নেইমারের ডানায় শেষ আটে ব্রাজিল

45

অবশেষে সেই নেইমারের দেখা, যে নেইমারের অপেক্ষাতে ছিল কোটি কোটি চোখ। গোল করলেন, গোল করালেন। হেক্সা শিরোপা জয়ের মিশনে ব্রাজিলকে এগিয়ে দিলেন আরেক ধাপ। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মেক্সিকোর বিপক্ষে নেইমারের পায়ে লুটোপুটি খেল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই ছন্দ, যে ছন্দে পাঁচবার বিশ্ব জয় করেছে তারা। নেইমার ঝলকে মেক্সিকোকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে উঠে গেল সেলেসাওরা।
এই জয়ে বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে অপরাজিত থাকা এবং নিজেদের জাল অক্ষত রাখার রেকর্ডটি ধরে রাখল ব্রাজিল। বিশ্বকাপে কখনোই মেক্সিকোর বিপক্ষে হারেনি তারা। এমনকি কোনো গোলও হজম করেনি। সামারা এরিনাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। যদিও বাধার দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিলেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক গুইলের্মো ওচোয়া। উড়ন্ত বলাকার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রাজিলের বেশ কয়েকটি আক্রমণ নস্যাৎ করে দেন তিনি। কিন্তু নেইমার ও ফিরমিনোর হাত থেকে দলকে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি তিনি।

খেলা শুরুর বাঁশি বেজে উঠতেই শুরু হয়ে যায় ধুন্ধুমার লড়াই। মনে হচ্ছিল যেন খেলা বেশ আগেই শুরু হয়েছে, সময় স্বল্পতা থাকায় এখনই গোল দিতে হবে। দুই মিনিটেই আক্রমণে যায় মেক্সিকো। আন্দ্রেস গুয়ার্দাদোর ক্রস ফিরিয়ে দিয়েও ব্রাজিলকে বিপদমুক্ত করতে পারেননি গোলরক্ষক অ্যালিসন। ফিরে আসা বলে শট হাঁকান হার্ভিং লোজানো। এ যাত্রায় কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা পায় ব্রাজিল।

তিন মিনিট পর ব্রাজিলের পাল্টা আক্রমণ। বেশ দূর থেকেই শট নেন নেইমার। কিন্তু গুইলের্মো ওচোয়া দাঁড়িয়ে যান দেওয়াল তুলে। যদিও বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি তিনি। তবে শটটি ফিরিয়ে মেক্সিকোকে বিপদমুক্ত করেন তিনি। এরপর একটু বিরতি। কোনো দলই সেভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে সেভাবে হানা দিতে পারেনি। ১৫ মিনিটের সময় দারুণ সুযোগ তৈরি করে মেক্সিকো। কিন্তু ব্রাজিলের ফাঁকা ডি-বক্সে লোজানোর বাড়িয়ে দেওয়া বল ধরতে পারেননি জাভিয়ের হার্নান্দেজ।

প্রথম ১৫ মিনিট দাপিয়ে খেলেছে মেক্সিকো। বল পেলেই সোজা ব্রাজিলের রক্ষণভাগে হানা দিচ্ছিলেন হার্নান্দেজ-লোজানোরা। এ সময় বল দখলের লড়াইয়ে মেক্সিকোই দাপট দেখাচ্ছিল। ২২ মিনিটে ব্রাজিলের ডি-বক্সের মধ্য থেকে শট নেন হেক্টর হেরেরা। কিন্তু ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ফিলিপে লুইসের বাধায় সফল হতে পারেননি হেরেরা।

২০ মিনিট পেরোতেই চেহারা বদলে যায় ব্রাজিলের। ছন্দে ফিরতে থাকে নেইমার-কোটিনহোদের পায়ে। ২৫ মিনিটে গিয়ে নেইমার জাদু। শরীরে ধোঁকায় মেক্সিকোর ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে ঢুকে পড়েন ডি-বক্সে। বাঁ পায়ে দারুণ একটি শটও নেন। কিন্তু আবারও ওচোয়া বাধা। মেক্সিকোর গোলপোস্টের অতন্দ্র এই প্রহরী ফিরিয়ে দেন নেইমারের শট।

