বাক্সবন্দি যৌনতা, একাকিত্বের ভয় আর ভায়োলেন্সের সফিস্টিকেশন

0
29
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

আর কত দিন ‘যৌনতা’ শব্দটাকে খাটের তলায় বাক্সবন্দি করে রাখা হবে? কীসের জন্য এই ছুঁৎমার্গ? লুকিয়ে-চুরিয়ে সবকিছুকে আর কতদিন রাখা হবে জানি না। আমরা কি এখনও বুঝলাম না, ‘লুকনো’, ‘নিষিদ্ধ’ জিনিসই আমাদের বেশি টানে! মনে করে দেখো, ঠাম্মার লুকিয়ে রাখা আমকাসুন্দি আর কয়েৎ বেলের আচার দুপুরে চুরি করে খেয়ে জীবনে প্রথম বার যে বিশ্বজয়ের আনন্দ পেয়েছিলে, খোদ চেঙ্গিজ খানও তা পাননি। তার পর ক্লাস নাইনে টিফিনের ফাঁকে ২ বছরের সিনিয়র দাদার গোল্ড ফ্লেকের কাউণ্টার পার্ট নিয়ে ঠোঁটের দু’ফাঁকে যখন রাখলে, তখন অজান্তেই তোমার দু’হাত তোমার স্কুল ইউনিফর্মের শার্টটার কলার তুলে দিল। ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে লর্ডসের ব্যালকনিতে বসে সৌরভ গাঙ্গুলি টিশার্ট উড়িয়েও সেই তৃপ্তি পাননি, যেটা সেদিন তুমি পেয়েছিলে। তোমার নিষিদ্ধ জিনিস জয় করার আনন্দ এখানেই থেমে থাকেনি। তুমি জানো সেটা। মনে করে দেখো, কলেজ কেটে প্রিন্সেপ ঘাটে গিয়ে প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদনের ১৭ দিনের মাথায় প্রথম চুমুটা খেয়ে যে রাজকীয় আনন্দ অনুভব করেছিলে, তা মেডিক্যালে প্রথম চল্লিশের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার থেকে কোনো অংশে কম ছিল না।

তাহলে এত লুকোচুরি কীসের? আর কত দিন ‘যৌনতা’ শব্দটাকে খাটের তলায় বাক্সবন্দি করে রাখা হবে? কীসের জন্য এই ছুঁৎমার্গ? কী চাইছ বলো তো? যাতে আরও ১৭টা করে ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ে প্রতিদিন। কী চাইছ, প্রতিদিন আরও ৫টা করে বেশি ধর্ষণের নিত্যনতুন ‘অতি আধুনিক’ কলা-কৌশলের খবর খুঁটিয়ে পড়তে পারো বিভিন্ন সংবাদপত্রের পাতায় গ্রিন টি সহযোগে মেরি বিস্কুট খেতে খেতে।

আমরা সবাই ভুলে গিয়েছি, আজকের ছেলেমেয়েদের ‘নিষিদ্ধ’ জিনিসের সন্ধান পেতে খুব একটা বেশি বেগ পেতে হয় না। সেই সময়টা পেরিয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগেই, যখন বাবার চোখের আড়ালে বায়োলজির বইয়ের ভিতর ‘তসলিমা নাসরিন’-কে লুকিয়ে পড়তে হতো। এখন একটা ওয়াই ফাই বা হাল আমলের ‘জিও’-র কানেকশনই যথেষ্ট। এখনও কোনও সিনেমায় একটু বেশি সাহসী দৃশ্য থাকলে দেশ জুড়ে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে, এখনও কোনও স্কুল শিক্ষিকা সপ্তাহের শেষে একদিন স্লিভলেস সালোয়ার পরে স্কুলে গেলে ছাত্রছাত্রীর বাবা-মা’রা স্কুল গ্রাউন্ডে ধরনায় বসেন, সানিয়া মির্জা হাঁটুর উপর স্কার্ট পরে খেললে ‘ইশশশশ ছি ছি’ বলে উঠি। সবেতেই বড্ড বেশি ছুঁৎমার্গ আমাদের।
এত রাখঢাক করেও যদি একটা ধর্ষণ ঠেকাতে পারো, তোমায় মাথা নত করে কুর্ণিশ জানাব, কথা দিলাম। কিন্তু একটা ভয় হয় কী বলো তো, লুকনো বাক্সবন্দি যৌনতার খোঁজে আরও কয়েকটা মানুষরূপী পশুর সংখ্যা বেড়ে যাবে না তো?

