কাজী ওমর হোসেনের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী : কিছু স্মৃতি

71

কাজী ওমর হোসেনের ১৭তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ। তাঁর ১৭তম মৃত্যুবাষির্কীতে নড়াইল কণ্ঠ পরিবার থেকে তাঁর আত্মার মাগফিরাত, শান্তি ও দোয়া কামনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, তিনি বিগত ২০০১ সালের ২৩ এপ্রিল সোমবার রাত আনুমানিক ৮টায় খুলনা ২৫০ বেড হাসপাতালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, দুই ছেলে, মা, পাঁচ ভাইসহ বহু আত্মীয়-স্বজন গুণগ্রাহি রেখে যান।
বর্তমান তাঁর তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মেয়ে খাদিজা খানম আদরী বিবাহ হয়েছে। সে এবছর বাংলায় অনার্স (২য়) পাস করেছে এবং নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে মাস্টার্স এ ভর্তি হয়ে অধ্যায়নরত।বড় ছেলে কাজী হৃদয় আকাশ অনার্স ২য় বর্ষ, ছোট ছেলে খুলনায় পলিটেকনিক্যালে অধ্যায়নরত।

কিছু স্মৃতিচারণ :
সেদিন ছিল ২৩ এপ্রিল ২০০১ সোমবার। ভওয়াখালি বড় ভাই (কাজী আব্দুর রাজ্জাক) এর বাসা থেকে আমার উত্তর কুড়িগ্রামস্থ বাসায় ভোর ৫টার দিকে এসে জানালো ওমর ভাই খুবই অসুস্থ্য। আমি বিলম্ব না করেই বড় ভাইয়ের বাসায় পৌঁছায় দেখি সে (ওমর ভাই)বড় ভাইয়ের বাসার বাইরে বারান্দায় সিঁড়ির উপর বসে আছে। আমাকে দেখা মাত্রই বলে উঠলো আমার সারা রাত পাতলা পায়খানা হয়েছে। হাফিজার তুই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চল। আমি আরএমও ডা: সঞ্জিত কুমার সাহার সাথে আলাপ করে তাৎক্ষনিক ভ্যানে করে নড়াইল সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে নিয়ে ভর্তি করি। কর্তব্যরত ডা: নার্গিস স্যালাইন ধরালেন। স্যালাইন চলচ্ছে। স্যালাইন চলা অবস্থায় আমি নিজে তাকে কয়েকবার বাথরুম করালাম এবং পানি দিয়ে পরিস্কার করালাম। শেষবারে মতো বাথরুম থেকে বললো আমাকে চিকিৎসা করানোর আর দরকার নেই, হয়তো আমি আর বাঁচবো না। আমাকে জড়িয়ে ধরে ভাই কেঁদে দিয়ে বললো হাফিজার তুই আমার ছেলে-মেয়েকে দেখিস, খালি-খালি চেস্টা করার আর দরকার নেই।
দুপুরের পর অবস্থার তেমন উন্নতি না দেখে পরিবারের মধ্যে নানা কথা শুরু হলো। এক পর্যায় সিদ্ধান্ত হলো খুলনা ২৫০ বেড হাসপাতালে নিতে হবে। এ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হলো। ৫টা কি সাড়ে ৫টার দিকে অক্সিজেন দিয়ে খুলনা ২৫০ বেড হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নড়াইল সদর হাসপাতাল ত্যাগ করলাম। আমার সঙ্গে ছিলো ভাইয়ের স্ত্রী আম্বিয়া বেগম, ১বছরের ছেলে রুপম হোসেন। আমার হাতের উপর ভাইয়ের মাথা, আমি বার বার লক্ষ্য করছি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দিকে। নোয়াপাড়ায় পৌঁছালে একবার মনের ভেতর খটকা লাগলো এই বুঝি ভাই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো। রাত যখন ৮টা তখন খুলনা ২৫০ বেড হাসপাতালে পৌঁছালাম। এ্যাম্বুলেন্স থেকে নিচে নামিয়ে হাসপাতালের কর্তব্য সহকর্মীরা প্রাথমিকভাবে জানালো রোগি মারা গেছেন। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসে বললো আপনার ভাই বেসখানি আগেই মারা গেছেন। সে রাতেই খুলনা থেকে প্রথমে ভওয়াখালি বড় ভাইয়ের বাড়িতে, পরে সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি নড়াইল সদরের নাওরা গ্রামে নেয়া হয়।
পরের দিন সকালে নাওরা জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে নামাযে যানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমরে মরদেহ দাফন কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।

