দেশে তিনমাসে ১৮৭ নারী ধর্ষণের স্বীকার

53

নড়াইল কণ্ঠ ডেস্ক : পরিসংখ্যানে গণধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ৩৮ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু হবিগঞ্জের বিউটি, কক্সবাজারে চার বছরের শিশুই নয়, গত তিন মাসে ধর্ষণের শিকার ১৮৭ জন নারী। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর মেয়ে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী বিউটি আক্তার (১৬)। একই গ্রামের বাবুল মিয়া গত ২১ জানুয়ারি বিউটিকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। পরে কৌশলে তাকে তার বাড়িতে রেখে পালিয়ে যায় বাবুল।
এ ঘটনায় ১ মার্চ সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চানের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। এর দুই সপ্তাহ পরে গত ১৬ মার্চ বিউটিকে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় তার পরিবার। সেই রাতেই বিউটি আক্তার নানার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেদিন তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন ১৭ মার্চ সকালে শায়েস্তাগঞ্জ হাওরে একটি জমির মধ্যে বিউটির লাশ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় তাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় বাবুল মিয়া।
অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ডুলাহাজরা এলাকায় গত ২৬ মার্চ চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে মো. রহিম উদ্দিন নামের এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পরে ওই শিশুকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে ১ এপ্রিল দিবাগত রাতে মো. রহিম উদ্দিন র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
চলতি মাসে ধর্ষণের এই ঘটনা দুটি সারা দেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। যদিও আলোচিত এই দুটি ঘটনাই নয়, গত তিন মাসে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন নারী। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে ১৯ নারীকে, আর ধর্ষণের পরে ‘আত্মহত্যা’ করেছে দুই নারী। এ ছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ২১ নারীর ওপর।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত তিন মাসের এক পরিসংখ্যানে এই সব তথ্য জানানো হয়েছে। আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আসকের ওই পরিসংখ্যানে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ২১ নারীর ওপর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৬ বছর বয়সের শিশু পাঁচজন। আর সাত থেকে ১২ বছর বয়সের শিশু তিনজন।
একক ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ১৪০ জন নারী একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৬ বছর পর্যন্ত বয়সের শিশু ১৬ জন। আর সাত থেকে ১২ বছর বয়সের শিশু ২৩ জন। আর ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১৬ জন নারী। এ ছাড়া বাকিরা ১৯ বছরের ওপরের বয়সী।
ওই পরিসংখ্যানে গণধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে ৩৮ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১৯ জন নারী। আর ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪০ জন নারী। এ ছাড়া বাকিরা ২৫ বছরের ওপরের বয়সী নারী।
আসকের পরিসংখ্যানে ধর্ষণের পরে হত্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে ১৯ জন নারীকে। এদের মধ্যে একক ধর্ষণের পরে ১০ জন। গণধর্ষণের পরে ২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আর সাতজনের কোন ধরনের ধর্ষণ সেটার উল্লেখ্য করা নেই। একই সাথে ধর্ষণের পরে দুই নারী আত্মহত্যা করেছেন বলেও বলা হয়েছে ওই পরিসংখ্যানে।
নারী নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, তিন মাসে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০৭ জন নারী। এদের মধ্যে ৭৫ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। আর পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন নারী। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৮ জন নারী।
যৌন হয়রানিসংক্রান্ত আসকের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, তিন মাসে সারা দেশে যৌন হয়রানির ঘটনার শিকার হয়েছেন ২৭ জন নারী। এদের মধ্যে যৌন হয়রানির ঘটনার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন এক নারী। এর মধ্যে গত ৭ মার্চ বাংলামোটরে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে সারা দেশ তোলপাড় হয়।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়াটা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ভয়ানক চিত্র ও সতর্কবাণী। ধর্ষণের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সব ধর্ষণের ঘটনার পেছনে দায়ী মূলত কয়েকটি বিষয়।
প্রথমত একটি হলো- প্রযুক্তির অপব্যবহার। কারণ ইন্টারনেটে অতি সহজে যৌন ছবি, উত্তেজক ভিডিও পাওয়া যায়। ফলে ধর্ষণের নৈরাজ্য বেড়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত হচ্ছে- পুঁজিবাদের ফলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে দূরত্ব, পারস্পারিক সম্মানবোধ, সহনশীল আচরণ অনেকটাই কমে গেছে। আর একইসঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে।
আর তৃতীয়টি হলো- ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের ক্ষেত্রে এক প্রকার শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। এটা থেকে বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়। যখন কোনো ধর্ষণের দ্রুত বিচার না হয়, তখন এটি আরও একটি ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী। এই সব বিষয়গুলো যদি সরকার বা রাষ্ট্র মাথায় রেখে কাজ করে, তবে ধর্ষণের ঘটনা অনেকাংশে কমে যেতে পারে।’
তথ্য সূত্র : প্রিয়.কম