শুধুমাত্র বিদেশিদের ছেঁড়া জিনস আর বিফস্টেক খাওয়া কপি না করে কিছু ভাল জিনিস কপি করলেও মন্দ হবে না ভেবে দেখো। খাওয়া, ঘুম, প্রাকৃতিক ডাকের মতো ‘যৌনতা’-টাও যে একটা স্বাভাবিক জিনিস, সেটা ওরা কবেই বুঝে গিয়েছে। তাই তো রাত দশটার পরেও কোনওদিন নিউ ইয়র্কের রাস্তায় হাফ প্যান্ট আর স্লিভলেস টি শার্ট পরে একা হেঁটে ঘুরতে একটুও ভয় করে না।

ভয় করে আবার অন্য কিছুর। প্রথম যেদিন এই ‘মেরিকা’ দেশের মাটিতে পা দিয়েছিলাম, সেদিন বলা হয়েছিল ‘কালো’-দের থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, এখনও পর্যন্ত কোনও ‘কালো’ আমার কোনও সর্বনাশ করেনি। বরং কোনও এক পৌষমাসের শীতের সকালে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে যখন একটু দূরের বাজারের রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিলাম, আমার প্রতিবেশী ‘কালো’ ভদ্রলোক তাঁর গাড়িতে লিফট দেওয়ার জন্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সারাজীবন হৃদমাঝারে যত্ন করে রেখে দেব সেই সাহায্যের ছোঁয়াটুকু।

তবে একট জিনিসকে ভয় করে এদেশে। সেটা একাকিত্ব। সারারাত ম্যানহাটনের রাস্তায় পায়ের শব্দ শোনা গেলেও, প্রতিটা মানুষ খুব একা। তখন খুব বেশি করে মনে হয়, একটা শহর বা একটা দেশ আলাদা করে কোনও মানুষের ভাল থাকার কারণ হতে পারে না।
তাই আমার মধ্যবিত্ত মন এই প্রমোদ নগরীর বিলাসবহুল জীবনযাত্রা আর হাজারো নিয়ন আলোয় আলাদা করে কিছু বিস্মিত হয় না। ‘চোখ ফোন’ ৭,৮,১০-এর প্রতি চূড়ান্ত উদাসীন হওয়ার জন্য আধুনিকতায় পিছিয়ে পড়ার তকমাও জুটতে পারে যে কোনও দিন। আমার চূড়ান্ত ক্যাবলামিতে ভরা জীবন দু’টকরো বরফ, এক মুঠো নোনা জল, একটু পথ ভুল করে হারিয়ে যাওয়া জঙ্গল, শান্তিনিকেতনের দুটো খড়ের চালের মাটির বাড়ি দেখতে পেলে কয়েক কোটি গুণ বেশি খুশি হয়।

অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার তাগিদ সুস্থ মস্তিষ্কের প্রতিটা মানুষেরই থাকে। তাই তো দুয়ারের ওপারে গিয়ে এমন কিছু জিনিস দেখেছি, যা মনকে সমৃদ্ধ করেছে। সেটা ইয়েলোস্টোনের চমকপ্রদ গাইসার হতে পারে, রংবদলের মরশুমের লাল, গোলাপি পাতা হতে পারে, টাইম স্কোয়ারের চোখ ঝলসে যাওয়া হাজার হাজার বিজ্ঞাপনের পোস্টার হতে পারে কিংবা মিয়ামির প্রুশিয়ান ব্লু জলও হতে পারে।

তবে এই অদেখাকে দেখার তাগিদে আর জানার তাগিদে যখন বেরিয়ে পড়ি, তখন আবার একটু একলা হতে ইচ্ছে করে। তখন বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ কিংবা জেন অস্টিনের ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’ পড়ার সময়ে প্রত্যেকের মনে হয়েছে, এই কিছুটা সময় যেন তার নিজের হয়। মায়ের দশ বার খেতে বসার জন্যে ডাক দেওয়া কিংবা প্রিয় বন্ধু বা বান্ধবীর ক্রমাগত বার্তা পাঠানোর ক্রিং ক্রিং আওয়াজে ৫ ইঞ্চির মোবাইলটা কেঁপে কেঁপে উঠলেও মন তখন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে ওই কালো অক্ষরগুলোয়। তখন অজান্তেই মনে মনে কালো অক্ষরগুলোকে বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’।

অনেক জটিলতা পেরিয়ে যখন প্রিয় মানুষটিকে নিজের করে পাওয়া যায়, তখনও নিজের মনে বলতে ইচ্ছে করে ‘ আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’। ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ দেখার সময়ে বা ফ্রান্সিস ফোর্ডের ‘গডফাদার’ দেখার সময়ে মনে হয় কেউ যেন দরজায় টোকা না মেরে বিরক্ত না করুক। তখনও কোথাও বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’।

তেমনই কোথাও ভয়ঙ্কর সুন্দর ‘মৃত্যু উপত্যকার’ ভয়ঙ্কর স্নিগ্ধতা দেখে বা কোথাও গভীর অরণ্যের নিস্তব্ধতা দেখে কিংবা গম্ভীর পাহাড়ের গাম্ভীর্য দেখে বা প্রাণোচ্ছ্বল সমুদ্রের প্রাণশক্তি দেখে বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’। তাই হয়তো একাকিত্ব আর একলা হতে চাওয়া-র মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। সেই রকমই একটা অদ্ভুত পার্থক্য আছে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স আর সফিস্টিকেটেড ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের মধ্যে। এই পার্থক্যের গল্পই করছিলাম সেদিন আমার লেখার খাতা আর কলমের সঙ্গে।

