নড়াইলে শিক্ষকদের গাইড বই বাণিজ্য : কর্তৃপক্ষ নিরব

0
55
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

নড়াইল কণ্ঠ নিজস্ব প্রতিবেদক : এ সরকারের আমলে বছরের শুরুতেই উৎসবমূখর পরিবেশে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও সরকার বিনামূল্যে বই সরবরাহ করলেও নিরীহ শিক্ষার্থীরা রেহায় পাচ্ছে না পাচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের চক্র থেকে। শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যের বোর্ডের বইয়ের চেয়ে শতগুণ বেশিদামে নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে হচ্ছে। এদিকে গাইড বই কেনার জন্য পড়–য়াদের চেয়ে শিক্ষকদের উৎসাহ একটু বেশিমাত্রা নড়াইলে। এ যেন “মা’র চেয়ে মাসি দরদ বেশি”। বিভিন্ন বইয়ের দোকানে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের যেমন ছড়াছড়ি তেমনি “মা’র চেয়ে মাসি দরদ বেশি” মার্কা শিক্ষকদের চাপে গাইড বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শ্রমজীবী ও সাধারণ পরিবারের মানুষের উপর্জিত অর্থ দিয়ে অতিকষ্টে অভিভাবকরা গাইড বই কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এক শ্রেণির শিক্ষক বিভিন্ন বই প্রকাশক কোম্পানীর থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে স্কুলে গাইড বই শিক্ষার্থীদের মাঝে দিচ্ছেন।
নড়াইল জেলা শহরের বড় বাজার রূপগঞ্জ বাজার। এই বাজার ও আশেপাশের বই দোকান গুলোতে তদারকিশুণ্য অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে সরকার নিষিদ্ধ গাইড বই। ৩য় শ্রেণি থেকে শুরু করে সব শ্রেণির গাইড বই অবাধে পাওয়া যায় এসব দোকানে। শিক্ষার্থীরাও বই কিনছে বিনা সংকোচে। বাজারের সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন বই এর দোকান ‘বাংলাদেশ লাইব্রেরী’। এই লাইব্রেীরীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ছাপাখানায় নকল নোটবুক, গাইডবই ছাপিয়ে বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে, কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত সহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায়ও পড়েছে। সেবব ছেড়ে দিয়ে গত কয়েক বছর ধরে যশোরের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে গাইড বই বাণিজ্যের মূল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। এইদোকানে নিষিদ্ধ গাইড বই গুলো দোকানের ভিতরে স্টোরে থাকে আর বাইরে সাজানো থাকে বোর্ডের বৈধ বই, খাতা আর গল্পের বই। এছাড়া ন্যাশনাল লাইব্রেরী, নড়াইল লাইব্রেরী, পপুলার লাইব্রেরী, স্টুডেন্ড লাইব্রেরীসহ সব বইয়ের দোনকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে গাইড আর নোট বই।
গাইড বাণিজ্যের ব্যাপারে বাংলাদেশ লাইব্রেরীর মালিক সুবাস রায় জানান, গাইডতো নিষিদ্ধ কোন বই না। এর সাথে টেক্সবুক এর কোন মিল নাই। যশোরের হাসান বুক ডিপোর সাথে আপনারা যোগাযোগ করে বই বিক্রি করেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্কুলের স্যাররা নিজেরাই টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসে, তারাই ভালো বলতে পারবেন। এক’শ ধরনের গাইড আছে,ঔষধের মতো কোন স্যার কোনটা লিখবে তা তারাই ভালো জানে। তিনি উল্টো বলেন, গাইড বন্ধ করা যাবে না, চাহিদা থাকলে তার সরবরাহ থাকবেই।
কোমলমতি গরীব ছাত্রদের নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে বাধ্য করে দিচ্ছেন খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের অর্থলোভী কিছু শিক্ষক। শিক্ষকেরা ছাত্রদের সুনিদৃষ্ট কোম্পানীর গাইড বই কেনার জন্য চাপ দিয়ে বলছেন। গরীব শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের চাপে কিনতে বাধ্য হচ্ছে ১৩’শ থেকে ২২’শ টাকার মূল্যের গাইড। শিক্ষকরাই যেন ঐ সকল বই প্রকাশনীর সেলসম্যান।
এ বছরের এপ্রিল মাসের বিভিন্ন সময়ে চালানো অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে শিক্ষকদের গাইড বই বাণিজ্যের নানা তথ্য:
নড়াইল সদরের আগদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আহাদ আলী’র বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ তিনি সহ সকল সহকারী শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত কোম্পানীর গাইড বই কিনতে বলেছেন ।
স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র রহমান আলী জানায়, স্যাররা যে বই বিনতে বলেছে সেই বই কিনতে টাকা লাগবে ১২’শ আমি এখনো টাকা যোগাড় করতে পারিনি, তবে মা বলেছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেই বই কিনে দেবে।