এর দুই মিনিট পরই ফিলিপে কোটিনহোর দূরপাল্লার শট উপর দিয়ে চলে যায়। এর আগে অবশ্য শট নেন গ্যাব্রিয়েল জেসুস। কিন্তু তিনিও মেক্সিকোর রক্ষণভাগ ভেদ করতে পারেননি। ৩০ মিনিটে লম্বা পাসে বল পান কার্লোস ভেলা। কিন্তু কোটিনহোর মতো মেক্সিকোর এই ফরোয়ার্ডের শটও অনেক উপর দিয়ে চলে যায়।

সময় যত গড়িয়েছে ব্রাজিল তত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়েছেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক গুইলের্মো ওচোয়া। এরই ধারাবাহিকতায় ৩৩ মিনিটে জেসুসের শট থেকে আরও একবার দলকে রক্ষা করেন ওচোয়া। ৪১ মিনিটে আবারও হানা দেয় ব্রাজিল। ক্রস করেন উইলিয়ান। আরও একবার ঝাঁপিয়ে পড়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন ওচোয়া।

একদিকে ওচোয়া একাই লড়ে গেছেন, অন্যদিকে মেক্সিকোর আক্রমণভাগ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। আগের তিন ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও একজন ফিনিশারের অভাবে ভুগেছে মেক্সিকো। প্রথমার্ধে দারুণ ফুটবল খেলা মেক্সিকানরা পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেও গোল আদায় করে নিতে পারেনি। ব্রাজিলের ডি-বক্স থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের।

প্রথমার্ধ খেলায় টিকে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে আর পারেনি মেক্সিকো। ৫১ মিনিটে উইলিয়ানের ক্রসে পা লাগিয়ে বল মেক্সিকোর জালে জড়িয়ে দেন ব্রাজিলের প্রাণভোমরা নেইমার। এবার আর দলকে রক্ষা করতে পারেননি ওচোয়া। অবশ্য এর দুই মিনিট আগেই কোটিনহোর একটি শট ফিরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নেইমারের আলতো ছোঁয়ার বল তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল।

১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ব্রাজিল আরও দুর্বার হয়ে ওঠে। বল নিয়ে মেক্সিকোর রক্ষণভাগে আছড়ে পড়তে থাকেন নেইমার, কোটিনহো, উইলিয়ান, জেজুসরা। একজন ওচোয়া থাকায় রক্ষা পেয়েছে মেক্সিকো যে আরও গোল হজম করতে হয়নি তাদের। ৫৯ মিনিটে পলিনহোর শট ফেরানো ওচোয়া ৬৩ মিনিটে উইলিয়ানের বিদ্যুৎগতির শট থেকে মেক্সিকোকে রক্ষা করেন। বাকিটা সময়েও তাকে কম পরীক্ষা দিতে হয়নি। রক্ষণভাগের সতীর্থরা তাকে সেভাবে সাহায্য করতে পারেননি।

পিছিয়ে থাকা মেক্সিকো হন্যে হয়ে গোলের সন্ধানে থাকলেও ব্রাজিলের জালের ঠিকানা করতে পারেনি। উল্টো ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে আরও একটি গোল হজম করে নেয় তারা। দুই মিনিট আগেই বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছেন রবার্তো ফিরমিনো। এই দুই মিনিটেই নেইমারের সঙ্গে রসায়নটা জমে যায় তার।

বাম পাশ দিয়ে বল নিয়ে ছুটলেন নেইমার, ডান পাশে ফিরমিনো। নেইমার বল এগিয়ে দিতেই সেটা জালে জড়িয়ে দিলেন ফিরমিনো। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে মেক্সিকো আর কোমর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এদিনটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আফসোস হয়তো ওচোয়ারই থাকবে। ব্রাজিলের ডজনখানেক আক্রমণ ফিরিয়েও দলকে হার থেকে বাঁচাতে পারলেন না তিনি।