ছোট বেলার কিছু স্মৃতি :
আমার দুই-আড়াই বসরের বড় ভাই কাজী ওমর হোসেন। মরহুম কাজী ওমর হোসেনের বড় মরহুম কাজী নবীর হোসেন ৫১ বছর আগে নলদী স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পুরণ করে ফেরার ঔরাতেই ডায়রিয়ায় (কলেরা) আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনিই আমাকে ও ওমর ভাইকে প্রথম লেখা-পড়ার হাতে খড়ি দেন। পিঠে-পিঠি ভাই হিসেবে সেই থেকেই আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। লেখা-পড়ায় সে আমাকে উৎস দিতো। সে এসএসসি পরীক্ষাও দিলো না। আমি এসএসসি পাশের পর সে কাঠের ব্যবসা শুরু করলো। গ্রাম থেকে তখন একটি মাত্র ছেলে কলেজে যায় সে হলো আমি। সে আমাকে প্রথম ঘড়ি কিনে দেয়। ভাইয়ের দিকে তাঁর খুব খেয়াল। ব্যালবেট প্যান্ট বানাই দিলো। খুলনায় খালিসপুর বিহারী পাড়ায় দেখার জন্য একবার আমাকে নিয়ে গেল। সে মানুষকে কিছু দিয়ে খুব আনন্দ পেত। এছাড়া তাঁর সাথে আমার বাদাবাদিও ছিল। তার শরীরের বিষ বাতাস (বাতজ্বর/রিউমেটিকফেবার) থাকায় প্রায় অসুস্থ্য হতো। সে এক সময় বললো তুই বিএ-এমএ পাস করে বড় একটা সরকারী চাকুরি করবি। আমরা বলতে পারবো আমার ভাই বড় চাকরী করে। আমি বিএ পাসের পরেও সে চেস্টা করলো চাকুরীর জন্য। একবার আমি ঢাকাতে প্রায় আড়াই বছর। বাড়িতে আসি না। লোক মারফারত শুনলাম ওমর ভাই খুব অসুস্থ্য, শরীরের সেই বিষ বাতাস বেড়েছে। আমি তখন নীলক্ষেত মোড়ে দাড়ানো। আমার হাতে একটি পাটকাঠি। আমি পাটকাঠিটি ধরে স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম প্রায় ১৫/২০মিনিট। ওখানে দাড়িয়েই আমি আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলাম ওর সব বিষ বাতাস আমার শরীরের দিয়ে ওকে তুমি ভালো করে দাও। তার প্রতিছবি প্রতিনিয়ত আমার চোখের সামনে ভাসে। সে শুধু আমার ভাই ছিল না সে আমার জীবনের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধুও ছিল।
তাঁর কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার ঘটনা আরও কঠিন ও পিড়াদায়ক। সে যাইহোক, তারপরও বহুচড়াইউতরানোর পর তাঁর ছেলে-মেয়েদের একত্রে আমার হৃদয়ের কাছে আনতে পেরে মনটা বড়ই আনন্দে ভরে উঠেছিলো। এরপরও প্রতিটি মূহুর্তে ভাইয়ের প্রতিছবি ভেসে উঠে। আর নিজের ভেতর প্রশ্ন জাগে তাঁর প্রতিটি ছেলে-মেয়েকে কি সর্বোচ্চ লেখা-পড়া অর্জন করাতে পারবো? হয়তো তাঁর দেয়া প্রতিশ্রতি পরিপূর্ণ রক্ষা করতে পারছি না বা পারিনি। সেজন্য দায়ি আমার ভাগ্য ও চেস্টা।