিষ্ট পার্টি ও চীন কমিউনিষ্ট পার্টি বিশ্বব্যাপি যে মহাবির্তক সৃষ্টি শুরু হয়েছিল তার ঢেউ ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির অভ্যন্তরে প্রচন্ড বির্তকের সুত্রপাত ঘটায়। কমরেড জ্যোতি বসু সহ কেন্দ্রীয় কমিটির ৮জন কমিউনিষ্ট নেতা সভিয়েত ইউনিয়নের পার্টির সংশোধনবাদির লাইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পরিনতিতে পার্টি বিভক্ত হয়। গঠিত হয় ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি সিপিএম। কমরেড জ্যোতি বসু সিপিএম এর পলিট ব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ সালে ভারতের কমউিনিষ্ট পার্টি সিপিএম’র কমরেড চারু মজুমদারের বাম হটকারী লাইনের বিরুদ্ধে কমরেড জ্যোতি বসু ও সিপিএম তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু হলে কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে সিপিআইএমএল গঠন করে। সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে কনগ্রেস সরকার ও সিপিআই’র যেমন নির্যাতন নেমে এসেছিল তেমনিভাবে বাম হটকারী লাইনের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে গিয়ে বাম হটকারীদের তীব্র আক্রমনের মুখে পগতে হয়।

১৯৬৮ সলে বাংলার কনগ্রেসের সাথে মিলে বিধায়ক সভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে সিপিআইএম সংখ্যাঘরিষ্টতা পেলেও স্বেচ্ছায় মূখ্যমন্ত্রী’র দায়িত্ব ছেড়ে দেয় এবং ঐ সরকারের উপমূখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন কমরেড জ্যোতি বসু। বামপন্থি ও বাংলার কনগ্রেসের সাথে ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসু’র ভুমিকা ছিল প্রধান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ছাত্র-যুবদের সমাবেশে কমরেড জ্যোতি বসু বক্তৃতা করেন। শুধু তাই নয় ১৯৭১ সালে পশ্চিম বাংলা রাজ্য বিধান সভায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখেন কমরেড জ্যোতি বসু।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সিপিআইএম’র সক্রিয়ভুমিকা পালনের ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসু’র অগ্রণী ভুমিকা চিরস্মরণীয় থাকবে। ১৯৭২ সালে তৎকালিন কনগ্রেস সরকারের বরবোচিত নির্যাতন ও ফ্যাসিবাদি আক্রমনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পস্থায় যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা হয় তখন নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার ও অসংখ কর্মীর জীবনদানের মূর্হুতে কমরেড জ্যোতি বসু’র সাহসী ও সক্রিয় ভুমিকা এক স্মরণীয় অধ্যায়।

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবাংলা বিধায়ক নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাঘরিষ্টতা নিয়ে জয় লাভ করলে কমরেড জ্যোতি বসু পশ্চিমবাংলার মূখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২৪বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবাংলার মূখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। ঐসময়কালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি( মার্স্কবাদি) বামফ্রন্ট গঠন ও সিপিআইএম’র বিকাশের ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসু’র বিরাট অবান রয়েছে। পশ্চিমবাংলার ভুমি সংস্কার ও পঞ্চায়েত গঠনে কমরেড জ্যোতি বসু অন্যন্য ভুমিকা পালন করে গেছেন।