৮ম শ্রেণির মিথিলা রহমান জানায়, আমাদের স্কুল থেকে স্যারেরা জুপিটার বই কিনতে বলেছে যার দাম ১৫’শ টাকা , কিন্তু আমি এতদিন টাকা জোগাড় করতে পারিনি বলে কিনতে পারিনি, টাকার জোগাড় হলে যে কোন দিন কিনবো। শিমুলিয়া’র অটোবাইক চালকের ছেলে নাসিম সরদার। জুপিটার গাইড না কেনায় স্কুলে স্যারদের ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। দিনমজুর বাবা একমাস পরে ছেলের গাইডের ১৬’শ টাকা জোগাড় করতে পেরেছে। সে ছেলে নাসিমকে বলেছে, গাইড কিনে দিবানি তারপর কিন্তু নিয়মিত স্কুলে যেতে হবে।
এই স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষকদের গাইড বই বাণিজ্যের কথা স্বীকার করে বলেন, শিক্ষকেরা তাদের মহান পেশার নৈতিকতা হারিয়ে এসব কাজ করছেন।
আগদিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ আহাদ আলী গাইড বই বিষয়ে বলেন, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ কোন বই আমরা বিক্রি করি না, আমরা ছেলেমেয়েদের গাইড বই কিনতে বাধ্য করি না। ছেলেমেয়েদের কাছে গাইড বই বিক্রি করে কোম্পানীর কাছ থেকে টাকা নেবার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।
এসকল গাইড বাণিজ্যের মূলে রয়েছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। জেলার ৩ উপজেলায় শিক্ষকদের একাধিক সমিতি রয়েছে, এসকল শিক্ষক নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে বিভিন্ন গাইড কোম্পানী। আর শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই। অভিযোগ আছে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ গত বছর “জননী প্রকাশনী” নামের একটি গাইড বই চালানোর বিনিময়ে ২০ লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়েছিলেন। এই টাকা বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করা হয়। সে সময়ে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রচার হলে এবছর এই বাণিজ্য অত্যন্ত গোপনে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর নড়াইল সদরের একটি শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে যশোরের হাসান বুক ডিপো’র সাথে নেতৃবৃন্দের একটি গোপন চুক্তি হয়েছে। সমিতিভূক্ত ২৯টি স্কুলে হাসান বুক ডিপো এর জননী, একের ভিতর সব, বাংলা গ্রামার, ইংলিশ গ্রামার ও সল্যুশন এই ৪ ধরনের গাইড বই সরবরাহের বিনিময়ে সমিতিকে প্রদান করা হবে ৩০ লক্ষ টাকা। হাসান বুক ডিপোর মিলন এই লেনদেনের মধ্যস্থতা করেছে।
অভিযোগের ব্যাপারে সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ জানান, গতবছর এরকম একটি ঘটনা ঘটার পরে তা মিডিয়াতে আসে। একছর শিক্ষক সমিতির সাথে এ ধরনের কোন চুক্তি হয়নি, আপনি খোজ নিয়ে দেখতে পারেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা নিজ উদ্যোগে গাইড বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকতে পারে।
গোবরা পার্ব্বতী বিদ্যাপীঠের স্কুলে ৭ম শ্রেণির ছাত্র নির্মল ভদ্র, আশিষ কুমার, সাবিনা সুলতানা, সাইফুল আলম বলেন, গতবছর স্যাররা জননী গাইড কিনতে বলেছিলেন তাই কিনেছিলাম, এবছর স্যাররা এখনো কিছু বলেনি, স্যার-ম্যাডামরা যেটা কিনতে বলবে সেটাই কিনবো।
স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, গতবছর আমাদের শিক্ষক সমিতি থেকে জননী গাইডকে সিলেবাস হিসেবে দেওয়া হয়েছিলো, আমাদের প্রধান শিক্ষকতো সমিতির সভাপতি উনি একটু ব্যস্ত আছেন পারিবারিকভাবে, উনি স্বাভাবিক হলেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফরিদউদ্দিন আহম্মেদ গাইড বাণিজ্য প্রসঙ্গে বলেন,অর্থ প্রদানের অভিযোগ অনুমান নির্ভর এ ব্যাপারে আমার জানা নাই। তবে বিভিন্ন কোম্পানী স্কুলে গিয়ে নানা প্রলোভন দেখিয়ে গোপনে গাইড বই ঢুকায়। এটা বিচিত্র কিছু না। সরকারি বয়েজ এবং গার্লস স্কুলের শিক্ষকেরাও এই বাণিজ্যের সাথে যুক্ত আছে।
গোপনে চলা এসব লেনদেনের খবর কেউ স্বীকার না করলেও স্কুলগুলোতে পাওয়া গেছে গাইড বইয়ের উপস্থিতি। শিক্ষকদের একটি অংশ গাইড বাণিজ্যেকে ঘৃণা করলেও সেই সংখ্যা খুবই কম।
সমিতির লেনদেনের কথা অস্বিকার করে শিক্ষকদের গাইড বাণিজ্যেযুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রুব কুমার ভদ্র। তিনি বলেন, সমিতিভূক্ত কোন স্কুল বা বাইরের কোন স্কুল ব্যক্তিগতভাবে গাইড বই এর সাথে যুক্ত থাকতে পারে। শিক্ষকদের এই বাণিজ্যের কারনে শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস নামলেও সে ব্যাপারে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম আব্দুল খালেক গাইড বই এর সীমিত ব্যবহারের কথা ন্বীকার করে বলেন, শিক্ষকদের আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক করবো এবং আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেবো। আমাদের যে কোন সভায় এ ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে দেখবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here