বন্ধুকে বললাম, আমার দেশে আরও একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এই শুনে বন্ধু বলল, “এ আর নতুন কথা কী? তোমার দেশে তো রোজই একটা করে মেয়ে মরে। কখনও শ্বশুরবাড়িতে তাকে পুড়িয়ে মারে, কখনও তার শরীরটাকে নিয়ে কিছু পশুর দল ‘থুড়ি’ মানুষরূপী পশুর দল তার শরীরে পাশবিকতার নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় এবং তার পর তার নগ্ন শরীরটাকে রাস্তার পাশের নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়।”
আমি চুপ করে রইলাম কিছুক্ষণ। বললাম, “জানো, এখন মানুষগুলো খুব চালাক হতে শিখেছে। আগে যেমন মোটা টাকার পণ দিতে না পারার জন্যে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ফাটিয়ে মারা হতো, এখন তার ধরন পালটেছে শুনলাম।”

বন্ধু মুচকি হেসে বলল, “তাহলে কি সফিস্টিকেটেড ভায়োলেন্স বেড়েছে?” আমি বললাম, “ঠিক তাই।” আগে মেয়ে চাকরি করতে বেরলে তাকে ‘বারমুখী’ বলে টিটকিরি দেওয়া হতো। আমার নিজের এক পরিচিত জেঠিমা আজ থেকে ৩০ বছর আগে ইংরেজিতে মাস্টার্স করে শুধুমাত্র ‘ঘরের লক্ষ্মী বউ’ হয়ে থেকে গিয়েছেন সারা জীবন। তাঁকে ‘সরস্বতী’ হতে দেয়নি তার শ্বশুরবাড়ির লোক। এই নয় যে এখানে শুধুমাত্র ‘ভিলেন’ আমি তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বানাবো, তার নিজের বাবা-মাও চায়নি মেয়ে চাকরি করে ঝামেলা অশান্তি ডেকে আনুক তার ‘আপাত’ সুখের ঘরে।

যাই হোক, তারপর কয়েক কিউসেক জল বয়ে গেছে গঙ্গা দিয়ে। সেই জেঠিমার মেয়ে এখন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে ডাক্তারি করছে দিব্যি সংসার সামলেও।
মেয়েদের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’ ঠিক কতটা দরকার, মেয়েরা তা বুঝেছে এবং তারা সেই ভাবে এগিয়েও চলেছে।
দু’একদিন আগে একটি খবর পেয়ে নতুন করে সব কিছু ভাবতে হচ্ছে বই কি। মেয়েটি চাকরি ছেড়ে শুধুমাত্র একটু নিজের ইচ্ছেমতো কিছুদিন সংসার করতে চেয়েছিল, তাই শুনে তার পরম প্রিয় ‘পতিদেব’ আর তার শ্বশুরবাড়ির লোক তাকে ডিভোর্সের হুমকি দেয়। তার উপর মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচার করতে থাকে। তার পর সেই মেয়েটি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছে এসব শুনে। মেয়েটিকে একটিবার ডেকে বলতে ইচ্ছে করছে “তুমি এত দুর্বল কেন হলে, বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটা তোমার কাছে নিজের জীবনের থেকেও গুরুত্ব পেল?”

বললাম না, আমরা এই ‘মানুষ’গুলো বড্ড চালাক হতে শিখেছি। লোকে ভাববে, আহা, কত স্বাধীনতা দেওয়া হয় মেয়েকে। কিন্তু একটু ভাল ভাবে খেয়াল করলে বোঝা যাবে, কিছু চাকরিরতা মেয়ে বিয়ের পরে তার নতুন ‘বাড়ি’-তে এটিএম হতে বসেছে। সেই মেয়ে যদি নিজের ইচ্ছেতে একটু সংসার করতে চায়, অনেক হিসেব গণ্ডগোল হয়ে যাবে সেইসব লোকগুলোর, যারা বিয়ের আগে ‘পাত্রপাত্রী’ বিভাগে বিজ্ঞাপন দেয়— ‘সঃচাঃ, বেসঃচাঃ, ফর্সা তন্বী পাত্রী চাই’।

কৈশোরে মেট্রো চ্যানেলে সুপুরুষ ছিপছিপে মিলিন্দ সোমানকে দেখে হৃদয় যেমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, এক যুগ কেটে গেলেও সেই ব্যাকুলতা এখনও রয়ে গেছে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিন্দ সোমানের চেহারার যেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, আমাদের মানসিকতারও তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি।

আমাদের মানসিকতা একই থাকবে কালো কয়লার মতো, একশটা মোমবাতি জ্বালালেও বা হাজারটা ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’র প্যাকেট শেষ করে ফেললেও আদৌ কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তবুও হাল ছেড়ে দেব না। ‘সবকিছু পালটে যাবে একদিন’ এই স্বপ্ন বুকে নিয়েই বাঁচব আমরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here