চূড়ান্ত হচ্ছে শিক্ষা আইন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে আইনি প্রস্তাবনা নেই

166

নড়াইল কণ্ঠ ডেস্ক : চূড়ান্ত হচ্ছে শিক্ষা আইন, কোচিং বাণিজ্য ও প্রাইভেট টিউশনি বন্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো প্রস্তাবনা নেই। প্রশ্ন ফাঁসের সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছর কারাদণ্ডের বিধানে সমালোচনা থাকলেও খসড়ায় সেটাই বহাল। আজ বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারী) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী সভার মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। খসড়াটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় অপরাধেও লঘুদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ কে ভিত্তি ধরে এই শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করার কথা। ২০১৩ সালে এই শিক্ষা আইন প্রণয়ন ও পাস করানোর উদ্যোগ নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান ছিল। এ নিয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষক সমিতি আন্দোলন শুরু করলে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর থেকে পিছু হটে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, শিক্ষা আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ আইন না থাকার কারণে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে এমপিও দেওয়া কিংবা বাতিল করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘদিন থেকে এ নিয়ে কাজ হচ্ছে, বিভিন্নজনের মতামতও নেওয়া হয়েছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হবে। প্রশ্ন ফাঁসের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে নির্দিষ্ট আইন আছে, নতুন করে কিছু করার আর প্রয়োজন নেই। বাস্তবায়নই আসল কথা।

শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘আজকের সভায় শিক্ষা আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত হলে প্রক্রিয়া অনুসারে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানো হবে। এক মাসের মধ্যে এটা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’

প্রস্তাবিত আইনে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনি বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কেবল বলা হয়েছে, ‘সরকার প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করলে কিংবা এর সঙ্গে জড়িত থাকলে বা সহায়তা করলে সর্বোচ্চ চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটি গত অক্টোবরে সবার মতামত গ্রহণের জন্য অনলাইনে প্রকাশ করা হলে এই শাস্তির বিধান নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বারবার যেখানে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে সেখানে কঠোর শাস্তির বিধান না করে তা কমানো হয়েছে বলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এ প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধের জন্য ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে আইনে। তবে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনে করা যাবে।

শিক্ষা আইনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও যেসব কারণে বাতিল হতে পারে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা না রাখলে, ভুয়া তথ্য প্রদান, অসদুপায় অবলম্বন, অনুমোদিত নয় এমন বই অনুসরণ করলে, প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী কাজে লিপ্ত থাকলে, নারী নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রভৃতি। এত দিন কোনো নির্দিষ্ট আইন না থাকায় কোনো কারণে শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিল হলে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নিয়ে পুনর্বহাল হয়ে যাচ্ছিলেন।

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়ে পৃথকভাবে নীতিমালা প্রণয়নেরও প্রস্তাব করা হয়েছে আইনে।

শিক্ষা আইন অনুসারে এক ব্যক্তি দুটির বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পদে থাকতে পারবেন না। ব্যবস্থাপনা কমিটির জন্য আলাদা বিধি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও রয়েছে। বর্তমানে একজন ব্যক্তি চারটি প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত কিংবা মনোনীত হতে পারেন। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রস্তাবনা অনুসারে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, এক বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা স্তরের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফিও সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য একটি ‘রেগুলেটরি কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালীন শিশুকে কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন বা শারীরিক শাস্তি প্রদান করা যাবে না। এই বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা তিন মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

আইনে গাইড ও নোট বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে সহায়ক পুস্তক প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে। গাইড ও নোট বই প্রকাশের শাস্তি দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও ছয় মাসের কারাদণ্ড।

নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান, অনগ্রসরতা, দূরত্ব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ডের শাস্তি রাখা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই শাস্তি ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল, একটি টেকনিক্যাল স্কুল ও একটি সরকারি কলেজ স্থাপন অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করার কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষকদের অপরাধে কোনো শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সরকার সর্বস্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় আচরণবিধি প্রণয়ন করবে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতা প্রচলনের কথা বলা হয়েছে।