১৯৯৬ সালে ভারত বাংলাদেশ পানি চুক্তির ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসু’র অগ্রণীভুমিকা না থাকলে এই চুক্তি আদৌ হতো কি না সে এক বিরাট প্রশ্ন। পানি চুক্তির সময় কমরেড জ্যোতি বসু ও কমরেড বুদ্ধবেদ ভট্টাযার্চ্য সোনার গাঁ হোটেলে পৌঁছাবার সাথে সাথে কমরেড রাশেদ খান মেমন, কমরেড হাযদার আকবার খান রনো ও আমি সাক্ষাৎ করতে গিয়ে কমরেড জ্যোতি বসুকে বলেছিলাম পানি চুক্তি যদি বাংলাদেশের জনগনের স্বার্থসংরক্ষণ করে না হয় তা’হলে আপনি এবং আমরা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হবো। বাংলাদেশের জনগণের আপনার প্রতি রয়েছে এক গভীর আস্তা। সিপিআইএম ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি সম্পর্ক বাংলাদেশরে জনগণ জানে। কমরেড জ্যোতি বসু সাথে সাথে তৎকালিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়াকে বললেন পানি চুক্তির ব্যাপারে আমরা যেভাবে ভেবেছি সেভাবে চুক্তি হলে বাংলাদেশ লাভবান হবে না বলে মনে হচ্ছে। সাথে সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কমরেড জ্যোতি বসুকে বলেন আপনি যেটা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। কমরেড জ্যোতি বসু তৎকালিন ভারত সরকারের কতবড় আস্তাবান মানুষ ছিলেন তা এর মধ্যে স্পষ্ট। কমরেড জ্যোতি বসু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার একবার সুবর্ণসুযোগ এসেছিল। কিন্তু সিপিআইএম’র কেন্দ্রীর সংখ্যাঘরিষ্ট অংশ প্রধানমন্ত্রী হবার বিরোধীতা করে। কমরেড জ্যোতি বসু পার্টিও সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। শুধুমাত্র বলেছিলেন এ এক ঐতিহাসিক ভুল হলো। কমরেড জ্যোতি বসু পার্টির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও পার্টি সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন। শ্রমিক শ্রেণির পার্টি শৃঙ্খলাবোধের ক্ষেত্রে এ এক অন্যন্য সাধারন নজির। কমরেড জ্যোতি বসু মাকর্সবাদ লেলিনবাদের মৌলিক আদর্শকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করেছিলেন বলেই ব্যক্তিস্বার্থকে জঞ্জাজলি দিয়ে পার্টি ও জনগণের স্বার্থকে উর্দ্ধে তুলে ধরতে পেরেছেন এবং একজন সঠিক ব্যক্তি হিসেবে আমাদের সামনে শিক্ষার এক নজির সৃষ্টি করে গেছেন।

আগামি ১৭ জানুয়ারি কমরেড জ্যোতি বসু’র বসুর মহা প্রয়াণের দিন দৈহিকভাবে কমরেড জ্যোতি বসু মৃত্যুবরণ কওে গেলেও তিনি আদর্শ ও জনস্বার্থে ত্যাগের যে বিরল দৃষ্টান্ত আমাদেও সামনে রেখে গেছেন তাকে শ্রদ্ধা করতে গেলে তার জীবনের কাজের যে শিক্ষা রয়েছে তা থেকে আমাদেও শিখতে জানতে হবে। কমরেড জ্যোতি বসু জন্ম গ্রহণ করেছিলেন মানুষের জন্য তার মৃত্যুও পরও সে সাক্ষ্য রেখে গেছেন মেডিকেল কলেজে তার দেহদানের মাধ্যমে। মেডিকেলের ছাত্ররা এনাটমি ও কঙ্কাল দিয়ে তাদের চিকিৎসা শাস্ত্রের কাজে ব্যবহার করতে পারবে এ অমূল্য শিক্ষাও রেখে গেছেন। সমাজ বিকাশের ইতিহাসে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কমরেড জ্যোতি বসু আমাদেও এক অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে যুগ যুগ বেঁচে থাকবে। কমরেড জ্যোতি বসু’র বিবৃতি , চিঠি, বিধানসভার ভাষন আমার এ সংক্ষিপ্ত লেখার ক্ষেত্রে তেমন কোন সাহায্য নিতে পারলাম না বলে দু:খিত।

কমরেড জ্যোতি বসুকে একান্তভাবে কাছে পেয়েছিলাম হায়দারবাদ পার্টি কনগ্রেসে, ভারত বাংলাদেশ পানি চুক্তি’র সময় ও শিল্পকলা একাডেমিতে, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে।